বাংলা ণত্ব ও ষত্ব বিধান Last updated: 4 months ago

বাংলা ভাষায় ‘ণ’ ও ‘ষ’-র ব্যবহার তেমন নেই। অর্থাৎ, খাঁটি বাংলা শব্দে বা তদ্ভব শব্দে কখনোই ‘ণ/ ষ’ ব্যবহৃত হয় না। শুধু তাই না, অর্ধ-তৎসম, দেশি বা বিদেশি শব্দেও ‘ণ/ষ’ ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু যে সব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে কোন পরিবর্তন ছাড়াই সরাসরি বাংলা ভাষায় এসেছে, সে সব শব্দে সংস্কৃত ভাষার বানান অনুসরণ করার জন্য ‘ণ/ ষ’ ব্যবহার করতে হয়। এইসব তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে ‘ণ/ ষ’ ব্যবহার করার নিয়মকেই বলা হয় ণত্ব ও ষত্ব বিধান।

ণত্ব বিধান বা ণ ব্যবহারের নিয়ম

১. ঋ, র, ষ – এর পরে সাধারণত মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসে। যেমন:- ঋণ, তৃণ, ঘৃণা, রণ, স্মরণ, সরণ, সারণ, সারণি, বর্ণ, বর্ণনা, করণ,কারণ, মরণ, সাধারণ, ব্যাকরণ, দূষণ, বর্ষণ, ঘর্ষণ, আকর্ষণ, ভাষণ, ভীষণ, উষ্ণ ইত্যাদি।

২. বাংলা ক্রিয়াপদের শেষে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) বসে। পূর্বে ঋ, র, ষ থাকলেও দন্ত্য-ন (ন) বসবে। যেমন: ধরেন, করেন, করুন(বিশেষণ বুঝালে করুণ’ বানানে ‘ণ বসবে), মারেন, ভরেন, চরান ইত্যাদি।

৩. বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অ-তৎসম ও বিদেশি শব্দে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) বসে। পূর্বে ঋ, র, ষ থাকলেও দন্ত্য-ন (ন) বসবে।

৪. তৎসম শব্দে ‘ট’ বর্গীয় ধ্বনির যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসে। যেমন: কণ্টক, ঘণ্টা, কণ্ঠ, লুণ্ঠন, ভণ্ড, কাণ্ড, গুণ্ডা ইত্যাদি। তবে অ-তৎসম শব্দের ‘ট’ বর্গীয় যুক্ত বর্ণে মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসে না। যেমন: ঠান্ডা, ঝান্ডা (হিন্দি শব্দ), স্ট্যান্ড, প্যান্ট, ডান্ডি, লন্ঠন (ইংরেজি শব্দ)।

মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচিত ৯ম-১০ম শ্রেণির ২০২০ সংস্করণের বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে ‘লন্ঠন‘ বানানটি মূর্ধন্য-ণ (ণ) দিয়ে দেওয়া আছে যা বইটির অনাকাক্ষিত মুদ্রণ ভুল। মূলত বানানটি হবে ‘লুণ্ঠন‘।

লুণ্ঠন (অর্থ: লুট করা) | লণ্ঠন (অর্থ: মশাল)

৫. তদ্ভব শব্দে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) ব্যবহৃত হয়। যেমন: কান (কর্ণ), সোনা (স্বর্ণ), পরান (প্রাণ), পর্ণ (পান), বামুন (ব্রাহ্মণ) ইত্যাদি।

৬. মূর্ধন্য-ণ (ণ) এর পরে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) বসে। যেমন: গণনা, বর্ণনা, পাণিনি, ঘূর্ণন, রণন (ঝংকার), ক্ষুন্ন, বিষন্ন ইত্যাদি।

৭. ‘ত’ বর্গীয় ধ্বনির যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা দন্ত্য-ন (ন) বসে। যেমন: দন্ত, ঘুমন্ত, চলন্ত, পড়ন্ত, ডুবন্ত, উঠন্ত, নামন্ত, ঝুলন্ত, তদন্ত,

গ্রন্থ, অন্ত, ক্রন্দন, বৃন্ত, গন্ধ, সন্ধ্যা, সন্ধান, মন্থর, মন্দ ইত্যাদি।

৮. ত, থ, দ, ধ – এই চারটি বর্ণের পরে সবসময় দন্ত্য-ন (ন) বসে। যেমন: কথোপকথন, দান, ধান, ঐকতান ইত্যাদি।

৯. সমাসবদ্ধ পদে ণ-ত্ব বিধান খাটে না। এক্ষেত্রে সাধারণত দন্ত্য-ন (ন) ব্যবহৃত হয়। যেমন: ত্রিনয়ন, দুর্নিবার, দুর্নাম, নির্নিমেষ,সর্বনাম, দুর্নীতি, পরনিন্দা, অগ্রনায়ক, পরনিন্দা, ছাত্রনিবাস ইত্যাদি।

এক শিক্ষার্থী আমাকে প্রশ্ন করেছে – “স্যার, ‘ত্রিনয়ন’ সমাসবদ্ধ পদ তাই এ বানানে দন্ত্য-ন বসে। তাহলে ‘ত্রিহায়ণ’ সমাসবদ্ধ পদ হওয়া সত্ত্বেও এ বানানে মূর্ধন্য-ণ কেন বসে? বিভিন্ন মৌলিক বই, বাংলাপিডিয়ার নোট বা অভিধান খুঁজেও এই প্রশ্নের উত্তর পাইনি। বাজারের প্রচলিত কিছু বই ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম শুধু ‘ত্রিহায়ণ’ না আরও কিছু শব্দের উল্লেখ করা আছে যাতে সমাসবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মূর্ধন্য-ণ বসেছে। যেমন: রথারোহণ, অপরাহ্ন, পূর্বাহ্ন, পরাহ্ন ইত্যাদি। তবে এই বানানগুলোতে কেন দন্ত্য-ন বসেছে তার কোনাো ব্যাখ্যা দেওয়া নেই তাই শিক্ষার্থীদেরও এগুলাো নিয়ে অনেক দ্বিধান্বিত হতে দেখা যায়।

সমাধান ও সঠিক ব্যাখ্যা: ‘সমাসবদ্ধ পদ’ এই কথাটির অর্থ বুঝলেই এই রহস্যের সমাধান করা সহজ হয়ে যাবে। সমাসবদ্ধ পদ’ বলতে বুঝায় যেখানে পূর্বপদ ও পরপদ বদ্ধ বা যুক্ত হয়েছে। যেমন: ত্রিনয়ন – এখানে পূর্বপদ হচ্ছে ‘ত্রি’ আর পরপদ হচ্ছে ‘নয়ন’। তাহলে এদের যুক্তস্থল হচ্ছে ‘ত্রি’ এর পর আর ‘নয়ন’ এর প্রথম ‘ন’ এর আগে। মনে রাখতে হবে, এই যুক্ত স্থলে যদি কোনো ‘ন’ বসানোর প্রয়াোজন হয় তাহলে তা সবসময় দন্ত্য-ন হবে। কিন্তু সমাসবদ্ধ পদ হলেও পূর্বপদ ও পরপদের যুক্তস্থল ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় ণত্ব বিধানের নিয়মানুসারে মূর্ধন্য-ণই বসবে। যেমন:

  • নির্নিমেষ – এখানে রেফের পর ‘ণ’ বসার কথা থাকলেও ‘ন’ বসেছে। কারণ ‘নির’ ও ‘নিমেষ’ এই দুটি পদেরযুক্তস্থলে ‘ন’ বসেছে।
  • অগ্রনায়ক – এখানে র-ফলার পর ‘ণ’ বসার কথা থাকলেও ‘ন’ বসেছে। কারণ ‘অগ্র’ ও ‘নায়ক’ এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেছে।
  • ত্রিনয়ন – এখানে ‘এ’ মানে র-ফলার পর ‘ণ’ বসার কথা থাকলেও ‘ন’ বসেছে। কারণ ‘ত্রি’ ও ‘নয়ন’ এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেছে।
  • ত্রিহায়ণ – ‘হায়ন’ বানানে বসে দন্ত্য-ন। কিন্তু তারপরও ‘ত্রিহায়ণ’ বানানে ‘ণ’ বসার কারণ ‘ত্রি’ ও ‘হায়ন’ এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেনি অর্থাৎ যেখানে সমাসবদ্ধ দুটি পদ যুক্ত হয়েছে সেখানে ‘ন’ বসেনি। তাই এই অধ্যায়ে বর্ণিত ণত্ব বিধানের ১০ নং নিয়মানুসারে শব্দটিতে মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসেছে।
  • রথারোহণ – সমাসবদ্ধ পদ হওয়া সত্ত্বেও রথারোহণ’ বানানে ‘ণ’ বসার কারণ ‘রথ’ ও ‘আরোহণ’ এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেনি অর্থাৎ যেখানে সমাসবদ্ধ দুটি পদ যুক্ত হয়েছে সেখানে ‘ন’ বসেনি।
  • অপরাহ্ণ – ‘অহ্ন’ বানানে বসে দন্ত্য-ন, আবার ‘অপরাহ্ণ’ পদটিও সমাসবদ্ধ পদ। কিন্তু তারপরও ‘অপরাহ্ণ’ বানানে ‘ণ’ বসার কারণ ‘অপর’ ও ‘অহ্ন’ এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেনি অর্থাৎ যেখানে সমাসবদ্ধ দুটি পদ যুক্ত হয়েছে সেখানে ‘ন’ বসেনি।
  • পূর্বাহ্ণ – ‘অহ্ন’ বানানে বসে দন্ত্য-ন, আবার ‘পূর্বাহ্ণ’ পদটিও সমাসবদ্ধ পদ। কিন্তু তারপরও ‘পূর্বাহ্ণ’ বানানে ‘ণ’ বসার কারণ ‘পূর্ব’ ও ‘অহ্ন এই দুটি পদের যুক্তস্থলে ‘ন’ বসেনি অর্থাৎ যেখানে সমাসবদ্ধ দুটি পদ যুক্ত হয়েছে সেখানে ‘ন’ বসেনি। তাই এই অধ্যায়ে বর্ণিত ণত্ব বিধানের ১০ নং নিয়মানুসারে শব্দটিতে মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসেছে।

১০. ঋ, র, ষ – এর পরে ‘হ, য়, য, ং’ – এই ৪টি বর্ণ এবং ‘ক’ ও ‘প’ বর্গীয় ধ্বনির পরে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ (ণ) বসে। যেমন: কৃপণ,অর্পণ, গ্রহণ, দ্রবণ, শ্রবণ, পার্বণ, চর্বণ, প্রাঙ্গণ, বৃংহণ, অকর্মণ্য, উত্তরায়ণ, নারায়ণ, রামায়ণ, অপরাহু, পূর্বাহ্, পরাহু ইত্যাদি।

ব্যাখ্যা: একখণ্ড চুম্বক একটি লোহাকে আকর্ষণ করে আবার ঐ লোহার উপর আরেকটি লোহা রাখলে তাকেও আকর্ষণ করে। কিন্তু ১ম লোহার টুকরা থেকে চুম্বক সরিয়ে নিলে এরপর ঐ লোহার টুকরাটি আর কোনো লোহার টুকরাকে আকর্ষণ করবে না। আবার চুম্বকের সাথে  লোহার টুকরাটি সংস্পর্শে থাকা অবস্থায়ও যদি লোহার টুকরার পরে কোনো কাঠের টুকরা রাখা হয় এবং তারপর কাঠের টুকরার পরে আবার কোনো লোহার টুকরা রাখা হয় তাহলেও কিন্তু লোহার টুকরাটিকে আকর্ষণ করবে না। কেননা কাঠকে ভেদ করে চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করতে পারে না।

এখন উপরের চিত্রে বাম পাশের ছকের বর্ণগুলোকে চুম্বক হিসেবে ধরব এবং ডান পাশের ছকের ১৪টি বর্ণগুলোকে আমরা লোহা হিসেবে ধরব। আর এগুলো ছাড়া বাংলা বর্ণমালার অন্যান্য বর্ণগুলোকে কাঠ হিসেবে ধরব। এখন কোনো চুম্বকের পরে যদি লোহা থাকে তাহলে ‘ণ’ কে আকর্ষণ করবে। আর যদি চুম্বকের পরে কাঠ থাকে অথবা লোহার একটি টুকরা থাকলেও তার পরে যদি কাঠ থাকে তাহলে ‘ন’ কে আকর্ষণ করবে। যেমন:- রামায়ণ [এখানে ‘র’ চুম্বক এবং ‘ম এবং য়’ এই দুটি লোহা। এই শব্দে ‘র’ (চুম্বক) এর পরে কোনো কাঠ নেই তাই তারপর ‘ণ’ বসেছে।] এরূপ – নির্মাণ, পরিমাণ, অকর্মণ্য, আক্রমণ, রমণী, চর্বণ, দর্পণ, দ্রবণ, ক্ষরণ, সংক্ষেপণ, উৎক্ষেপণ, ক্ষেপণাস্ত্র, রোপণ, রাবণ, শ্রবণ, শ্রাবণ, ভ্রাম্যমাণ, সর্বাঙ্গীণ, বৃংহণ, রূপায়ণ, নারায়ণ, পরিবহণ, পরায়ণ (তবে ‘পরাগায়ন’ এ ‘ন’), গ্রহণ, গ্রহায়ণ (তবে ‘গৃহায়ন’ এ ‘ন’), নগরায়ণ, চন্দ্রায়ণ, উত্তরায়ণ, অপেক্ষমাণ, ভ্রাম্যমাণ, অগ্রহায়ণ (তবে ‘অঘ্রান’ এ ‘ন’)। আবার রসায়ন [এখানে ‘র’ চুম্বক এবং ‘য়’ লোহা, কিন্তু ‘য়’ এর পূর্বের ‘স’ বর্ণটি কাঠ। কাঠ ভেদ করে চুম্বক লোহাকে আকর্ষণ করতে পারবে না। তাই এখানে ‘ন’ বসেছে। এরূপ — প্রদান, প্রধান, মূর্ধন্য, কর্তন, দর্শন, প্রার্থনা ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম:ণ-ত্ব বিধানের চুম্বক তত্ত্বের ব্যতিক্রমধর্মী কিছু শব্দ যেখানে চুম্বকের সাথে লোহা সরাসরি সংস্পর্শে থাকা সত্ত্বেও ‘ণ’ এর পরিবর্তে ‘ন’ বসেছে। যেমন:- পূষন, শ্রীমান, আয়ুষ্মন, চক্ষুষ্মন, গরীয়ান, বর্ষীয়ান, নির্গমন, বহির্গমন, প্রবহমান, রূপবান। বাংলা একাডেমির অভিধানে শব্দগুলোর বানানে দন্ত্য-ন (ন) ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই বানানগুলো একটু মাথায় রাখতে হবে।

১১.কতগুলো শব্দে স্বভাবতই মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: (ছন্দ আকারে)

চাণক্য মাণিক্য গণ          বাণিজ্য লবণ মণ
বেণু বীণা কঙ্কণ কণিকা।
কল্যাণ শোণিত মণি          স্থাণু গুণ পুণ্য বেণী
ফণী অণু বিপণি গণিকা।
আপণ লাবণ্য বাণী          নিপুণ ভণিতা পাণি
গৌণ কোণ ভাণ পণ শাণ।
চিক্কণ নিক্কণ তূণ          কফণি (কনুই) বণিক গুণ
গণনা পিণাক পণ্য বাণ।

উল্লেখ্য এখানে শোণিত অর্থ রক্ত, স্থাণু অর্থ স্থির/নিশ্চল, বিপণি অর্থ বিক্রয়কেন্দ্র, গণিকা অর্থ যৌনকর্ম করে যারা, আপণ অর্থ দোকান, পাণি অর্থ হাত, ভাণ অর্থ সংস্কৃত নাটকবিশেষ, চিক্কণ অর্থ সুপারি গাছ বা স্নিগ্ধ/মসৃণ, নিক্কণ অর্থ ধ্বনি/শব্দ, তূণ অর্থ যাতে বাণ রাখা হয় বা নিষঙ্গ, পিণাক অর্থ ত্রিশূল।

 

ষ-ত্ব বিধান- তৎসম শব্দের বানানে মূর্ধন্য ‘ষ’-এর ব্যবহারের নিয়মকে ষত্ব বিধান বলে। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় দন্ত্য-‘স’ এর মূর্ধন্য-‘ষ’ তে রুপান্তরের নিয়মকে ষ-ত্ব বিধান বলে। সাধারণত মূর্ধন্য-ষ ধ্বনির ব্যবহার তৎসম শব্দের বানানে দেখা যায়, যা বাংলা ভাষায় অবিকৃত রয়েছে। তবে, দেশি শব্দ, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দের বানানে মূর্ধন্য- ‘ষ’ লেখার প্রয়োজন হয় না।

ষত্ব বিধানের নিয়ম

ষত্ব বিধানের বেশিরভাগ নিয়মই আলাদাভাবে মনে রাখার কোনাো প্রয়োজন নেই। কেননা সহজভাবে এটুকু মনে রাখলেই হবে যে, যেখানে মূর্ধন্য-ণ বসে সেখানেই মূর্ধন্য-ষ বসে; যেখানে যেখানে মূর্ধন্য-ণ বসে না সেখানে মূর্ধন্য-ষও বসে না।

১.  রেফ বা ঋ বা ঋ- কারের, র – এর পরে সাধারণত মূর্ধন্য-ষ (ষ) বসে। যেমন:- ঋষি, ঋষভ, বর্ষা, বর্ষণ, কর্ষণ, ঘর্ষণ, আকর্ষণ, বিকর্ষণ, মাধ্যাকর্ষণ, কৃষি, কৃষক, হর্ষ, উৎকর্ষ, অপকর্ষ, মহাকর্ষ ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: দর্শন, দৃশ্য, স্পর্শ, পরামর্শ।

২. বাংলা ক্রিয়াপদের শেষে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ (ষ) বসে না; দন্ত্য-স (স) বসে। পূর্বে ঋ, র, ষ থাকলেও দন্ত্য-স(স) বসবে। যেমন:- ধরিস, করিস, মারিস, ভরিস, চরাস ইত্যাদি।

৩. তৎসম ‘ট’ বর্গীয় ধ্বনির যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা মূর্ধন্য-ষ (ষ) বসে। যেমন: কষ্ট, কাষ্ঠ, নষ্ট, তুষ্ট, সুষ্ঠু, পুষ্টি, দুষ্ট, ভ্রষ্ট, অতিষ্ঠ, কনিষ্ঠ, বলিষ্ঠ ইত্যাদি। তবে দেশি-বিদেশি শব্দের ‘ট’ বর্গীয় যুক্ত বর্ণে । মূর্ধন্য-ষ (ষ) বসে না; দন্ত্য-স (স) বসে। যেমন: স্ট্যান্ড, স্টিল, স্টার, স্টোর, মাস্টার, ডাস্টার, কাস্টম, ফটোস্ট্যাট, রেস্টুরেন্ট, ডায়াগনস্টিক (ইংরেজি শব্দ)।

৪. ‘ত’ বগীয় ধ্বনির যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা দন্ত্য-স (স) বসে। যেমন: স্তন্যপায়ী, স্তবক, স্তাবক, স্তুপ, স্ত্রী, স্থান, স্থল, স্থগিত, স্থাপন, স্থির, ভুল, নিস্তার, নিস্তেজ, বিস্তার, বিস্তৃত, বিস্তারিত, বিস্তীর্ণ ইত্যাদি।

৫. সংস্কৃত “সাৎ প্রত্যয় যুক্ত শব্দে মূর্ধন্য-ষ হয় না। যেমন:- ধূলিসাৎ, ভূমিসাৎ, আত্মসাৎ, অগ্নিসাৎ।

৬. খাঁটি বাংলা শব্দে সর্বদা দন্ত্য-স বা তালব্য-শ বসে। যেমন: দেশি, বসবাস, সোনা ইত্যাদি।

৭. পুরুষবাচক সম্বোধনে মূর্ধন্য-ষ দিয়ে ‘এ’ আর স্ত্রীবাচক সম্বোধনে দন্ত্য-স দিয়ে আসু’ ব্যবহার করা হয়। যেমন:

পুরুষবাচক: কল্যাণবরেষু, কল্যাণীয়েষু, পূজনীয়েষু, প্রিয়বরেষু, মাননীয়েষু, মান্যবরেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু, শ্রীচরণেষু ইত্যাদি।

স্ত্রীবাচক: কল্যাণবরাসু, কল্যাণীয়াসু, পূজনীয়াসু, মাননীয়াসু, মান্যবরাসু, শ্রদ্ধাস্পদাসু, শ্রীচরণাসু ইত্যাদি।

৮. ‘অ’ এবং ‘আ’ এই দুটি স্বরধ্বনির পর ‘স’ বসে। যেমন: তিরস্কার, পুরস্কার, নমস্কার, বৃহস্পতি, আস্পদ, আস্ফালন, আস্কারা,পরস্পর, তেজস্কর, ভাস্কর, স্নেহাস্পদ, শ্রদ্ধাস্পদ, শ্রদ্ধাস্পদাসু, কল্যাণীয়াসু ইত্যাদি। ব্যতিক্রমঃ বাষ্প (স্বভাবতই ‘ষ’ বসেছে)। ‘অ’ এবং ‘আ’ বাদে বাকি ৯ টি (ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ) স্বরধ্বনির পর মূর্ধন্য-ষ বসে। যেমন: অভিষেক, অভিষিক্ত, অনুষ্ঠান, অনুষঙ্গ, বিষ, বিষয়, বিষম, বিষাদ, আয়ুষ্মন, আয়ুষ্কাল, আবিষ্কার, আবিষ্কৃত, পরিষ্কার, পরিষ্কৃত, বহিষ্কার, বহিস্কৃত, দুষ্কর, দুষ্কৃত, দুষ্কৃতি, চতুষ্পদ, চতুষ্কোণ, নিস্পাপ, নিষ্কলুষ, নিষ্ক্রিয়, নিষ্কৃতি, নিষ্কলঙ্ক, নিষ্কাম, নিষ্পত্তি, নিষ্প্রাণ, নিষ্প্রয়োজন, নিষ্ফল, নিষ্ফলা, অনিষ্ট, নিকৃষ্ট, নিষ্পন্ন, নিষুপ্ত, নির্বিষ, পৃষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান, ভবিষ্যৎ, ভূমিষ্ঠ, সুষম, সুষুপ্ত, সুষ্ঠু ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম – ১: নিস্তব্ধ, নিস্তার, নিস্তেজ, বিস্তার, বিস্তৃত, বিস্তারিত, বিস্তীর্ণ, পরিস্থিতি – এই শব্দগুলোতে ‘ই-কার’ এর পরে ‘ষ’ বসার কথা থাকলেও ‘স’ বসেছে। [মনে রাখার কৌশল: ‘ত’ বর্গীয় ধ্বনির যুক্ত ব্যঞ্জনে সর্বদা ‘স’ বসে]।

ব্যতিক্রম – ২: ‘স্ফুট’ ও ‘ফুর’ ধাতু দ্বারা গঠিত শব্দে সর্বদা দন্ত্য-স বসে। যেমন: পরিস্ফুট, দন্তস্ফুট, বিস্ফোটক, বিস্ফোরণ, বিস্ফুরণ ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম – ৩: অভিসন্ধি, অভিসম্পাত, অভিসার, অনুসন্ধান, অনুসরণ, অনুসারী, অনুসৃত, নিঃস্পৃহ, নিস্পন্দ, পরিসংখ্যান, পরিসর, পরিসমাপ্তি, পরিসম্পদ, পরিসীমা, পরিস্রবণ, পরিসুতি, বিসর্গ, বিসর্জন, বিস্ময়, বিস্মিত, বিস্মৃতি, বিস্বাদ, সুস্পষ্ট, সুসময়, সুসজ্জিত, সুসংবাদ, সুস্মিতা, শুচিস্মিতা, মৃদুস্মিতা। এই শব্দগুলাের ক্ষেত্রে ‘ষ’ বসার কথা থাকলেও ‘স’ বসে।

৯.কতগুলো শব্দে স্বভাবতই মূধর্ন্য-ষ হয়। যেমন:

আষাঢ়, শেষ, ঈষৎ,মেষ,ভাষা, কলুষ, ভাষ্য, 

মানুষ,ষোড়শ,কোষ, পৌষ, রোষ,ষট্,

পুরুষ, ষণ্ড,প্রত্যুষ,আভাষ,ভাষণ,অভিলাষ,পোষণ,

ঊ-ষর,তোষণ, ঊষা, শোষণ,ঔষধ,বিষাণ,

ষড়যন্ত্র ,পাষাণ,বিশেষ,ভূষণ, সরিষা, দূষণ।

এক নজরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

  • ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান ব্যাকরণের কোন অংশে আলোচিত হয়?উ: ধ্বনিতত্ত্বে। কারণ এটি ধ্বনি সম্বন্ধীয় বিষয়।
  • ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান কোন শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?উ: বাংলা ভাষায় ৫ প্রকার শব্দ রয়েছে। যথা: তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি। এর মধ্যে শুধু তৎসম শব্দের বানানের ক্ষেত্রে ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য।
  • কোন শব্দে সাধারণত ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়?উ: তৎসম শব্দ ব্যতিত অন্যান্য শব্দের ক্ষেত্রে ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

0 out of 0 Marked as Helpfull !