সন্ধি বিচ্ছেদ Last updated: 4 months ago

  • সন্নিহিত দুটো ধ্বনির মিলনের নাম সন্ধি। এ-কারণে সন্ধিতে কীসের মিলন ঘটে প্রশ্নের উত্তর হবে – ধ্বনির মিলন ঘটে। তবে অপশনে যদি ধ্বনি না থাকে তাহলে বর্ণের দাগাতে হবে।
  • সন্ধি ব্যাকরণের ধ্বনিতত্তের আলোচ্য বিষয়
  • সন্ধি শব্দের অর্থ মিলন, ঐক্য, ভক্তি। আর এর বিপরীত হচ্ছে বিচ্ছেদ/ বিগ্রহ।
  • সন্ধি শব্দটি তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ। এটি কৃৎ প্রত্যয় সাধিত শব্দ যার বিশ্লেষণ সম্+ধা+। তবে যদি এরকম প্রশ্ন আসে যে সন্ধি’ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কী? তাহলে উত্তর হবে সম + ধি যা ব্যঞ্জন সন্ধির উদাহরণ।
  • সন্ধির উদ্দেশ্য  টি (স্বাভাবিক উচ্চারণে সহজ প্রবণতা ও ধ্বনিগত মাধুর্য সম্পাদন)।

১ বাংলা সন্ধি কত প্রকার? = ২ প্রকার (স্বরসন্ধি ও ব্যঞ্জনসন্ধি)।

২. তৎসম সন্ধি কত প্রকার? = ৩ প্রকার (স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গ সন্ধি)।

বাংলা শব্দের স্বরসন্ধি

৩. স্বরসন্ধিতে কোন কোন ধ্বনির মিলন হয়? = স্বরধ্বনির সাথে স্বরধ্বনির

৪. স্বরসন্ধি চিহ্নিতকরণের সহজ উপায়: দুটি পদের প্রথমটির শেষে যে-কোনো একটি স্বরধ্বনি থাকবে এবং দ্বিতীয়টির প্রথমে যে কোনো একটি স্বরধ্বনি থাকবে। এই দুটো স্বরধ্বনি হতে একটি লোপ পাবে। যেমন: শাঁখা (শ্‌+আ+খ্‌+আ) + আরি(আ+র্‌+ই) = শাঁখারি; শত (শ্‌+অ+ত্‌+অ) + এক (এ+ক্‌) = শতেক (শ্‌+অ+ত্‌+এ+ক্‌)।

বাংলা শব্দের ব্যঞ্জনসন্ধি।

৫. বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি কোন রীতিতে সীমাবদ্ধ? = কথ্য রীতিতে।

৬. বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি গঠিত হতে পারে = ৩টি উপায়ে। যথা:

ক) স্বরে + ব্যঞ্জনে: কাঁচা (ক্‌+আ+চ্‌+আ) + কলা (ক্‌+অ+ল্‌+আ) = কাঁচকলা (ক্+আ+চ্‌+ক্‌+অ+ল্‌+আ)।

খ) ব্যঞ্জনে + স্বরে: তিন (ত্‌+ই+ন্‌) + এক (এ+ক্‌) = তিনেক (ত্‌+ই+ন্+এ+ক্‌)।

গ) ব্যঞ্জনে + ব্যঞ্জনে: বদ (ব্‌+অ+দ্‌) + জাত (জ্‌+আ+ত্‌) = বজ্জাত (ব্‌+অ+,জ্‌+জ্‌+আ+ত্‌)।

৭. সন্ধিতে স্বরধ্বনির পর ব্যঞ্জনধ্বনি এলে স্বরধ্বনিটি লুপ্ত হয়। যেমন: কাঁচা (ক্‌+আ+চ্‌+আ) + কলা (ক্‌+অ+ল্‌+আ) = কাঁচকলা।(ক্‌+আ+চ্‌+ক্‌+অ+ল্‌+আ), নাতি + বউ = নাতবউ, রাজা + পুত্র = রাজপুত্র, ঘোড়া + গাড়ি = ঘোড়গাড়ি।

৮. সন্ধিতে হলন্ত ধ্বনির পর অর্থাৎ ব্যঞ্জন ধ্বনির পর স্বরধ্বনি যুক্ত হলে স্বরের লোপ হয় না। যেমন: বোন (ব্‌+ও+ন্‌) + আই

(আ+ই) = বোনাই (ব্‌+ও+ন্+আ+ই); তিন (ত্‌+ই+ন্‌) + এক (এ+ক্‌) = তিনেক (ত্+ই+ন্‌+এ+ক্‌)।

৯. প্রকৃত বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি ধ্বনি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার সমীভবনের নিয়মে গঠিত হয়। তবে এই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৃত বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি’ বলতে কোনগুলোকে বোঝানো হয়েছে। ৬ নং এ উল্লিখিত ব্যঞ্জন  সন্ধির ৩টি নিয়মের দিকে ভালো করে লক্ষ করুন। এই ৩টি উপায়ের প্রথম দুটিতে প্রথমে বা পরে কোনো না কোনো জায়গায় স্বর যুক্ত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় পদ্ধতিতে ১ম শব্দের শেষে ও ২য় শব্দের শুরুতে উভয় জায়গায় ব্যঞ্জন যুক্ত হয়েছে। তাই এটিকে বলা হয় প্রকৃত বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি। এবার এই ৩য় পদ্ধতিতে উল্লিখিত উদাহরণের দিকে লক্ষ করুন।

বদ (ব্‌+অ+দ্‌) + জাত (জ্‌+আ+ত্‌) = বজ্জাত (ব্‌+অ+জ্‌+জ্‌+আ+ত্‌)। তাহলে দেখুন, ‘দ’ আর ‘’ এই দুটির মধ্যে একটি ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে আরেকটির মতো হয়ে গিয়েছে যা সমীভবনের বৈশিষ্ট্য। সুতরাং প্রকৃত বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি ধ্বনি পরিবর্তনের সমীভবনের নিয়মে গঠিত হয়।

বাংলা ব্যঞ্জন সন্ধি গঠনের কিছু সূত্র।

ক. অঘোষ+ঘোষ =দুটো মিলে ঘোষ হয়।

ছোট্ + দা = ছোড়দা (ট্‌>ড়)

রাত + দিন = রাদ্দিন (ত্>দ)

বট + গাছ = বডগাছ (ট্‌>ড)

খ. ঘোষ+অঘোষ =দুটো মিলে অঘোষ হয়।

রাগ + করা = রাকক্‌রা (গ > ক্‌)

কাজ + করা = কাচ্‌করা (জ > চ)

সব + পাওয়া = সপ্‌পাওয়া (ব > প)

গ. চ বর্গীয় ধ্বনি + শ্‌,ষ্‌,স্ = ‘চ’ বর্গীয় ধ্বনি শ / স হয়।

পাঁচ + শ = পাঁশ্‌শ (চ > শ)

পাঁচ + সিকা = পাঁস্‌সিকা (চ > স)

পাঁচ + সের = পাঁস্‌সের (চ > স)

তৎসম শব্দের স্বরসন্ধি

১০. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘আ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘আ-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে আবার ২য় শব্দের শুরুতে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে। এখন ১ম শব্দের শেষে ও ২য় শব্দের শুরুতে ‘অ’ বসবে না কি ‘আ’ বসবে তা নিভর করে বিচ্ছেদকৃত শব্দের অর্থ ও সন্ধিবদ্ধ শব্দের সাথে ওই অর্থের সংশ্লিষ্টতার ওপর। যেমন: মহার্ঘ।

প্রদত্ত শব্দের মাঝে ‘’ কার আছে। তাহলে বিচ্ছেদের জন্য “আ-কার’ এর জায়গায় আলাদা করে ফেলতে হবে। এখন ১ম। শব্দের শেষে যদি ‘’ আছে ধরি তাহলে ‘মহ’ শব্দের কোনাো অর্থ হয় না। তার মানে ১ম শব্দের শেষে হবে ‘মহা’। আবার ২য় শব্দের শুরুতে যদি ‘’ আছে ধরি তাহলেই আমরা অর্থবহ শব্দ। ‘অর্ঘ’ পাই। তাছাড়া অভিধানে ‘আর্ঘ’ শব্দের কোনো ভুক্তি নেই। তার মানে মহার্ঘ = মহা + অর্ঘ।

হিমাচল- উপরের উদাহরণের মতো শব্দের মাঝখানে যেখানে ‘আ-কার’ আছে সেখানে ভেঙে ফেললে ১ম শব্দের শেষে যদি ‘‘ আছে ধরি তাহলে পাই ‘হিম’ যার অর্থ ঠান্ডা। আবার ২য় শব্দের শুরুতে যদি ‘’ আছে ধরি তাহলে পাই ‘অচল’ যার অর্থ পাহাড়। তাহলে ‘হিমাচল’ শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ হবে হিম + অচল যার অর্থ ঠান্ডা স্থান। দ্রষ্টব্য: হিম + আচল – বহুল প্রচলিত হলেও এটা ভুল।

অন্যান্য = অন্য + অন্য

অপরাপর = অপর + অপর

আদ্যাক্ষর = আদ্য + অক্ষর

নিন্দাহ = নিন্দা + অর্হ

সানন্দ = স + আনন্দ

আশাতীত = আশা + অতীত

তথাপি = তথা + অপি

আশানুরূপ = আশা + অনুরূপ

স্বর্ণাক্ষর = স্বর্ণ + অক্ষর

কথামৃত = কথা + মৃত

স্বাধিকার = স্ব + অধিকার

দ্বীপান্তর = দ্বীপ + অন্তর

বিন্ধ্যাচল = বিন্ধ্য + অচল

স্বাধীন = স্ব + অধীন

দ্বৈপায়ন = দ্বীপ + আয়ন

স্বায়ত্ত = স্ব + আয়ত্ত

যথাযথ = যথা + অযথ

গীতাঞ্জলি = গীত + অঞ্জলি

ধর্মাধর্ম = ধর্ম + অধর্ম

রত্নাকর = রত্ন + আকর

হিতাহিত = হিত + অহিত

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থ: আগার – স্থানকুশ – তৃণবিশেষকুশাসন – তৃণ নির্মিত আসনঅপি – অধিকন্তু, তথাপি – তা সত্তেও, দাব – অরণ্য, অৰ্হ – উপযুক্ত, আপন্ন – বেষ্টিত, বিন্ধ্য – মধ্যভারতে অবস্থিত পর্বতমালাবিশেষ, অচল – পাহাড়, আকর – খনি / উৎস, অহিত – অকল্যাণ।

১১. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে এ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘এ-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘ই’ বা ‘ঈ বসবে। যেমন:

অপেক্ষা = অপ + ঈক্ষা

নরেন্দ্র = নর + ইন্দ্র

মহেন্দ্র = মহা + ইন্দ্র

অবেক্ষণ = অব + ঈক্ষণ

মহেশ = মহা + ঈশ

স্বেচ্ছা = স্ব + ইচ্ছা

পরেশ = পর + ঈশ

যথেচ্ছা = যুথা + ইচ্ছা

গণেশ = গণ + ঈশ

যথেষ্ট = যথা + ইষ্ট

দেবেন্দ্র = দেব + ইন্দ্র

পূর্ণেন্দু = পূর্ণ + ইন্দু।

রমেশ = রমা + ঈশ

১২সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘ঐ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ঐ-কার এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে। আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘এ’ বা ‘ঐ বসবে। যেমন: জনৈক – প্রথমে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বিচ্ছেদ করে নেওয়া যাক।

  1. জন + এক [অ + এ]
  2. জন + ঐক [অ + ঐ]
  3. জনা + এক [আ + এ]
  4. জনা + ঐক [আ + ঐ]

[লক্ষ করে দেখুন ‘জনা’ শব্দের কোনো অর্থ হয় না। তার মানে। প্রথমাংশ ‘জন হবে এটা নিশ্চিত। এবারে ভাবুন ‘এক’ আর। ‘ঐক’ কোনটির অর্থ আছে? ‘ঐক’ শব্দের কোনো অর্থ নেই। তার । মানে দ্বিতীয়াংশ হবে ‘এক’। তার মানে জনৈক = জন + এক।]

মতৈক্য – প্রথমে সম্ভাব্য সকল উপায়ে বিচ্ছেদ করে নেওয়া যাক।

  1. মত + এক্য [অ + এ]
  2. মত + ঐক্য [অ + ঐ]
  3. মতা + এক্য [আ + এ]
  4. মতা + ঐক্য [আ + ঐ]

[লক্ষ করে দেখুন ‘মতা’ শব্দের কোনো অর্থ হয় না। তার মানে। প্রথমাংশ ‘মত’ হবে এটা নিশ্চিত। এবারে ভাবুন ‘এক্য আর। ‘ঐক্য কোনটির অর্থ আছে? ‘এক্য’ শব্দের কোনো অর্থ নেই। তার। মানে দ্বিতীয়াংশ হবে ‘ঐক্য। তার মানে মতৈক্য = মত + ঐক্য।]

অতলৈশ্বর্য = অতল + ঐশ্বর্য

পরমৈশ্বর্য = পরম + ঐশ্বর্য

মহৈশ্বর্য = মহা + ঐশ্বর্য

একৈক = এক + এক

বিপুলৈশ্বর্য = বিপুল + ঐশ্বর্য

রাজৈশ্বর্য = রাজ + ঐশ্বর্য

তথৈব = তথা + এব

মহৈক্য = মহা + ঐক্য

সদৈব = সদা + এব

সর্বৈব = সর্ব + এব

হিতৈষণা = হিত + এষণা

হিতৈষী = হিত + এষী

১৩. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ও-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ও-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘উ’ বা ‘ঊ’ বসবে। যেমন:

শিল্পোন্নত =শিল্প + উন্নত

গঙ্গোর্মি = গঙ্গা + ঊর্মি

আদ্যোপান্ত = আদ্য + উপান্ত

মুখোপাধ্যায় = মুখ + উপাধ্যায়

উত্তরোত্তর = উত্তর + উত্তর

বন্যোত্তর = বন্যা + উত্তর

মূলোচ্ছেদ = মূল + উচ্ছেদ

একোন = এক + উন

নবোঢ়া = নব + ঊঢ়া

বিদ্যোৎসাহী = বিদ্যা+উৎসাহী

যথোচিত = যথা + উচিত

একোনবিংশ = এক+উনবিংশ

নরোত্তম = নর + উত্তম

কথোপকথন = কথা+উপকথন

গঙ্গোপাধ্যায় = গঙ্গা+উপাধ্যায়

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থ: উঢ়া – বিবাহিত, উপান্ত – প্রান্ত, উপকথন – জনশ্রুত কাহিনি বা উপাখ্যান, উৎপল – পদ্ম।

১৪. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘ঔ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ঔ-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘ও’ বা ‘ঔ’ বসবে।

মহৌষোধ = মহা+ ঔষধ

বনৌষধি = বন +ঔষধি

ঔষধ /ঔষধি/ ওষধ / ওষধি – কোনটি কোথায় ব্যবহার করব। কোথায় কী বসবে তা সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে শব্দগুলোর অর্থ জানতে হবে। তাহলে প্রথমে শব্দগুলোর অর্থ জেনে নেই –

  • ঔষধ – এর অর্থ রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধের জন্য প্রযুক্ত দ্রব্যাদি।
  • ঔষধি – এর অর্থ যে সকল গাছ গাছড়া থেকে ঔষধ তৈরি হয়।
  • ওষধি – এর অর্থ একবার ফল দিয়েই যে গাছ মরে যায়।

প্রশ্নে উল্লিখিত শব্দের শেষে যদি কেবল ‘ধ’ থাকে অর্থাৎ মহৌষধ/বনৌষধ/দিব্যৌষধ / জলৌষধ /উত্তমৌষধ – এগুলোর সন্ধি বিচ্ছেদ নির্ণয়ে কোনো ঝামেলা হবে না। এর কারণ আমাদের সমস্যা হয় ‘ও’ বসবে না কি ‘ঔ’ বসবে তা নিয়ে। এখন মহৌষধ / বনৌষধ / দিব্যৌষধ / উত্তমৌষধ – এগুলোর ২য় অংশের শুরুতে ‘ঔ’ বসবে অর্থাৎ ঔষধ’ হবে এটা নিশ্চিত। কারণ ‘ও’ বসালে অর্থাৎ ‘ওষধ’ বললে তা আভিধানিকভাবে কোনো অর্থবহ শব্দ হয় না। আমাদের সমস্যা হয় যখন প্রশ্নে উল্লিখিত শব্দের শেষে ‘ধি’ থাকে। অর্থাৎ মহৌষধি / বনৌষধি / দিব্যৌষধি / জলৌষধি / উত্তমৌষধি – এগুলোর সন্ধি বিচ্ছেদ নির্ণয়ে ঝামেলা হয়। এর কারণ এই শব্দগুলোর বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়াংশে ‘ও’ বসালে হবে ‘ওষধি’ আর ‘ঔ’ বসালে হবে ‘ঔষধি’ যার দুটিই আভিধানিকভাবে অর্থবহ। শব্দ। এখন পরীক্ষায় তাহলে এগুলো থেকে প্রশ্ন আসলে সন্ধি বিচ্ছেদ কোনটি দাগাবো?

বাংলা একাডেমির “আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘মহৌষধি’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ দেওয়া আছে ‘মহা + ঔষধি’ কিন্তু প্রাচীন অনেক মৌলিক লেখকদের বইয়ে ‘মহৌষধি’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ দেওয়া আছে ‘মহা + ওষধি। এখন অর্থ অনুসারে আপনারাই চিন্তা করুন কোনটি সঠিক? ‘ঔষধি’ মানে যে সকল গাছ গাছড়া থেকে ঔষধ তৈরি হয়। এই হিসেবে ‘মহৌষধি’ শব্দের অর্থ যে সকল গাছ গাছড়া থেকে ঔষধ তৈরি হয় এমন মহা প্রতিষেধক। আর ‘ওষধি’ মানে একবার ফল দিয়েই যে গাছ মরে যায়। এই হিসেবে ‘মহৌষধি’ শব্দের অর্থ একবার ফল দিয়েই মরে যায় এমন মহান গাছ – এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা বিষয়।

সুতরাং পরীক্ষায় ‘মহৌষধি’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ জানতে চাইলে সর্বোত্তম উত্তর হবে মহা + ঔষধি। তবে অপশনে যদি এটা না থাকে সেক্ষেত্রে মহা + ওষধি থাকলে তা দাগাতে হবে। তবে অপশনে দুটিই থাকলে অবশ্যই মহা + ঔষধি হবে।

জলৌকা = জল + ওকা

মাংসৌদন = মাংস + ওদন

মহৌদাস্য = মহা + ঔদাস্য

দিব্যৌষধ = দিব্য + ঔষধ

জলৌষধি = জল + ঔষধি

মহৌষধি = মহা + ঔষধি

মহৌৎসুক্য = মহা + ঔৎসুক্য

উত্তমৌষধ = উত্তম + ঔষধ।

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থ: ওদন – অন্ন / ভাত, ঔদাস্য – উদাসীনতা, জলৌকা – জোঁক।

১৫. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে রেফ থাকলে বিচ্ছেদের সময় রেফ এর ১ম শব্দের শেষে ‘অ’ বা ‘আ’ বসবে । আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘ঋ’ বসবে। যেমন:

অধমর্ণ = অধম + ঋণ

তৃষ্ণার্ত = তৃষ্ণা + ঋত

বন্যার্ত = বন্যা + ঋত

রাজর্ষি = রাজা + ঋষি

উত্তমর্ণ = উত্তম + ঋণ

দুঃখার্ত = দুঃখ + ঋত

সপ্তর্ষি = সপ্ত + ঋষি

ক্ষুধার্ত = ক্ষুধা + ঋত

দেবর্ষি = দেব + ঋষি

ভয়ার্ত = ভয় + ঋত

শীতার্ত = শীত + ঋত

ঘর্মার্ত = ঘর্ম + ঋত।

পরমর্ষি = পরম + ঋষি

বেদনার্ত = বেদনা + ঋত

মহর্ষি = মহা + ঋষি

কিছু শব্দার্থ: অধমর্ণ – দেনাদার, উত্তমর্ণ – পাওনাদার, ঋত – পূজিত/প্রাপ্ত/পীড়িত,দীপ্ত, মহর্ষি- রাজা হয়েও যিনি ঋষির মতো জীবন যাপন করেন, সপ্তর্ষি – সাতজন ঋষির নামে খ্যাত উত্তর আকাশে দৃশ্যমান নক্ষত্রপুঞ্জবিশেষ।

১৬. সান্ধবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘ঈ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ঈ-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘ই’ বা ‘ঈ’ বসবে আবার ২য় শব্দের শুরুতে ই বা ঈ’ বসবে। যেমন:

অতীত = অতি + ইত

গিরীশ = গিরি + ঈশ

প্রতীতি = প্রতি + ইতি

যতীশ = যতি + ঈশ

দিল্লীশ্বর = দিল্লী + ঈশ্বর

পরীক্ষা = পরি + ঈক্ষা

ভর্তীচ্ছু = ভর্তি + ইচ্ছু

পৃথ্বীশ = পৃথ্বী + ঈশ

মহীশ = মহী + ঈশ

ক্ষিতীশ = ক্ষিতি + ঈশ

টেকনিক: ২য় শব্দের শুরুতে ‘ই’ না ‘ঈ’ কোনটি বসবে তার জন্য ২টি লাইন মনে রাখতে পারেন।

ঈক্ষা, ঈপ্সা, ঈশ – ঈ-কার’ দিস। অর্থাৎ এই ৩টি দিয়ে শব্দ নির্মিত হলে ‘’ বসবে। অন্য সব জায়গায় ‘’ বসবে।

১৭. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে য-ফলা’ থাকলে বিচ্ছেদের সময় য-ফলা’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘ই’ বা ‘ঈ’ বসবে।আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘ই’ বা ‘ঈ’ ছাড়া অন্য যে-কোন স্বর বসবে। যেমন:

অগ্ন্যুৎপাত = অগ্নি + উৎপাত

অভ্যাগত = অভি + আগত

ব্যক্তি = বি + উক্তি

অভ্যুত্থান = অভি + উত্থান।

প্রত্যহ = প্রতি + অহ

ব্যতিক্রম = বি + অতিক্রম

অত্যধিক = অতি + অধিক

অভ্যুদয় = অভি + উদয়

প্রত্যুক্তি = প্রতি + উক্তি

ব্যতীত = বি + অতীত

অত্যুক্তি = অতি + উক্তি

আদ্যন্ত = আদি + অন্ত

প্রত্যুপকার = প্রতি + উপকার

বহূৎসব = বহ্নি + উৎসব

ইত্যাদি = ইতি + আদি

প্রত্যুত্তর = প্রতি + উত্তর

ব্যর্থ = বি + অর্থ

গত্যন্তর = গতি + অন্তর

প্রত্যাশা = প্রতি + আশা

ব্যুৎপত্তি = বি + উৎপত্তি

জাত্যভিমান = জাতি + অভিমান

প্রত্যুষ = প্রতি + উষ

মস্যাধার = মসী + আধার

নদ্যম্বু = নদী + অম্বু

অধ্যয়ন = অধি + অয়ন

যদ্যপি = যদি + অপি

নদূর্মি = নদী + উর্মি

প্রত্যাবর্তন = প্রতি + আবর্তন

শুদ্ধ্যশুদ্ধি = শুদ্ধ + অশুদ্ধি

অভ্যন্তর = অভি + অন্তর

১৮. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘র্য’ থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘র্য’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে পরি বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘আ’, ‘আ’ বা ‘উ বসবে। যেমন:

পর্যন্ত = পরি + অন্ত

পর্যাকুল = পরি + আকুল

পর্যায় = পরি + আয়।

পর্যালোচনা = পরি + আলোচনা

পর্যবেক্ষণ = পরি + অবেক্ষণ

পর্যাপ্ত = পরি + আপ্ত

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থঃ অবেক্ষণ – অবলোকন/দর্শন ,পর্যাকল অতিশয় কাতর, আপ্ত – প্রান্ত পর্ব।

১৯. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ঊ-কার থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ঊ-কার’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে “উ বা ‘ঊ’ বসবে। আবার ২য় শব্দের শুরুতে ‘উ’ বা ‘ঊ বসবে। যেমন:

ভানুদয় = ভানু + উদয়

সাধূক্তি = সাধু + উক্তি

অনূদিত = অনু + উদিত

বহুব্ধ = বহু + উর্ধ্ব।

ভূর্ধ্ব = ভূ + উর্ধ্ব

সাধূচিত = সাধু + উচিত

কটুক্তি = কটু + উক্তি

বধূক্তি = বধূ + উক্তি

মরূদ্যান = মরু + উদ্যান

গুরুপদেশ = গুরু + উপদেশ

বধূৎসব = বধূ + উৎসব।

লঘূর্মি = লঘু + ঊর্মি

গুরুক্তি = গুরু + উক্তি

তনূর্ধ্ব = তনু + ঊর্ধ্ব

বিধৃদয় = বিধু + উদয়

সাধূত্তম = সাধু + উত্তম

২০. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘ব-ফলা’ থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ব-ফলা’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘উ’ বা ‘ঊ’ বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে ‘উ’ বা ‘ঊ’ ছাড়া অন্য যে-কোনো স্বর বসবে। যেমন:

অন্বেষণ = অনু + এষণ।

পশ্বধম = পশু + অধম।

পশ্বাদি = পশু + আদি

বধ্বানয়ন = বধূ + আনয়ন

অন্বিত = অনু + ইত

পশ্বাচার = পণ্ড + আচার

তন্বী = তনু + ঈ

বধ্বাগমন = বধূ + আগমন

মন্বন্তর = মনু + অন্তর।

স্বচ্ছ = সু + অচ্ছ

স্বল্প = সু + অল্প

স্বাগত = সু + আগত

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থ: অন্বয় – সম্বন্ধ / মিল, অনু – পশ্চাৎ/পেছন দিক, অয় – লোহা/ নরক, পশ্বাচার – পশুর মতো আচরণ, পশ্বধম – পশুর চেয়েও অধম, মন্বন্তর- আকাল / দুর্ভিক্ষ, অচ্ছ – স্ফটিক / নির্মল।

২১. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ত্র’ এর পরিবর্তে ১ম শব্দের শেষে ‘ঋ-কার’ বসবে আর ২য় শব্দের শুরুতে

‘ঋ-কার’ ছাড়া অন্য যে-কোনো স্বর বসবে।  যেমনঃ

ধাত্রী = ধাতৃ + ঈ

পিত্রাদেশ = পিতৃ + আদেশ

পিএনুমতি = পিতৃ + অনুমতি

পিত্রালয় = পিতৃ – আলয়

পিত্রৈশ্বর্য = পিতৃ + ঐশ্বর্য

পিত্ৰৰ্থ = পিতৃ + অর্থ

পিত্রিচ্ছা = পিতৃ + ইচ্ছা

মাত্রাদেশ = মাতৃ + আদেশ

২২. সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে অয়, আয়, অব, আব উচ্চারিত হলে বিচ্ছেদের সময় তার পরিবর্তে যথাক্রমে এ-কার/ঐ-কার /ঔ-কার বসে। যেমনঃ

গবাদি = গো + আদি [অব = ও]

নয়ন = নে + অন [অয় = এ]

পবন = পো + অন [অব = ও]

ভাবুক = ভৌ + উক [আব = ঔ]

গবেষণা = গো + এষণা [অব = ও]

নাবিক = নৌ + ইক [আব = ঔ]

পবিত্র = পো + ইত্ৰ [অব = ও]

লবণ = লো + অন [অব = ও]

পাবক = পৌ + অক [আব = ঔ]

শয়ন = শে + অন [অয় = এ]

গায়ক = গৈ + অক [আয় = ঐ]

নায়ক = নৈ + অক [আয় = ঐ]

টেকনিকঅব = ও । অয় = এ । আব = ঔ। আয় = ঐ

দ্বিধান্বিত কিছু স্বরসন্ধি

আদ্যন্ত / আদ্যান্ত সমস্যা: আদি + অন্ত = আদ্যন্ত সঠিক না কি আদ্য + অন্ত = আদ্যান্ত সাঠক? – মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরকম ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা মূল শব্দের অর্থের সাথে বিচ্ছেদকত অর্থের সমন্বয় করে সঠিক উওর নির্বাচন করে থাকি। যেমন: হিমাচল’ – শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ হিসেবে আমরা দুটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণ করতে পারি। প্রথমত, হিম + অচল আর দ্বিতীয়ত, হিম + আচল। এখন কোনটি সঠিক তা নির্ণয়ের জন্য আমাদের মূল শব্দ ও বিচ্ছেদকৃত শব্দের অর্থ জানতে হবে।। ‘হিমাচল’ দ্বারা বোঝায় ঠান্ডা স্থান, ‘হিম’ শব্দের অর্থ ঠান্ডা, ‘অচল’ শব্দের অর্থ পাহাড় আর ‘আচল’ শব্দটি মূলত ‘আঁচল’ অর্থাৎ শাড়ির প্রান্তভাগ শব্দের অশুদ্ধ কিন্তু প্রচলিত রূপ। এখন হিম + আচল বললে অর্থ দাঁড়ায় শাড়ির ঠান্ডা প্রান্তভাগ যা ‘হিমাচল’ শব্দের অর্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অপরদিকে হিম + অচল বললে অর্থ দাঁড়ায় ঠান্ডা বা বরফাবৃত পাহাড় যা ‘হিমাচল’ শব্দের অর্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এ কারণে হিমাচল = হিম + অচল।

এখন সমস্যা হচ্ছে আদ্যন্ত / আদ্যান্ত নিয়ে। কারণ অভিধানে ‘আদি’ আর ‘আদ্য’ দুটো শব্দেরই অস্তিত্ব রয়েছে এবং দুটো শব্দের অর্থ একই। “আদি/ আদ্য’ মানে প্রথম আর ‘অন্ত’ মানে শেষ। এখন লক্ষণীয় বিষয় এটাই যে অভিধানে ‘আদ্যন্ত’ বা ‘আদ্যান্ত’ শব্দ সম্পর্কে কী আছে? অভিধানে ‘আদ্যান্ত’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই; ‘আদ্যন্ত’ শব্দের উল্লেখ আছে যার অর্থ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। তার মানে বলা যায়। আদি + অন্ত = আদ্যন্ত শব্দটি সঠিক।

২৪. আদ্যক্ষর / আদ্যাক্ষর সমস্যা: ‘আদ্যন্ত’ বা ‘আদ্যান্ত’ এর মতো ‘আদ্যক্ষর’ বা ‘আদ্যাক্ষর’ এর সন্ধিবিচ্ছেদ নিয়েও ঝামেলা আছে। আদি+ অক্ষর = আদ্যক্ষর সঠিক না কি আদ্য + অক্ষর = আদ্যাক্ষর সঠিক? এক্ষেত্রেও ‘আদি’ বা ‘আদ্য’ দুটো শব্দের অর্থ অভিধানে থাকলেও অভিধানে ‘আদ্যক্ষর’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই; আছে আদ্য + অক্ষর = আদ্যাক্ষর।

২৫. আদ্যপান্ত / আদ্যোপান্ত সমস্যা: এক্ষেত্রেও ‘আদি’ বা ‘আদ্য’ দুটো শব্দের অর্থ অভিধানে থাকলেও অভিধানে ‘আদ্যপান্ত’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই; আছে আদ্য + উপান্ত = আদ্যোপান্ত

২৬. স্বাধীন/স্বল্প /স্বচ্ছ /স্বেচ্ছা সমস্যা: স্বাধীন, স্বল্প, স্বচ্ছ, স্বেচ্ছা – এই শব্দগুলোর সন্ধি বিচ্ছেদ করতে গিয়ে অনেকই তালগোল পাকিয়ে ফেলে। সু + অধীন = স্বাধীন না কি স্ব + অধীন = স্বাধীন? সু + অল্প = স্বল্প না কি স্ব + অল্প = স্বল্প? এক্ষেত্রে  আমাদের দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ হচ্ছে বিচ্ছেদের পর প্রথমাংশে ‘সু’ বসালেও তার অর্থ হয় আবার ‘স্ব’ বসালেও তার অর্থ হয়। সু মানে ভালো/অনেক আর ‘স্ব’ মানে নিজের

এখন লক্ষ্য করতে হবে কোনটি বসালে সন্ধিবদ্ধ শব্দের সাথে অর্থের সংশ্লিষ্টতা রক্ষা হয়। যেমন: ‘স্বাধীন’ এর বিশ্লেষণ হিসেবে সু + অধীন। বললে অর্থ হয় ভালো অধীন যা “স্বাধীন’ শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো অর্থবহ কিছুই হয় না। কিন্ত স্ব + অধীন বললে হবে নিজের অধীন = যা স্বাধীন শব্দের অর্থের পরিপূরক। সুতরাং সঠিক উত্তর স্ব + অধীন = স্বাধীন

একইভাবে স্বল্প’ শব্দের ক্ষেত্রে সু + অল্প বললে এর অর্থ হয় অনেক অল্প যা ‘স্বল্প’ শব্দের অর্থের পরিপক। কিন্তু স্ব + অল্প বললে হবে নিজের অল্প যা ‘স্বল্প’ শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো অর্থবহ কিছুই প্রকাশ করে না।

স্বচ্ছ বা স্বেচ্ছার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। স্বচ্ছ = সু + অচ্ছ কিন্ত স্বেচ্ছা = স্ব + ইচ্ছা। এখানে ‘সু’ আর ‘স্ব’ এই দুটির ক্ষেত্রে একটির পরিবর্তে অপরটি বসালে তা ভুল হবে।

নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি

নিপাতনে সিদ্ধ বলতে বোঝায় যেগুলো ব্যাকরণের প্রথাগত নিয়ম না মেনে গঠিত হয়েছে সেগুলোকে। একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করছি। যেমন: ‘কুলটা’ শব্দটির বিশ্লেষণ কুল + অটা। এখানে ১ম শব্দের শেষে ও ২য় শব্দের শুরুতে ‘’ আছে। আমরা জানি, অ + অ = আ হয়। কিন্তু ‘কুলটা’ শব্দে ‘আ’ না হয়ে ‘অ’ হয়েছে। তাহলে তা কি ব্যাকরণের নিয়ম মানলো? না, এরকম নিয়ম না মানা সন্ধিগুলোকে বলে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি। নিপাতনে সিদ্ধ স্বর সন্ধির কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো –

০১. অন্যোন্য = অন্য + অন্য ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (অন্যান্য) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = ও

০২. পরোক্ষ = পর + অক্ষ ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (পরাক্ষা) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = ও।

০৩. কুলটা। = কুল + অটা ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (কুলাটা) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = অ।

০৪. সমর্থ= সম + অর্থ ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (সমার্থ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = অ।

০৫. সারঙ্গ = সার + অঙ্গ ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (সারাঙ্গ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = অ।

০৬. মার্তণ্ড = মার্ত + অণ্ড ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (মার্তাণ্ড) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = অ।

০৭. সীমন্ত = সীমন + অন্ত | ব্যাখ্যা: এখানে অ + অ = আ (সীমানত) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = অ।

০৮. স্বৈর।= স্ব + ঈর ব্যাখ্যা: এখানে অ + ঈ = এ (স্বের) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + অ = ঐ।

০৯. প্রৌঢ় = প্র + ঊঢ় ব্যাখ্যা: এখানে অ + উ = ও (প্রোঢ়) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + উ = ঔ।

১০. অক্ষৌহিণী = অক্ষ + ঊহিনী ব্যাখ্যা: এখানে অ + উ = ও (অক্ষোহিণী) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + উ = ও।

১১. শুদ্ধোদন = শুদ্ধ + ওদন। ব্যাখ্যা: এখানে অ + ও = ঔ (শুদ্ধৌদন) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + ও = ও।

১২. রক্তোষ্ঠ = রক্ত + ওষ্ঠ ব্যাখ্যা: এখানে অ + ও = ঔ (রক্তৌষ্ঠ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + ও = ও।

১৩. বিষোষ্ঠ = বিষ + ওষ্ঠ ব্যাখ্যা: এখানে অ + ও = ঔ (বিম্বৌষ্ঠ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + ও = ও।

১৪. প্রেষণ = প্র + এষণ। ব্যাখ্যা: এখানে অ + এ = ঐ (প্রৈষণ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে অ + এ = এ।

১৫. গবাক্ষ = গো + অক্ষ ব্যাখ্যা: এখানে ও + অ = অব (গবষ) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে ও + অ = অবা।

১৬. গবেন্দ্র = গো + ইন্দ্র ব্যাখ্যা: এখানে ও + ই = অব (গবিন্দ্র) হওয়ার কথা, কিন্তু হয়েছে ও + অ = অবে।

সীমন্ত শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে তাদের বইতে উপস্থাপন করেছেন। যেমন:

সীমা + অন্ত = সীমন্ত (ড. এনামুল হক, ড. মাহবুবুল আলম)

সীমন + অন্ত = সীমন্ত (জগদীশ চন্দ্র ঘোষ৷

সীম + অন্ত = সীমন্ত (ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়)

এ ধরনের প্রশ্নের ক্ষেত্রে অপশনে সাধারণত যে কোনো একটি সন্ধি বিচ্ছেদ থাকবে।

উল্লিখিত উদাহরণের কিছু শব্দার্থ: কুলটা – অসতী নারী, গবাক্ষ – জানালা, মার্তণ্ড – সূর্য, স্বৈর — স্বেচ্ছাচারী, সীমন্ত – সিঁথি, অন্যোন্য – পরস্পর, সারঙ্গ – চিত্রা হরিণ, প্রৌঢ় – বয়স্ক, শুদ্ধোদন – বুদ্ধদেবের পিতা, অক্ষৌহিণী – বিপুল সংখ্যক অশ্ব হস্তী ও রথসহ পৌরাণিক প্রণালিতে সমাবিষ্ট সৈন্যবাহিনী, প্রেষণ – প্রণোদনা, রক্তোষ্ঠ – রক্তের ন্যায় লাল। ঠোঁট, বিষোষ্ঠ – তেলাকুচা বা বিম্ব ফলের ন্যায় লাল ঠোঁট। 

তৎসম শব্দের ব্যঞ্জনসন্ধি

(আমরা মাত্র ৭টি জাদুকরি কৌশলে ব্যঞ্জনসন্ধির সকল নিয়মগুলোকেই, আত্মস্থ করা উপায় শিখব)

নিয়ম -১ সন্ধিবদ্ধ শব্দে বর্গীয় বর্ণের ৩য় কলামের বর্ণ [গ, জ, ড (ড়),দ, ব] থাকলে বিচ্ছেদের সময় ওই ৩য় কলামের পরিবর্তে বর্গীয় বর্ণের ১ম কলামের বর্ণ  [ক,চ, ট, ত (ৎ), প] বসে।

টেকনিক: ৩=১

কৃদন্ত = কৃৎ + অন্ত

জগদিন্দ্র = জগৎ + ইন্দ্র

জগদ্বন্ধু = জগৎ + বন্ধু

ডুবন্ত = ডুপ + অন্ত

ণিজন্ত = ণিচ্ + অন্ত

তদন্ত = ত + অন্ত

তদবধি = তৎ + অবধি

তদবধি = তৎ + অবধি

তদ্রুপ = ত + রূপ

দিগগজ = দিক্ + গজ

দিগনির্ণয় = দিক্ + নির্ণয়

দিগবলয় = দিক + বলয়

বাগাড়ম্বর = বাক্ + আড়ম্বর

বাগদান = বাক্ + দান

বাগদেবী = বাক্ + দেবী

ষড়দর্শন = ষট্ + দর্শন

বাগধারা = বাক্ + ধারা

ষড়বর্গ = ষট্ + বর্গ

বাগবিতণ্ডা = বাক্ + বিতণ্ডা

ষড়যন্ত্র = ষ + যন্ত্র

বাগযন্ত্র = বাক্ + যন্ত্র

ষড়ানন = ষট্ + আনন

বাগীশ = বাক + ঈশ

সদানন্দ = সৎ + আনন্দ

ষড়ঋতু = ষ + ঋতু

সদুপায় = সৎ + উপায়

ষড়ঙ্গ = ষট্ + অঙ্গ

সুবন্ত = সুপ + অন্ত

নিয়ম -২ কোনো সন্ধিজাত শব্দের মধ্যে বগীয় বর্ণের ৫ম কলামের বর্ণগুলো (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) এবং অনুস্বর (ং) থাকলে অর্থাৎ নাসিক্য বর্ণগুলো থাকলে বিচ্ছেদের সময় তার পরিবর্তে ‘ম’ বসে। টেকনিক: ৫=ম  

অহংকার = অহম্ + কার

সংগঠন = সম্ + গঠন

সন্ন্যাস = সম্ + ন্যাস

সংলগ্ন = সম্ + লগ্ন

কিঞ্চিৎ = কিম + চিৎ

সংগীত = স + গীত

সম্মান = সম্ + মান

সংলাপ = স + লাপ

কিন্তু = কিম্ + তু

সংঘ = সম্ + ঘ

সর্বংসহা = সর্বম্ + সহা

সংরক্ষণ = সম্ + রক্ষণ

কিন্নর = কিম্ + নর

সংঘাত = স + ঘাত

সংকল্প = স + কল্প

সংসার = সম্ + সার

কিম্ভুত = কিম্ + ভূত

সঞ্চয় = সম্ + চয়

সংখ্যা = সম্ + খ্যা

সংশপ্তক = সম্ + শপ্তক

কিংকর = কিম + কর

সঞ্জয় = সম্ + জয়

সংবরণ = সম্ + বরণ

সংশয় = সম্ + শয়

কিংবদন্তি = কিম্ + বদন্তি

সঞ্জীবনী = সম্ + জীবনী

সংবাদ = সম্ + বাদ

সংশোধন = সম্ + শোধন

কিংবা = কিম্ + বা

সন্তাপ = সম্ + তাপ

সংযোগ = স + যোগ

সংহার = সম্ + হার

বারংবার = বারম্ + বার

সন্দর্শন = স + দর্শন।

সংযোজন = সম্ + যোজন

স্বয়ংবরা = স্বয়ম্ + বরা

শঙ্কা = শ + কা

সন্ধান = সম্ + ধান

সংযম = সম্ + যম

সম্রাট = সম্ + রাট

নিয়ম -৩. পূর্বের নিয়মে আমরা শিখেছি ৫ = ম, অর্থাৎ নাসিক্য বর্ণ থাকলে বিশ্লেষণের সময় তার পরিবর্তে ‘ম’ বসাতে হবে। এখন যদি নাসিক্য বর্ণগুলো একটি অপরটির সাথে যুক্ত থাকে, যেমন: নন্ম, শ্য, অ, ন্ন ইত্যাদি তাহলে ১ম নাসিক্য বর্ণের পরিবর্তে ওই বর্গের ১ম বর্ণটি বসবে আর পরের নাসিক্য বর্ণটি অপরিবর্তিত থাকবে।

উন্নত = উৎ + নত

উন্নতি = উৎ + নতি

উন্নয়ন = উৎ + নয়ন

উন্নিদ্র = উৎ + নিদ্র।

উন্মত্ত = উৎ + মত্ত

উনখ = উৎ + মুখ

চিন্ময় = চিৎ + ময়

জগন্নাথ = জগৎ + নাথ।

তন্ময় = তৎ + ময়

তন্মধ্যে = তৎ + মধ্যে

মৃন্ময় = মৃৎ + ময়।

ব্যতিক্রম:

কিন্নর = কিম + নর

সন্ন্যাস = সম + ন্যাস

সম্মান = সম + মান।

নিয়ম-৪কোনো সন্ধিজাত শব্দের মধ্যে দ্বিত্ব ব্যঞ্জন (ডড, চ্চ,জ্জ,ত্ত, প্প, ল্ল,দ্দ) থাকলে বিচ্ছেদের সময় ১ম ব্যঞ্জনের পরিবর্তে ‘ৎ / দ’ বসবে। যেমন:

  • শরচ্চন্দ্র – এখানে ‘চ্চ’ আছে যার ১ম ‘চ’ এর পরিবর্তে ‘ৎ’ বসবে। কারণ ‘দ’ বসালে ‘শরদ’ শব্দের কোনো অর্থ হয় না। তার মানে শরচ্চন্দ্র = শরৎ + চন্দ্র।
  • বিপজ্জাল – এখানে ‘জ্জ’ আছে যার ১ম ‘জ’ এর পরিবর্তে ‘দ বসবে। কারণ ‘ৎ’ বসালে ‘বিপৎ’ শব্দের কোনো অর্থ হয় না। তার মানে বিপজ্জাল = বিপদ + জাল।

বিপজ্জনক = বিপদ + জনক

উচ্চারণ = উৎ + চারণ

উল্লাস = উৎ + লাস

চলচ্চিত্র = চলৎ + চিত্র

মহড়ঢ়াল = মহৎ + ঢাল

উজ্জ্বল = উৎ + জ্বল

উল্লম্ফন = উৎ + লম্ফন

জগজ্জীবন = জগৎ + জীবন

যাবজ্জীবন = যাবৎ + জীবন

উজ্জীবিত = উৎ + জীবিত

উল্লিখিত = উৎ + লিখিত

জগজ্জ্যোতি = জগৎ + জ্যোতি

শরচ্চন্দ্র = শরৎ + চন্দ্র

উডড্ডয়ন = উৎ + ডয়ন

উল্লেখ = উৎ + লেখ

তজ্জন্য = তৎ + জন্য

সজ্জন = সৎ + জন

উড্ডীন = উৎ + ডীন

উল্লেখ্য = উৎ + লেখ্য

বিপশ্চয় = বিপদ + চয়

সচ্চরিত্র = সৎ + চরিত্র

উল্লম্ফন = উৎ + লঙ্ঘন

কুজুটিকা = কুৎ + ঝটিকা

বৃহক্কা = বৃহৎ + ঢক্কা

সচ্চিন্তা = সৎ + চিন্তা

সন্ধিবদ্ধ শব্দের বিশ্লেষণে ‘তৎ’ হবে না কি ‘তদ’ হবে আবার ‘উৎ’ হবে না কি ‘উদ’ হবে তা নিয়ে অধিকাংশ মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এ বিষয়ে একেক বইতে একেক রকমভাবে উল্লেখ করা আছে বিধায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে দ্বিধান্বিত হয়ে যায় কোনটি দাগাবে তা নিয়ে। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ অনুসারে ‘উদৃ’ হচ্ছে ‘উৎ’ এর সন্ধিবদ্ধ রূপ অর্থাৎ মূলে থাকে ‘উৎ’ পরে এর সাথে । অন্য কোনো শব্দের সন্ধি হলে তা ‘উ’ হয়। যেমন: উৎ + বাহু = উদ্বাহু, উৎ + বন্ধন = উদ্বন্ধন ইত্যাদি। তার মানে সন্ধিতে উৎ’ প্রয়োগ করাই শ্রেয়। তবে পাণিনি ও তার পরবর্তী সংস্কৃত ব্যাকরণ পণ্ডিতেরা সন্ধি-বিচ্ছেদে ‘উদ’ ব্যবহার করেছেন। সে অনুসারে। কিছু বইয়ে এখনও ‘উদ’ ব্যবহার হয়। তার মানে ‘উদ্‌’ ব্যবহার করলে ভুল হবে না, তবে অপশনে ‘উৎ’ থাকলে তা দাগানোই উত্তম। তৎ’ বা ‘তদ’ এর ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণীয়।

নিয়ম-৫কোনো সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে ‘দ্ধ থাকলে বিচ্ছেদের সময় ‘ধ’ এর পরিবর্তে দ/ ৎ বসে। এখন ‘ৎ বসবে না কি ‘দ’

নির্ভর করে বানান অনুযায়ী শব্দ গঠনের ওপর। যেমন:

  • তদ্ধিত – এখানে ‘দ্ধ’ আছে যার বিচ্ছেদে ‘ধ’ এর পরিবর্তে ‘হ’ বসবে যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর ‘দ’ এর পরিবর্তে ‘ৎ বসবে। তার মানে তদ্ধিত = তৎ +হিত।
  • পদ্ধতি – এখানে ‘দ্ধ’ আছে যার বিচ্ছেদে ‘ধ’ এর পরিবতে ‘হ’ বসবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর ‘দ’ এর পরিবর্তে ‘দ’ ই বসবে। কারণ ‘ৎ বসালে হবে ‘পৎ যার কোনো অর্থ নেই, তার মানে পদ্ধতি = পদ + হতি।

উদ্ধরণ = উৎ + হরণ

উদ্ধত = উৎ + হত

উদ্ধৃতি = উৎ + হৃতি

পদ্ধতি = পদ্ + হতি

উদ্ধার = উৎ + হার

উদ্ধৃত = উৎ + হৃত

তদ্ধিত = তৎ + হিত

নিয়ম-৬ কোনো সন্ধিজাত শব্দের মধ্যে ‘চ্ছ থাকলে তা ৩ ভাবে বিচ্ছেদ করা যায়। যথা:

ক. বিচ্ছেদের সময় ‘চ’ লোপ করে।

খ. বিচ্ছেদের সময় প্রথম ‘চ’ এর পরিবর্তে বানানের নিয়মানুযায়ী ৎ / দ বসিয়ে।

গ. বিচ্ছেদের সময় ‘চ’ এর পরিবর্তে ‘ৎ’ আর ‘ছ’ এর পরিবর্তে ‘শ’ বসিয়ে।

এখন আমাদের মনে একটি প্রশ্ন আসতে পারে আর তা হচ্ছে ‘চ্ছ থাকলে যদি ৩টি উপায়েই বিচ্ছেদ করা যায়, তাহলে কীভাবে বুঝব যে ৩টির মধ্যে কোন উপায়ে বিচ্ছেদ করতে হবে?

এর সহজ উত্তর বুঝে যাবেন বাম পাশের ছবির ৩টি শব্দের বিশ্লেষণের দিকে লক্ষ করলেই। ছবিতে উল্লিখিত সবগুলো শব্দেই ‘চ্ছ’ আছে। আর প্রতিটি শব্দকে সম্ভাব্য ৩টি নিয়মেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লক্ষ করে দেখুন, বিচ্ছেদ’ শব্দে ক নং নিয়ম, উচ্ছেদ’ শব্দে খ নং নিয়ম এবং “উচ্ছাস’ শব্দে ‘গ’ নং নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। সুতরাং এটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই যে বিশ্লেষণের সময় কোন নিয়ম অনুসরণ করবেন। ৩টি নিয়মের যেটা দিয়ে বিশ্লেষণ করলে অর্থবহ শব্দ পাবেন সেটাই হবে।

অঙ্গচ্ছেদ = অঙ্গ + ছেদ

উচ্ছেদ = উৎ + ছেদ

তচ্ছক্তি = তৎ + শক্তি

অনুচ্ছেদ = অনু + ছেদ

উচ্ছাস = উৎ + শ্বাস

আচ্ছন্ন = আ + ছন্ন

উচ্ছিষ্ট = উৎ + শিষ্ট

পরিচ্ছদ = পরি + ছদ

আপচ্ছাস্তি = আপদ + শাস্তি

উদ্ধৃঙ্খল = উৎ + শৃঙ্খল

পরিচ্ছেদ = পরি + ছেদ

আলোকচ্ছটা = আলোক + ছটা

কথাচ্ছলে = কথা + ছলে

পূর্ণচ্ছেদ = পূর্ণ + ছেদ

একচ্ছত্র = এক + ছত্র

চলচ্ছক্তি = চলৎ + শক্তি

প্রচ্ছদ = প্র + ছদ

উচ্ছন্ন = উৎ + ছন্ন

চলচ্ছবি = চলৎ + ছবি

প্রতিচ্ছবি = প্রতি + ছবি

বটচ্ছায়া = ট + ছায়া

বিচ্ছিন্ন = বি + ছিন্ন

বিচ্ছেদ = বি + ছেদ

বিপচ্ছায়া = বিপদ + ছায়া

বৃক্ষচ্ছায়া = বৃক্ষ + ছায়া

মুখচ্ছবি = মুখ + ছবি

স্বচ্ছন্দে = স্ব + ছন্দে

নিয়ম-৭ ঃ সন্ধিজাত শব্দে ‘ষ’ এর সাথে যুক্ত অবস্থায় ‘ট ও ঠ’ থাকলে বিচ্ছেদের সময় তার পরিবর্তে যথাক্রমে ‘ত ও থ’ বসে।  

ইষ্টি = ইম্ + তি

তুষ্ট = তুষ + ত

নিষ্ঠা = নিষু + থা

কষ্ট = কষ্‌ + ত

দৃষ্টি = দৃষ + তি

বৃষ্টি = বৃষ + তি

কৃষ্টি = কৃষ + তি

নষ্ট = নষ্‌ + ত

ষষ্ঠ = ষষ্‌ + থ

২৭. মাত্র ৭টি নিয়মে (নিয়ম-০১ থেকে নিয়ম-০২) আমরা যে টেকনিকগুলো শিখেছি তার দ্বারা প্রায় ৯৫% ব্যঞ্জন সন্ধির বিচ্ছেদ করা সম্ভব।তবে কিছু ব্যঞ্জন সন্ধির বিচ্ছেদ উল্লিখিত টেকনিকে নির্ণয় করা যায় না। এগুলোর ক্ষেত্রে বারবার চোখ বুলিয়ে নিতে হবে। এখন আবার আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে যেহেতু এগুলো উল্লিখিত টেকনিকে নির্ণয় করা যায় না তাহলে কি এগুলো নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি? উত্তর না, নিপাতনে সিদ্ধ বলতে বোঝায় যেটা ব্যাকরণের নিয়ম মানে না। এখন আমার টেকনিক দিয়ে সন্ধি নির্ণয় করা না গেলেই যে তা নিপাতনে সিদ্ধ তা কিন্তু নয়।

ক্ষুন্নিবৃত্তি = ক্ষুধ + নিবৃত্তি

রাজ্ঞী = রাজ্‌ + নী

লব্ধ = লভ্‌ + ত

বৃংহিত = বৃন + হিত

ক্ষুৎপিপাসা = ক্ষুধ্‌ + পিপাসা

দুগ্ধ = দুহ্‌ + ত

বিমুগ্ধ = বিমুহ্‌ + ত

সিংহ = সিন্‌ + হ

যজ্ঞ = যজ্‌ + ন

বুদ্ধ = বুধ্‌ + ত

জিঘাংসা = জিঘান্‌ + সা

হিংসা = হিন্ + সা

যাঞা = যাচ্ + না

রুদ্ধ = রুধ্‌ + ত

দংশন = দন্‌ + শন

প্রশংসা = প্রশন্‌ + সা

নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি

নিপাতনে সিদ্ধ বলতে বোঝায় যেগুলো ব্যাকরণের প্রথাগত নিয়ম না মেনে গঠিত হয়েছে সেগুলোকে। নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জন সন্ধির কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো –

ষোড়শ = ষট্‌ + দশ।

বৃহস্পতি = বৃহৎ + পতি

পশ্চার্ধ = পশ্চাৎ + অর্ধ

দ্যুমণি = দিব্ + মণি

মনীষা = মনস + ঈষা

আশ্চর্য = আ + চর্য্‌

তস্কর = তৎ + কর

দ্যুলোক = দিব্‌ + লোক

একাদশ = এক + দশ

হরিশ্চন্দ্র = হরি + চন্দ্র

গোষ্পদ = গো + পদ

পতঞ্জলি = পতৎ + অঞ্জলি

২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রচলিত মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সম্পাদিত ৯ম-১০ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইতে “বনস্পতি’ ও ‘পরম্পর’ শব্দদুটি নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জন সন্ধির উদাহরণে দেখতে পাওয়া যায়। ২০২১ সালের ৯ম-১০ম শ্রেণির নতুন বাংলা ব্যাকরণ বইতে নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জন সন্ধির উদাহরণে ‘বনস্পতি’ ও ‘পরস্পর’ শব্দদুটির উল্লেখই নেই। আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে ‘বনস্পতি (বনঃ + পতি) ও পরস্পর (পরঃ + পর) স্বাভাবিক নিয়মে গঠিত বিসর্গ সন্ধি।

২৮. বিশেষ নিয়মে সাধিত ব্যঞ্জনসন্ধি:

সম্ + কৃত = সংস্কৃত

উৎ + স্থান = উত্থান

সম্ + কার = সংস্কার

পরি + কৃত = পরিকৃত

সম্ + কৃতি = সংস্কৃতি

উৎ + স্থাপন = উত্থাপন

পরি + কার = পরিষ্কার

তৎসম বিসর্গ সন্ধি

২৯. বস্তুত বিসর্গ (ঃ) কীসের সংক্ষিপ্ত রূপ? = র্‌ এবং স্ এর।

৩০. বিসর্গ সন্ধি কত প্রকার? = ২ প্রকার। যথা: র্‌-জাত বিসর্গ এবং স্‌-জাত বিসর্গ।

৩১. বিসর্গ সন্ধি দুইভাবে সাধিত হয়। যথা: ক) বিসর্গ + স্বর  খ) বিসর্গ + ব্যঞ্জন

৩২. বিসর্গ সন্ধির সহজ সূত্র: শব্দের মাঝখানে বিসর্গ (ঃ)ও-কার (ো), রেফ এবং যুক্তবর্ণ হিসেবে শ, স, ষ – এই ৭টির

যেকোনো একটি থাকলেই বুঝতে হবে তা বিসর্গ সন্ধি। যেমন:

অধোগতি = অধঃ + গতি

ততোধিক = ততঃ + অধিক

নমস্কার = নমঃ + কার

পুরস্কার = পুরঃ + কার

অন্তরঙ্গ = অন্তঃ + অঙ্গ

তপোবন = তপঃ + বন

নিরন্ন = নিঃ + অন্ন ।

প্রাতরাশ = প্রাতঃ + আশ

অন্তরীপ = অন্তঃ + ঈপ

তিরস্কার = তিরঃ + কার

নিরবধি = নিঃ + অবধি

প্রাতরুত্থান = প্রাতঃ + উত্থান

অন্তর্গত = অন্তঃ + গত

তিরোধান = তিরঃ + ধান

নিরাকার = নিঃ + আকার

প্রাদুর্ভাব = প্রাদুঃ + ভাব

অন্তর্ঘাত = অন্তঃ + ঘাত

তেজস্কর = তেজঃ + কর

নিরাপদ = নিঃ + আপদ

বয়োজ্যেষ্ঠ = বয়ঃ + জ্যেষ্ঠ

অন্তর্ধান = অন্তঃ + ধান

দুরন্ত = দুঃ + অন্ত

নিরাময় = নিঃ + আময়

বয়োবৃদ্ধ = বয়ঃ + বৃদ্ধ

অন্তর্নিহিত = অন্তঃ + নিহিত

দুরবস্থা = দুঃ + অবস্থা

নিরাশা = নিঃ + আশা

বহির্গত = বহিঃ + গত

অন্তর্বর্তী = অন্তঃ + বর্তী

দুর্ঘটনা = দুঃ + ঘটনা

নির্জন = নিঃ + জন

বাচস্পতি = বাচঃ + পতি

অন্তর্ভুক্ত = অন্তঃ + ভুক্ত

দুর্জন = দুঃ + জন

নির্গত = নিঃ + গত

ভাস্কর = ভাঃ + কর

অহরহ = অহঃ + অহ

দুর্নীতি = দুঃ + নীতি

নির্গমন = নিঃ + গমন

ভ্রাতুস্পুত্র = ভ্রাতুঃ + পুত্র

অহর্নিশ = অহঃ + নিশা

দুর্ভাগ্য = দুঃ + ভাগ্য

নিশ্চয় = নিঃ + চয়

মনস্কামনা = মনঃ + কামনা

আবিষ্কার = আবিঃ + কার

দুর্লভ = দুঃ + লভ

নিশ্চল = নিঃ + চল।

মনস্তাপ = মনঃ + তাপ

আশীর্বাদ = আশীঃ + বাদ

দুর্যোগ = দুঃ + যোগ

নিশ্চিহ্ন = নিঃ + চিহ্ন

মনোজগৎ = মনঃ + জগৎ

আস্পদ = আঃ + পদ।

দুশ্চরিত্র = দুঃ + চরিত্র

নিচ্ছিদ্র = নিঃ + ছিদ্র

মনোভাব = মনঃ + ভাব

ইতোমধ্যে = ইতঃ + মধ্যে

দুশ্চিন্তা = দুঃ + চিন্তা

নিষ্কৃতি = নিঃ + কৃতি

মনোরথ = মনঃ + রথ

ইতস্তত = ইতঃ + তত

দুষ্কর = দুঃ + কর

নিষ্ঠা = নিঃ + ঠা

মনোরম = মনঃ + রম

চতুরঙ্গ = চতুঃ + অঙ্গ

দুষ্কৃতি = দুঃ + কৃতি

নিস্পাপ = নিঃ + পাপ

মনোরঞ্জন = মনঃ + রঞ্জন

চতুর্ভুজ = চতুঃ + ভুজ

দুষ্পচ্য = দুঃ + পাচ্য

নিষ্ফল = নিঃ + ফল

মনোহর = মনঃ + হর

চতুর্দিক = চতুঃ + দিক

দুষ্প্রাপ্য = দুঃ + প্রাপ্য

নিস্তেজ = নিঃ + তেজ

যশোভিলাষ = যশঃ + অভিলাষ

চতুষ্কোণ = চতুঃ + কোণ

দুস্থ = দুঃ + স্থ।

পুনরাগত = পুনঃ + আগত

যশোলাভ = যশঃ + লাভ

চতুষ্পদ = চতুঃ + পদ

দুস্কর = দুঃ + কর

পুনরায় = পুনঃ + আয়

শিরচ্ছেদ = শিরঃ + ছেদ

জ্যোতিরিন্দ্র = জ্যোতিঃ + ইন্দ্র

ধনুষ্টঙ্কার = ধনুঃ + টঙ্কার

পুনরুক্ত = পুনঃ + উক্ত

শিরোধার্য = শিরঃ + ধার্য

জ্যোতির্ময় = জ্যোতিঃ + ময়

নভশ্চর = নভঃ + চর

পুনর্জন্ম = পুনঃ + জন্ম

সদ্যোজাত = সদ্যঃ + জাত

টেকনিকের ব্যতিক্রম:

নীরক্ত = নিঃ + রক্ত

নীরব = নিঃ + রব

নীরস = নিঃ + রস।

নীরোগ = নিঃ + রোগ

লক্ষণীয়: ভাস্কর = ভাঃ + কর (বিসর্গ সন্ধি) তবে ভাস্বর = ভাস + বর (প্রত্যয় সাধিত শব্দ)।

বিসর্গ বজায় থাকে এমন সন্ধিবদ্ধ শব্দ

৩৩. সাধারণত বিসর্গ সন্ধিবদ্ধ পদের মধ্যে বিসর্গ বজায় থাকে না। তবে ২য় শব্দের প্রথমে যদি (ক / ক্ষ / খ / প / ফ/ শ / স) থাকে তাহলে সন্ধিবদ্ধ শব্দের মধ্যে বিসর্গ বজায় থাকে।

সহজে মনে রাখার জন্য এটা মাথায় রাখুন – সখের পক্ষে শফিক।

অন্তঃকরণ = অন্তঃ + করণ

তপঃসাধন = তপঃ + সাধন

নিঃসঙ্গ = নিঃ + সঙ্গ

মনঃপীড়া = মনঃ + পীড়া

অতঃপর = অতঃ + পর

দুঃসম্পর্ক = দুঃ + সম্পর্ক

পুনঃপুন = পুনঃ + পুন

মনঃপুত = মনঃ + পুত

অধঃপতন = অধঃ + পতন

দুঃসংবাদ = দুঃ + সংবাদ

প্রাতঃকাল = প্রাতঃ + কাল

মনঃশান্তি = মনঃ + শান্তি

অধঃপাত = অধঃ + পাত

বয়ঃপ্রাপ্ত = বয়ঃ + প্রাপ্ত

মনঃসাধ = মনঃ + সাধ

অন্তঃপুর = অন্তঃ + পুর

নমঃশিবায় = নমঃ + শিবায়

বয়ঃসন্ধি = বয়ঃ + সন্ধি

যশঃপ্রার্থী = যশঃ + প্রার্থী

অন্তঃসত্ত্বা = অন্তঃ + সত্ত্বা

নিঃশর্ত = নিঃ + শর্ত

বহিঃপ্রকাশ = বহিঃ + প্রকাশ

শিরঃকম্পন = শিরঃ + কম্পন

ইতঃপূর্বে = ইতঃ + পূর্বে

নিঃশ্বাস = নিঃ + শ্বাস

মনঃকষ্ট = মনঃ + কষ্ট

শিরঃপীড়া = শিরঃ + পীড়া

গলাধঃকরণ = গলাধঃ + করণ

নিঃশেষ = নিঃ + শেষ

মনঃক্ষুন্ন = মনঃ + ক্ষুন্ন


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

2 out of 2 Marked as Helpfull !