বাংলা ধ্বনি পরিবর্তন Last updated: 4 months ago

ধ্বনি দিয়ে শব্দের দেহ নির্মিত হয়। সুতরাং ভাষাতে ধ্বনির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ধ্বনি যেহেতু মানুষের উচ্চারণের বিষয় তাই একই ধ্বনি স্থান-কাল-ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উচ্চারিত হয়। এই বিষয়টিকেই ব্যাকরণে ধ্বনি পরিবর্তন বলা হয়। অন্যভাবে বললে, দ্রুত উচ্চারণের ফলে অথবা ভাষার উপর আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে ধ্বনির উচ্চারণ-পার্থক্যকে বলা হয় ধ্বনি পরিবর্তন। যেমন- ‘পাঁচশ টাকা’ এই কথাটি দ্রুত উচ্চারণ করলে হয় ‘পাশশো টাকা’, ‘চ’ ধ্বনিটি ‘শ’ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা

ধ্বনি প্রধানত দুই প্রকার- ১) স্বরধ্বনি এবং ২) ব্যঞ্জনধ্বনি। উভয়প্রকার ধ্বনিরই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আবার ধ্বনি পরিবর্তনের ধরণগুলি মূলত চার প্রকারের। যথা-

ক) ধ্বনির আগম– উচ্চারণকালে নতুন একটি বা একাধিক ধ্বনির আগমন ঘটে। যেমন- স্কুল> ইস্কুল, স্ত্রী> ইস্ত্রী ইত্যাদি।

খ) ধ্বনির লোপ– উচ্চারণকালে একটি বা একাধিক ধ্বনি লোপ পায়। যেমন- গামোছা> গামছা, জানালা> জানলা ইত্যাদি।

গ) ধ্বনির রূপান্তর– শব্দমধ্যস্থ কোনো ধ্বনি রূপান্তরিত হয়। যেমন- গল্প> গপ্প, শরীর> শরীল ইতাদি।

ঘ) ধ্বনির স্থানান্তর– দ্রুত উচ্চারণের ফলে বা অসাবধানতাবশত পাশাপাশি থাকা দুটি ধ্বনি একটির জায়গায় আরেকটি উচ্চারিত হয়। যেমন- রিকশা> রিশকা, মুকুট> মুটুক ইত্যাদি।

ধ্বনি পরিবর্তন [স্বরধ্বনিগত]

১) অপিনিহিতি (Epenthesis) -অপিনিহিতি কথাটির অর্থ হল আগে (অপি) অবস্থান করা (নিহিতি)। উচ্চারণকালে যদি শব্দমধ্যস্থ ‘ই’-কার বা ‘উ’-কার নির্দিষ্ট সময়ের আগে উচ্চারিত হয় তবে ব্যাকরণের আলোচনায় ধ্বনি পরিবর্তনের এই রীতিটিকে বলা হয় অপিনিহিতি। এই নামটি ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের দেওয়া। এই বিশেষ উচ্চারণ রীতি বঙ্গালি উপভাষার লক্ষণ। সাধারণত ‘ই’ এবং ‘উ’- কারের অপিনিহিতি হয়ে থাকে।

  • অপিনিহিতি শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হল – (অপি-নি-ধা-তি) অর্থাৎ শব্দের আগে বসা বা আগে স্থাপন ।

১. ‘ই’ কারের অপিনিহিতি উদাহরণসহ :

রাতি > রাইত

আজি > আইজ

করিয়া > কইর‍্যা

গাঁটি > গাইট

পাখি > পাইখ

চারি > চাইর

২. ‘উ’ কারের অপিনিহিতি উদাহরণসহ :

মাথুয়া > মাউথুয়া

মাঠুয়া > মাউঠুয়া

মাছুয়া > মাউছুয়া

নাটুয়া > নাউটুয়া

সাধু>সাউধ

ভাতুয়া > ভাউতুয়া

২) অভিশ্রুতি (Umlaut/ Vowel Mutation) – অপিনিহিতির পরের স্তর হল অভিশ্রুতি। অপিনিহিতিজাত ‘ই’ এবং ‘উ’ সন্নিহিত স্বরধ্বনির প্রভাবে অন্য রূপ লাভ করলে ব্যাকরণের আলোচনায় ধ্বনি পরিবর্তনের এই রীতিটিকে বলা হয় অভিশ্রুতি।

– করিয়া (মূল শব্দ)> কইর‍্যা(অপিনিহিতি)> করে (অভিশ্রুতি),

– বলিয়া (মূল শব্দ) > বইল্যা (অপিনিহিতি)> বলে (অভিশ্রুতি)

— দেখিয়া(মূল শব্দ) > দেইখ্যা(অপিনিহিতি) > দেখে

–গাছুয়া(মূল শব্দ) > গাউছা(অপিনিহিতি) > গেছো

–ভাতুয়া(মূল শব্দ) > ভাউতা(অপিনিহিতি) > ভেতো

–কন্যা(মূল শব্দ) > ক‌ইন্যা(অপিনিহিতি) > কনে

অভিশ্রুতি চিহ্নিত করনের সহজ উপায়ঃ ‘য়’ যুক্ত যেকোনো বড় শব্দ ছোট হয়ে যাবে।

৩) স্বরসঙ্গতি (Vowel Harmony)-শব্দের মধ্যে একাধিক স্বরধ্বনি থাকলে উচ্চারণকালে তারা একে অপরকে প্রভাবিত করে সঙ্গতি বিধানের চেষ্টা করে। এইভাবে যে ধ্বনি পরিবর্তন হয় তাকে স্বরসঙ্গতি বলা হয়। যেমন- পুজা> পুজো, কুমড়া> কুমড়ো ইত্যাদি।

স্বরসঙ্গতি আবার ৫ প্রকারঃ

  1. প্রগত
  2. পরাগত
  3. মধ্যগত
  4. অন্যোন্য
  5. চলিত বাংলায় স্বরসঙ্গতি

ক) প্রগত স্বরসঙ্গতি– পূর্বের বা আগের স্বরধ্বনি অনুযায়ী পরের স্বরধ্বনি পরিবর্তিত হলে এটাকে প্রগত স্বরসঙ্গতি বলা হয়।
যেমন- মূলা(ম্‌+উ+ল্‌+আ)> মূলো(ম্‌+উ+ল্‌+ও),শিকা(শ্‌+ই+ক্‌+আ)> শিকে(শ্‌+ই+ক্‌+এ)

খ) পরাগত স্বরসঙ্গতি– এটা ঠিক প্রগত স্বরসঙ্গতির উল্টা অর্থাৎ অন্ত্যস্বর বা পরের স্বরধ্বনি অনুযায়ী আগের স্বরধ্বনির পরিবর্তিত হলে তাকে পরাগত স্বরসঙ্গতি বলে।

যেমন: আখো(আ+খ্‌+ও) > এখো(এ+খ্‌+ও), দেশি(দ্‌+এ+শ্‌+ই) > দিশি(দ্‌+ই+শ্‌+ই)।

গ.মধ্যগত স্বরসঙ্গতিঃ  আগের স্বরধ্বনি ও পরের স্বরধ্বনির প্রভাবে মধ্যস্বর পরিবর্তিত হলে তাকে মধ্যগত স্বরসঙ্গতি বলা হয়।
যেমনঃ

বিলাতি(ব্‌+ই+ল্‌+আ+ত্‌+ই) > বিলিতি(ব্‌+ই+ল্‌+ই+ত্‌+ই)

বিদেশি(ব্‌+ই+দ্‌+এ+শ্‌+ই)>বিদিশি(ব্‌+ই+দ্‌+ই+শ্‌+ই)

ঘ. অন্যোন্য স্বরসঙ্গতিঃ  আদ্যস্বর ও অন্ত্যস্বর এই দুইটির প্রভাবে যদি দুইটিই পরিবর্তিত হয় তখন তাকে অন্যোন্য স্বরসঙ্গতি বলে। যেমন: মোজা(ম্‌+ও+জ্‌+আ) > মুজো(ম্‌+উ+জ্‌+ও)।

ঙ. চলিত বাংলায় স্বরসঙ্গতিঃ মিলামিশা˃ মেলামেশা, গিলা˃ গেলা, মিঠা˃ মিঠে, ইচ্ছা˃ ইচ্ছে। মুড়া > মুড়ো, চুলা > চুলো। উড়ুনি > উড়নি, এখুনি > এখনি।

৪) স্বরাগম– উচ্চারণকালে শব্দের মধ্যে নতুন একটি স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে যে ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন হয় ব্যাকরণের পরিভাষায় তাকে স্বরাগম বলে। স্বরাগম তিন প্রকার-

আদি স্বরাগম– উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের আদিতে অর্থাৎ শুরুতে স্বরধ্বনির আগমন ঘটার প্রক্রিয়াকে বলা হয় আদি স্বরাগম। যেমন- স্কুল> ইস্কুল, স্কেল> ইস্কেল, স্ত্রী> ইস্ত্রী ইত্যাদি।

মধ্য স্বরাগম– শব্দের মাঝখানে স্বরধ্বনির আগম ঘটলে তাকে বলা হয় মধ্য স্বরাগম।

যেমন- মুক্তা(ম্‌+উ+ক্‌+ত্‌+আ)> মুকুতা(ম্‌+উ+ক্‌+উ+ত্‌+আ), রত্ন(র্‌+অ+ত্‌+ন্‌+অ)> রতন(র্‌+অ+ত্‌+অ+ন্‌) ইত্যাদি।

অন্ত্য স্বরাগম– শব্দের অন্ত্যে বা শেষে স্বরধ্বনির আগম ঘটলে তাকে অন্ত্য স্বরাগম বলা হয়।

যেমন- সত্য(স্‌+অ+ত্‌+ত্‌+অ)> সত্যি(স্‌+অ+ত্‌+ত্‌+ই), নস্য> নস্যি ইত্যাদি।

এই তিন প্রকার স্বরাগমের মধ্যে মধ্যস্বরাগম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মধ্যস্বরাগমের অপর নাম স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ। স্বরভক্তি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল স্বর সহযোগে বিভাজন। যুক্তাক্ষরের মাঝে স্বরধনির আগম ঘটলে তাকে স্বরভক্তি বলা হয়। স্বরভক্তির ফলে শব্দের উচ্চারণ যেমন সহজতর হয় তেমনি শব্দটি শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। এইজন্য কাব্যে স্বরভক্তির বিশেষ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর অপর নাম বিপ্রকর্ষ। বিপ্রকর্ষ কথাটির অর্থ হল বিশেষভাবে প্রকৃষ্টরূপে সৌকর্য সৃষ্টি। ধ্বনি পরিবর্তনের আলোচনায় বিপ্রকর্ষ বলতে বোঝায় কোনো যুক্তাক্ষরের মাঝে স্বরধ্বনির আগমের ফলে যুক্ত ব্যঞ্জনগুলির দূরবর্তী হওয়া। স্বরভক্তির উদাহরণ- কর্ম> করম, ধর্ম> ধরম, জন্ম> জনম, মুক্তা> মুকুতা, মুল্ক> মুলুক ইত্যাদি।

৫) স্বরলোপ– উচ্চারণের সুবিধার জন্য শব্দমধ্যস্থ  স্বরধ্বনি লোপ পেলে ব্যাকরণের ভাষায় তাকে বলা হয় স্বরলোপ। স্বরলোপ তিন প্রকারের হয়-

ক) আদি স্বরলোপ– শব্দের আদিতে স্থিত স্বরধ্বনির বিলোপ ঘটলে তাকে আদি-স্বরলোপ বলা হয়। যেমন- উড়ুম্বুর> ডুমুর, অলাবু> লাবু ইত্যাদি।

খ) মধ্য স্বরলোপ– শব্দের মধ্যে স্থিত স্বরধনির বিলোপ ঘটলে তাকে মধ্য স্বরলোপ বলা হয়। যেমন-

সুবর্ণ(স্‌+উ+ব্‌+অ+র্‌+ণ্‌+অ)>স্বর্ন(স্‌+ব্‌+অ+র্‌+ণ্‌+অ),গামোছা> গামছা, ভগিনী> ভগ্নি, বসতি> বস্তি ইত্যাদি।

গ) অন্ত্য স্বরলোপ– শব্দের অন্তে বা শেষে স্থিত স্বরধ্বনির বিলোপ ঘটলে তাকে অন্তঃস্বরলোপ বলা হয়। যেমন-  রাশি> রা, আজি>আজ,চারি>চার,আশা>আশ।

৬) নাসিক্যীভবন– শব্দমধ্যস্থ নাসিক্য ধ্বনি (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) লোপ পাওয়ার ফলে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সানুনাসিক উচ্চারণ হয়। ধ্বনি পরিবর্তনের এই রীতিকে বলা হয় নাসিক্যীভবন (Nasalization)। যেমন- পঞ্চ> পাঁচ, চন্দ্র> চাঁদ, পঙ্ক> পাঁক ইত্যাদি।

নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনির প্রভাব ছাড়াই যখন কোনো স্বরধ্বনির আনুনাসিক উচ্চারণ হয়, তখন তাকে স্বতোনাসিক্যীভবন বলা হয়। যেমন- আখ> আঁখ, আচ>আঁচ, হাসপাতাল> হাঁসপাতাল, ইট> ইঁট, পুথি> পুঁথি ইত্যাদি।

৭) সমীভবন– উচ্চারণের সুবিধার জন্য কোনো শব্দের পাশাপাশি থাকা দুটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি যখন প্রথম ধ্বনিটি পরের ধ্বনিটিকে, অথবা পরের ধ্বনিটি আগের ধ্বনিটিকে, অথবা একে অপরকে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করে, তখন তাকে সমীভবন বা সমীকরণ (Assimilation) বলা হয়। প্রথম ক্ষেত্রে হয় প্রগত (Progressive) সমীভবন, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হয় পরাগত (Regressive) সমীভবন এবং তৃতীয় ক্ষেত্রে হয় অন্যোন্য (Mutual) সমীভবন। যেমন-

প্রগত সমীভবন- পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে যখন একই রকম বা কাছাকাছি একই রকম ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে বলা হয় প্রগত সমীভবন।

যেমন, পদ্ম(প্‌+অ+দ্‌+ম্‌+অ) > পদ্দ(প্‌+অ+দ্‌+দ্‌+অ), চন্দন> চন্নন, গলদা> গল্লা ইত্যাদি।

পরাগত সমীভবন– পরবর্তী ব্যঞ্জন ধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে একই রকম ধ্বনিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে পরাগত সমীভবন বলে। গল্প> গপ্প, কর্তা> কত্তা, ধর্ম> ধম্ম ইত্যাদি।

 

প্রগত পরাগত দ্বন্দ্ব দূর করতে হলে অর্থাৎ কোনটি প্রগত কোনটি পরাগত তা সহজে নির্ণয় করতে হলে সে ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে সেটা হল-‘ জোর যার মুল্লুক তার’ অর্থাৎ যার ক্ষমতা বেশি সে অপরিবর্তিত থাকবে আর নামকরণটা তার নামই হবে। জোর যার মুল্লুক তার নিয়মে শব্দের দুটি বর্ণের মধ্যে যে বর্ণ অপরিবর্তিত থাকে ধরে নেয়া হয় তার জোর বেশি। তাই সেই বর্ণটি যেখানে থাকে তার ওপর ভিত্তি করে নামকরণ করা হয় অর্থাৎ সেই অপরিবর্তিত বর্ণটি প্রথমে থাকলে নাম হয় প্রগত আর সেই বর্ণটি মধ্যেই পরে থাকলে নাম হয় পরাগত। যেমন-

  • লগ্ন(ল্‌+অ+গ্‌+ন্‌+অ)>লজ্ঞ(ল্‌+অ+গ্‌+গ্‌+অ) এখানে প্রথম শব্দের ‘গ’ আর ‘’ এর মধ্য ‘’ অপরিবর্তিত আছে। তার মানে ‘’ এর শক্তি বেশি। তাহলে এবার দেখি ‘গ’ কোথায় আছে? -প্রথমে। তার মানে প্রগত
  • কাদ+না>কান্না – এখানে প্রথমাংশের ‘’ আর ‘’ এর মধ্যে পরবর্তীতে অংশের ‘’ অপরিবর্তিত আছে ।তারমানে ‘’ এর শক্তি বেশি তাহলে এবার দেখি ‘’ কোথায় আছে ? পরে । তার মানে পরাগত

অন্যোন্য সমীভবন- পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় বাজন ধ্বনির প্রভাবে পারস্পরিক পরিবর্তন ঘটে তখন সেই প্রক্রিয়াকে বলে অন্যোন্য সমীভবন।  বৎসর> বচ্ছর, মহোৎসব> মোচ্ছব, মৎস্য> মচ্ছ ইত্যাদি।

৮)বিষমীভবন-পাশাপাশি দুটি সমধ্বনির একটির পরিবর্তন ঘটলে তাকে বিষমীভবন বলে। অর্থাৎ যখন শব্দের মধ্যে দুটি সমধ্বনির একটির পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে বিষমীভবন বলা হয়। লাল > নাল, শরীর > শরীল, ললাট˃নলাট ইত্যাদি।

৯) অসমীকরণ– দু্ইটি একই ধ্বনির পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য মাঝখানে যখন একটি বাড়তি স্বরধ্বনি যুক্ত হয় তখন তাকে অসমীকরণ বলে।

উদাহরণঃ টপ+টপ > টপাটপ (এখনে মাঝখানে একটি বাড়তি আ স্বরধ্বনি যোগ হয়েছে)

ধপ+ধপ > ধপাধপ (এখনেও মাঝখানে একটি বাড়তি আ স্বরধ্বনি যোগ হয়েছে)

ফট+ফট > ফটাফট

১০) দ্বিত্ব ব্যঞ্জন- কখনো কখনো জোর দেয়ার জন্য শব্দের অন্তর্গত ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়, একে বলে দ্বিত্ব ব্যঞ্জন বা ব্যঞ্জনদ্বিত্বা। যেমন – পাকা > পাক্কা, সকাল > সক্কাল ইত্যাদি।

১১)ধ্বনি বিপর্যয়– দ্রুত উচ্চারণের ফলে অথবা অজ্ঞতাবশত শব্দমধ্যস্থ দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি পরস্পর স্থান পরিবর্তন করলে, ধ্বনি পরিবর্তনের সেই রীতিকে বলা হয় ধ্বনি বিপর্যয় (Metathesis)। যেমন- রিকশা> রিশকা, মুকুট> মুটুক, আলনা> আনলা, বারাণসী> বানারসি, বাক্স> বাস্ক, পিশাচ> পিচাস, তলোয়ার> তরোয়াল, রিস্ক> রিকস ইত্যাদি।

১২) ব্যঞ্জনচ্যুতি– যখন পাশাপাশি দুইটি একই উচ্চারণের ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে এবং তাদের মধ্যে একটি লোপ পায় তখন তাকে ব্যঞ্জনচ্যুতি বলা হয়। অর্থাৎ পাশাপাশি একই উচ্চারণের দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির একটি লোপ পেলে তাকে ব্যঞ্জনচ্যুতি বলে।

উদাহরণ: বড় দাদা > বড়দা, বউদিদি > বউদি, ছোটকাকা > ছোটকা, ছোটদাদা > ছোটদা ইত্যাদি।

১৩) ব্যঞ্জন বিকৃতি– শব্দের মধ্যে যদি কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে অন্য কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি হয় তখন তাকে ব্যঞ্জন বিকৃতি বলে। উদাহরণ: ধোবা > ধোপা, কবাট > কপাট, দাইমা > দাইমা ইত্যাদি।

১৪) ‘র’ ধ্বনি লোপ– কথ্য উচ্চারণে মূল শব্দের ‘র’ ধ্বনিটি লোপ পেলে তাকে ‘র’ ধ্বনির লোপ বলা হয়। যেমন- কার্পাস> কাপাস ইত্যাদি। অনেক সময় ‘র’ ধ্বনিটি লোপ পেলে পরের ব্যঞ্জন ধ্বনিটি দুবার উচ্চারিত হয়। যেমন- করল> কল্ল, সর্দার> সদ্দার ইত্যাদি।

১৫) ‘হ’ ধ্বনি লোপ– কথ্য উচ্চারণে বা চলিত ভাষায় কোনো শব্দের ‘হ’ ধ্বনি লোপ পেলে ধ্বনি পরিবর্তনের আলোচনায় এই রীতিকে বলা হয় ‘হ’ ধ্বনি লোপ। যেমন- মহাশয়> মশায়, সিপাহি> সিপাই, মালদহ> মালদা ইত্যাদি। সাধু ভাষার সর্বনামগুলি থেকেও ‘হ’ ধ্বনি লোপ পায়। যেমন- তাহার> তার, যাহার> যার ইত্যাদি।

১৬) অন্তর্হতি– যখন পদের মধ্যে কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পায় তখন তাকে অন্তর্হতি বলা হয়। অর্থাৎ কোন ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পেলে তাকেই অন্তর্হতি বলে। উদাহরণ হলো: ফাল্গুন > ফাগুন, ফলাহার > ফলার, আলাহিদা > আলাদা ইত্যাদি।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

1 out of 1 Marked as Helpfull !