বাংলা বানানের নিয়ম (বানান শুদ্ধীকরণ) Last updated: 4 months ago

বাংলা ভাষার বহু রূপ, রীতি, ভিন্নতা, বিভ্রাট প্রভৃতি নিরসনকল্পে ১৯৮৪ সালে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সর্ব মহলে অভিন্ন বানানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নীতি প্রণয়ন করে। সে সূত্র ধরে ১৯৮৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড একটি জাতীয় কর্ম শিবিরের আয়োজন করে। বাংলা একাডেমি এই নিয়ম প্রণয়নে উদ্যোগী হয় ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে। প্রথমে, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাডেমি একটি বিশেষজ্ঞ-কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বানান সম্বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে একাডেমির কাছে পেশ করে। ১৯৯২ সালের নভেম্বরে একাডেমি তা বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে ছাপিয়ে মতামত জরিপের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে পাঠায়। পরে, প্রাপ্ত মতামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে, একাডেমি নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে এবং ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে এর তৃতীয় সংস্করণ প্রণীত হয়। আর, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় এর পরিমার্জিত অর্থাৎ চতুর্থ সংস্করণ এবং বর্তমানে সে এই বানানরীতিই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকসমূহে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলা বানানরীতি সম্পর্কে পড়ার আগে অবশ্যই অবশ্যই ণত্ব ও ষত্ব বিধান এবং সন্ধি অধ্যায় খুব ভালো করে পড়বেন। এর কারণ সন্ধির কারণে বাংলা বানানের বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও য-ফলা () বসে আর কোথাও য-ফলার সাথে আ-কার ( ) যোগ হয়ে বসে; কোথাও ই-কার ( ) / উ-কার ( ) বসে আর কোথাও ঈ-কার (ী) / উ-কার ( ) বসে। এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সন্ধির কারণে হয়ে থাকে। আবার বাংলা বানানের কোথায় দন্ত্য-ন বসবে আর কোথায় মূর্ধন্য-ণ বসবে তা কিন্তু ণত্ব ও ষত্ব বিধানের ওপরই নির্ভর করে। তাই বানান শুদ্ধীকরণের নিয়ম পড়ার আগে এগুলো ভালো করে পড়ে নেবেন।

নিয়ম

১. বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম / সংস্কৃত শব্দের বানান অবিকৃত ও অপরিবর্তিত থাকবে। যেমন: চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি। তবে যে সব তৎসম শব্দে ‘ই’ বা ‘ঈ‘ এবং ‘উ’ বা ‘উ’ উভয়ই শুদ্ধ সেইসব শব্দে ‘ই’ এবং “উ’ এবং এদের কার চিহ্ন – ‘’ি ,ু‘ ব্যবহৃত হবে। যেমন: পদবি, শ্রেণি, কিংবদন্তি, খঞ্জনি, চিৎকার, চুল্লি, তরণি, ধমনি, ধরণি, নাড়ি, পল্লি, ভঙ্গি, মঞ্জরি, যুবতি, লহরি, সরণি, সূচিপত্র, উর্ণা, উষা ইত্যাদি।

০২. *** রেফের পর সাধারণত ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব হবে না। এক্ষেত্রে এটা মাথায় রাখতে হবে ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব উচ্চারণ বলতে কী বোঝায়? সমগোত্রীয় বা একই ব্যঞ্জন পাশাপাশি দুইবার উচ্চারিত হলে অথবা বর্ণের সাথে ব-ফলা (), ম-ফলা () বা য-ফলা যুক্ত হলে ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়। যেমন— অর্চনা, অর্জন, অর্থ, অর্ধ, কর্দম, কর্তন, কর্ম, কার্য, গর্জন, মূর্ছা, কার্তিক, বার্ধক্য, বার্তা, সূর্য৷

০৩. তৎসম শব্দের সঙ্গে কিরণ, কৃত, ভবন, ভূত/প্রভৃতি যুক্ত হলে ঈ-কার আগম হয়।

মূল শব্দ

শুদ্ধ বানান

নিরস্ত্র

নিরস্ত্রীকরণ / নিরস্ত্রীকৃত

আত্ত

আত্তীকরণ / আত্তীকৃত

বশ

বশীকরণ / বশীভূত

দূর

দূরীকৃত / দূরীকরণ / দূরীভূত

বাষ্প

বাষ্পীভূত

দ্রব

দ্রবীকৃত / দ্রবীভবন / দ্রবীভূত

নাসিক্য

নাসিক্যীভবন

সম

সমীকরণ / সমীভবন

০৪. বাংলা একাডেমীর ‘আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে পরিমাণ বা গণনাবাচক শব্দের বানানগুলো তদ্ভব হওয়ায় এগুলোতে বসবে উ-কার’ আর ক্রমবাচক শব্দের বানানগুলো তৎসম হওয়ায় এগুলোতে বসবে ঊ-কার’। যেমন:

সংখ্যা

২৯

 ৩৯

৪৯

 ৫৯

 ৬৯

গননাবাচক

উনত্রিশ

উনাচলিশ

উনপঞ্চাশ

উনষাট

উনসত্তর

ক্রমবাচক

ঊনত্রিংশ

ঊনচরিংশ

ঊনপঞ্চাশত্তম

ঊনষষ্টিতম

ঊনসপ্ততিতম

০৫. *** শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনস্বার (ং) ব্যবহৃত হবে। যেমন: গাং, ব্যা, টং, পালং, রং, সং ইত্যাদি। তবে অনুস্বারের সঙ্গে স্বর যুক্ত হলে তখন ‘ঙ’ হবে। যেমন, গাঙের বাঙালি, ব্যাঙের ছাতা, ব্যাঙাচি, ঢঙি, রঙ্গিন।

০৬. সাধারণত ক, খ, গ, ঘ এবং ক্ষ – এর পর্বে নাসিক্য বর্ণ যুক্ত করার জন্য সর্বত্র  ‘ঙ’ লিখতে হবে। যেমন:

ভুল বানান

শুদ্ধ বানান

অংক, অংকন

অঙ্ক, অঙ্কন

অংগ, আতংক

অঙ্গ, আতঙ্ক

আকাংক্ষা

আকাঙ্ক্ষা

শংকা আশংকা

শঙ্কা, আশঙ্কা

পুংখানুপুংখ

পুঙ্খানুপুঙ্খ

তবে কেবল সন্ধিতে প্রথম শব্দের শেষে ‘ম্‌’ থাকলে সন্ধিবদ্ধ শব্দে ‘ম্‌’ এর স্থলে ‘ং’ লিখতে হবে।

ভুল বানান

সন্ধি বিচ্ছেদ

শুদ্ধ বানান

অহঙকার   

অহম্ + কার

অহংকার

সঙ্কীর্ণ

সম+কীর্ণ

সংকীর্ণ

অলঙকার

অলম্ + কার

অলংকার

০৭.  *** “আলি’ ও ‘অঞ্জলি’ প্রত্যয় যুক্ত শব্দে ই-কার (ি) হবে। যেমন: গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি, অর্ধাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি, জলাঞ্জলি,প্রেমাঞ্জলি, খেয়ালি, বর্ণালি, সোনালি, রুপালি, গীতালি, মিতালি, হেঁয়ালি, পুবালি, গোড়ালি, মেয়েলি, চৈতালি ইত্যাদি।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়: সোনালি ও রুপালির ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষণীয়। আর তা হচ্ছে ব্যাংকের নামের ক্ষেত্রে ঈ-কার(ী) যুক্ত থাকে। তবে সোনালি ও রুপালি পদ দুটো যদি বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাহলে ই-কার (ি) বসবে।  যেমন: সোনালি আঁশ, রুপালি মাছ ইত্যাদি।

০৮. *** লেখক ও কবি নিজেদের নামের বানান যেভাবে লেখেন বা লিখতেন, সেভাবেই লেখা হবে। যেমন, শামসুর রাহমান, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আহমদ ছফা, তাহমিম আনাম, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, শেখ ফজলল করিম, সোমেন চন্দ, জীবনানন্দ দাশ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ,

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শহীদুল্লা কায়সার, জসীমউদ্দীন, মুনীর চৌধুরী।

৯. *** দেশ, জাতি ও ভাষার নামের ক্ষেত্রে ই / উ লিখতে হবে। যেমন: পোর্তুগিজ, গ্রিস, ইংরেজি, ফারসি, দেশি, বাঙালি। ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: চীন, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ। তবে ‘ঈয়’ প্রত্যয় যুক্ত থাকলে ঈ-কার হবে। যেমন: এশীয়, অস্ট্রেলীয়, আরবীয়, ভারতীয়, ইউরোপীয় ইত্যাদি।

১০. *** সর্বনাম, বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ পদরূপে ‘কী’ শব্দটি ঈ-কার (ী) দিয়ে লেখা হবে। যেমন: কী করছ? এটা কী বই? কী করে যাব? এটা কী ফল? কী কথা বলতে চাও তুমি? কী যে করি! কী বাংলা কী ইংরেজি উভয় ভাষায় তিনি পারদর্শী? অন্যক্ষেত্রে অব্যয় পদরূপে ই-কার (ি) দিয়ে ‘কি’ শব্দটি লেখা হবে। যেমন: তুমিও কি যাবে? সে কি এসেছিল?

টেকনিক:

  • যে প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না উত্তর দেওয়া যায় সেক্ষেত্রে ‘কি’ হবে ।
  • হ্যাঁ বা না উত্তর দেওয়া না গেলে ‘কী’ হবে।

অতিরিক্ত তথ্য

কি‘ থাকলে তা নিঃসন্দেহে অব্যয়। কিন্তু কী থাকলে তা সর্বনামও হয় আবার বিশেষণও হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ‘কী থাকলে কখন সর্বনাম হয়? আর কখন বিশেষণ হয়? উত্তর: এটা নির্ভর করে বাক্যের ওপর। যেমন:

 এতক্ষণ কী করেছ? এই বাক্যে কী সর্বনাম পদ।

 এতক্ষণ কী কাজ করেছ? এই বাক্যে কী’ বিশেষণ পদ।

ব্যাখ্যা: ধরে নিন ১ম বাক্যের উত্তর – এতক্ষণ কাজ করেছি বা এতক্ষণ কথা বলেছি। তাহলে একটু চিন্তা করুন ১ম বাক্যের প্রশ্নে ‘কী’ বসেছে ক্রিয়াপদের পূর্বে ‘কাজ। কথা বিশেষ্যের পরিবর্তে। আমরা জানি বিশেষ্যের পরিবর্তে যা বসে তা সর্বনাম। ২য় বাক্যের উত্তর – এতক্ষণ ভালো কাজ করেছি। তাহলে এবার লক্ষ করুন ২য় বাক্যের প্রশ্নে ‘কী’ বসেছে বিশেষ্য পদের পূর্বে ‘ভালো’ বিশেষণের পরিবর্তে। তাই ২য় বাক্যে কী’ বিশেষণ পদরূপে বসেছে।

টেকনিক: কি = অব্যয়। কী + Verb = সর্বনাম, কী + Noun = বিশেষণ

১১. তৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে হবে ঈ-কার আর অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি) স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে বসবে ই-কার।

  • তৎসম: শ্ৰীমতী, নারী, বান্ধবী, সম্রাজ্ঞী, নেত্রী, কত্রী, পত্নী, রূপবতী, গুণবতী, বুদ্ধিমতী, সতী, ধাত্রী, শ্রোত্রী, বৈষ্ণবী, গরীয়সী, মহীয়সী, পটীয়সী, শিক্ষয়িত্রী ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: যুবতি।
  • অতৎসম: ভেড়ি (তদ্ভব), দাদরি (তদ্ভব), গাভি (তদ্ভব), রানি (তদ্ভব), মামি (দেশি), চাচি (তদ্ভব), দাদি (তদ্ভব), নানি (হিন্দি), বিবি (ফারসি), বাঁদি (ফারসি), মেথরানি (ফারসি) ইত্যাদি।

১২. ব্যক্তিবাচক শব্দের শেষে ‘কারী বানানে ‘ঈ-কার’ ও অব্যক্তিবাচক শব্দের শেষে ‘কারি’ বানানে ই-কার হবে। যেমন:

  • ব্যক্তিবাচক: অপকারী, অধিকারী, আবেদনকারী, উপকারী, নির্মাণকারী, সহকারী ইত্যাদি।
  • অব্যক্তিবাচক: তরকারি, সরকারি, দরকারি, পাইকারি ইত্যাদি।

১৩দু /দূ দিয়ে শব্দ গঠিত হলে কেবল দূরত্ব (Distance) বা দূরের কিছু বুঝাতে ‘দূ’ বসে অন্য সব জায়গায় ‘দু’ বসে।

যেমন: দূত, দূরদর্শন, দূরদর্শী, দূরদৃষ্টি (দূরের দৃষ্টি), দূরদৃষ্ট (মন্দভাগ্য), দূরীকরণ, দূরবীক্ষণ, দূরালাপনী, দূরীভূত,দূরবস্থা, দূরারোগ্য, দূরূহ , দুরান্ত (দূরের অন্ত), দুরন্ত(চঞ্চল), দুর্গ, দুর্গা, দুর্গম, দুর্গত, দুর্বিষহ, দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, দুর্দিন, দুর্নাম, দুর্বার, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরাচার, দুরাশয়, দুর্নিবার, দুর্ভোগ, দুর্বল, দুহিতা ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: দূর্বা, দূষণ, দূষক, দূষিত, দুষণীয়,দুরবিন (ফারসি)।

১৪. পদান্তে কোনো বিসর্গ থাকবে না। যেমন: ইতস্তত, ক্রমশ, কার্যত, প্রথমত, প্রধানত, প্রায়শ, পুনঃপুন, বস্তুত, মূলত ইত্যাদি।

১৫. *** শব্দের শেষে ‘জীবী’ বসলে ‘জ’ ও ‘ব’ দুটোতেই  ঈ-কার হয়।  যেমন: পরজীবী, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী,ক্ষীণজীবী, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, দীর্ঘজীবী ইত্যাদি।তবে শব্দের প্রথমে ‘জীবি’ থাকলে ‘জ’ তে ঈ-কার ও ‘ব’ তে ই-কার হয়। যেমন: জীবিকা, জীবিত, জীবিতাশা (বেঁচে থাকার ইচ্ছা) জীবিতেশ (স্বামী) ইত্যাদি।

১৬. বিদেশি শব্দের বানানে ই, উ ও এদের কার অর্থাৎ ই-কার (ি), উ-কার (ূ) ব্যবহৃত হবে। যেমন:

১৭. বিদেশি শব্দের বানানে অনুচ্চারিত ব-ফলার (ব) বহুল প্রচলন থাকলেও তা ভুল। আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী বিদেশি শব্দের বানানে অনুচ্চারিত ব-ফলা হবে না। যেমন:

১৮. অদ্ভুত শব্দটি ব্যতীত ‘ভূত’ দিয়ে আর যত শব্দ আছে সব জায়গায় ঊ-কার হবে। যেমন- দূরীভূত, ঘনীভূত, পুঞ্জিভূত, বাষ্পীভূত ইত্যাদি।

১৯. ‘স্ট’ এবং ‘ষ্ট’ ব্যবহার: বিদেশি শব্দে ‘স্ট’ ব্যবহার হবে। বিশেষ করে ইংরেজি st যোগে শব্দগুলোতে ‘স্ট’

ব্যবহার করতে হবে। যেমন—পোস্ট, স্টার, স্টাফ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, স্ট্যাটাস, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টুডিও, ফাস্ট, লাস্ট, বেস্ট ইত্যাদি। ষত্ব-বিধান অনুযায়ী বাংলা বানানে ট-বর্গীয় বর্ণে ‘ষ্ট’ ব্যবহার হবে। যেমন— বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট ইত্যাদি।

২০.  ‘পূর্ণ’ এবং ‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়) ব্যবহার ‘পূর্ণ’ (ইংরেজিতে Full/Complete অর্থে) শব্দটিতে ঊ-কার এবং র্ণ যোগে ব্যবহার হবে। যেমন— পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ ইত্যাদি।
‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়— ইংরেজিতে Re-অর্থে) শব্দটিতে উ-কার হবে এবং অন্য শব্দটির সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবহার হবে। যেমন— পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন,পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ইত্যাদি।

২১. পদের শেষে’-গ্রস্থ’ নয় ‘গ্রস্ত’ হবে। যেমন— বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ইত্যাদি।

২২. বিদেশি শব্দে ণ, ছ, ষ ব্যবহার হবে না। যেমন— হর্ন, কর্নার, সমিল (করাতকল), স্টার, আস্সালামু আলাইকুম, ইনসান, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি।

২৩অ্যা, এ ব্যবহার: বিদেশি বাঁকা শব্দের উচ্চারণে ‘অ্যা’ ব্যবহার হয়। যেমন— অ্যান্ড (And), অ্যাড (Ad/Add), অ্যাকাউন্ট (Account), অ্যাম্বুলেন্স(Ambulance), অ্যাসিস্ট্যান্ট(Assistant), অ্যাডভোকেট (Advocate), অ্যাকাডেমিক (Academic), অ্যাডভোকেসি (Advocacy) ইত্যাদি। অবিকৃত বা সরলভাবে উচ্চারণে ‘এ’ হয়। যেমন—এন্টার (Enter), এন্ড (End), এডিট (Edit) ইত্যাদি।

২৪. ইংরেজি বর্ণ S-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হবে ‘স’ এবং sh, -sion, -tion শব্দগুচ্ছে ‘শ’ হবে। যেমন— সিট (Seat/Sit), শিট, (Sheet), রেজিস্ট্রেশন (Registration), মিশন (Mission) ইত্যাদি।

২৫. সমাসবদ্ধ পদ ও বহুবচন রূপী শব্দগুলোর মাঝে ফাঁক রাখা যাবে না। যেমন— চিঠিপত্র, আবেদনপত্র, ছাড়পত্র (পত্র), বিপদগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত (গ্রস্ত), গ্রামগুলি/গ্রামগুলো (গুলি/গুলো), রচনামূলক (মূলক), সেবাসমূহ (সমূহ), যত্নসহ, পরিমাপসহ (সহ), ত্রুটিজনিত, (জনিত), আশঙ্কাজনক, বিপজ্জনক (জনক), অনুগ্রহপূর্বক, উল্লেখপূর্বক (পূর্বক), প্রতিষ্ঠানভুক্ত, এমপিওভুক্ত, এমপিওভুক্তি (ভুক্ত/ভুক্তি), গ্রামভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক, রোলভিত্তিক (ভিত্তিক), অন্তর্ভুক্তকারণ, এমপিওভুক্তকরণ, প্রতিবর্ণীকরণ (করণ), আমদানিকারক, রফতানিকারক (কারক), কষ্টদায়ক, আরামদায়ক (দায়ক), স্ত্রীবাচক (বাচক), দেশবাসী, গ্রামবাসী, এলাকাবাসী (বাসী), সুন্দরভাবে, ভালোভাবে (ভাবে), চাকরিজীবী, শ্রমজীবী (জীবী), সদস্যগণ (গণ), সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী (কারী), সন্ধ্যাকালীন, শীতকালীন (কালীন), জ্ঞানহীন (হীন), দিনব্যাপী, মাসব্যাপী, বছরব্যাপী (ব্যাপী) ইত্যাদি। এ ছাড়া যথাবিহিত, যথাসময়, যথাযথ, যথাক্রমে, পুনঃপুন, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহিঃপ্রকাশ শব্দগুলো একত্রে ব্যবহার হয়।

২৬. বিদেশি শব্দে ই-কার ব্যবহার হবে। যেমন— আইসক্রিম, স্টিমার, জানুয়ারি, ফ্রেরুয়ারি, ডিগ্রি, চিফ, শিট, শিপ, নমিনি, কিডনি, ফ্রি, ফি, ফিস, স্কিন, স্ক্রিন, স্কলারশিপ, পার্টনারশিপ, ফ্রেন্ডশিপ, স্টেশনারি, নোটারি, লটারি, সেক্রেটারি, টেরিটরি, ক্যাটাগরি, ট্রেজারি, ব্রিজ, প্রাইমারি, মার্কশিট, গ্রেডশিট ইত্যাদি।

২৭. ‘কোণ, কোন ও কোনো’-এর ব্যবহার কোণ : ইংরেজিতে Angle/Corner (∠) অর্থে।

  • কোন : উচ্চারণ হবে কোন্। বিশেষত প্রশ্নবোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়। যেমন— তুমি কোন দিকে যাবে?
  • কোনো : ও-কার যোগে উচ্চারণ হবে। যেমন— যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।

২৮. বাংলা ভাষায় চন্দ্রবিন্দু একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণ। চন্দ্রবিন্দু যোগে শব্দগুলোতে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হবে; না করলে ভুল হবে। অনেক ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার না করলে শব্দে অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া চন্দ্রবিন্দু সম্মানসূচক বর্ণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যেমন— তাহাকে>তাঁহাকে, তাকে>তাঁকে ইত্যাদি।

২৯. হীরা ও নীল অর্থে সকল বানানে ঈ-কার হবে। যেমন— হীরা, হীরক, নীল, সুনীল, নীলক, নীলিমা ইত্যাদি।

৩০. নঞর্থক পদগুলো (নাই, নেই, না, নি) আলাদা করে লিখতে হবে। যেমন— বলে নাই, বলে নি, আমার ভয় নাই, আমার ভয় নেই, হবে না, যাবে না।

৩১. ত্ব, তা, নী, ণী, সভা, পরিষদ, জগৎ, বিদ্যা, তত্ত্ব শব্দের শেষে যোগ হলে ই-কার হবে। যেমন— দায়িত্ব (দায়ী), প্রতিদ্বন্দ্বিতা (প্রতিদ্বন্দ্বী), প্রার্থিতা (প্রার্থী), দুঃখিনী (দুঃখী), অধিকারিণী (অধিকারী), সহযোগিতা (সহযোগী), মন্ত্রিত্ব, মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিপরিষদ (মন্ত্রী), প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিজগৎ, প্রাণিসম্পদ (প্রাণী) ইত্যাদি।

৩২. ঈ, ঈয়, অনীয় প্রত্যয় যোগ ঈ-কার হবে। যেমন— জাতীয় (জাতি), দেশীয় (দেশি ), পানীয় (পানি), জলীয়, স্থানীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, শোচনীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, করণীয়।

৩৩. ভাষা ও জাতিতে ই-কার হবে। যেমন— বাঙালি/বাঙ্গালি, জাপানি, ইংরেজি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি।

৩৪. ব্যক্তির ‘-কারী’-তে (আরী) ঈ-কার হবে। যেমন— সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী, পথচারী, কর্মচারী ইত্যাদি।

ব্যক্তির ‘-কারী’ নয়, এমন শব্দে ই-কার হবে। যেমন— সরকারি, দরকারি ইত্যাদি।

৩৫. প্রমিত বানানে শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে –গণ যোগে ই-কার হয়। যেমন— সহকারী>সহকারিগণ, কর্মচারী>কর্মচারিগণ, কর্মী>কর্মিগণ, আবেদনকারী>আবেদনকারিগণ ইত্যাদি।

৩৬. ‘বেশি’ এবং ‘-বেশী’ ব্যবহার‘বহু’, ‘অনেক’ অর্থে ব্যবহার হবে ‘বেশি’। শব্দের শেষে যেমন— ছদ্মবেশী, প্রতিবেশী অর্থে ‘- বেশী’ ব্যবহার হবে।

৩৭. ‘ৎ’-এর সাথে স্বরচিহ্ন যোগ হলে ‘ত’ হবে। যেমন— জগৎ>জগতে জাগতিক, বিদ্যুৎ>বিদ্যুতে বৈদ্যুতিক, ভবিষ্যৎ>ভবিষ্যতে, আত্মসাৎ>আত্মসাতে, সাক্ষাৎ>সাক্ষাতে ইত্যাদি।

৩৮.সাধু থেকে চলিত রূপের শব্দসমূহ যথাক্রমে দেখানো হলো:

আঙ্গিনা>আঙিনা, আঙ্গুল>আঙুল, ভাঙ্গা>ভাঙা, রাঙ্গা>রাঙা, রঙ্গিন>রঙিন, বাঙ্গালি>বাঙালি, লাঙ্গল>লাঙল, হউক>হোক, যাউক>যাক, থাউক>থাক, লিখ>লেখ, গুলি>গুলো, শুন>শোন, শুকনা>শুকনো, ভিজা>ভেজা, ভিতর>ভেতর, দিয়া>দিয়ে, গিয়া>গিয়ে, হইল>হলো, হইত>হতো, খাইয়া>খেয়ে, থাকিয়া>থেকে, উল্টা>উল্টো, বুঝা>বোঝা, পূজা>পুজো, বুড়া>বুড়ো, সুতা>সুতো, তুলা>তুলো, নাই>নেই, নহে>নয়, নিয়া>নিয়ে, ইচ্ছা>ইচ্ছে ইত্যাদি।

৩৯. হয়তো, নয়তো বাদে সকল তো আলাদা হবে। যেমন— আমি তো যাই নি, সে তো আসে নি ইত্যাদি।

৪০. ঙ, ঞ, ণ, ন, ং বর্ণের পূর্বে ঁ হবে না। যেমন— খান (খাঁ), চান, চন্দ (চাঁদ), পঞ্চ, পঞ্চাশ (পাঁচ) ইত্যাদি।

৪১. ক্রিয়াপদের বানানের পদান্তে ‘ইও’ বা ‘এও’ উচ্চারিত হলে বানান লেখার সময় ‘ইও’ বা ‘এও স্থলে যথাক্রমে ‘ইয়ো’ বা ‘এয়ো’ লিখতে হবে। যেমন:

ভুল বানান

শুদ্ধ বানান

বলিও

বলিয়ো

চলিও

চলিয়ো

ঘুমিও

ঘুমিয়ো

যাইও

যাইয়ো

৪২. আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে বিদেশি শব্দের বানানের ক্ষেত্রে শব্দের শেষে ‘ইও’ উচ্চারিত হলে বানান লেখার সময় ‘ইও’ স্থলে ‘ইয়ো’ লিখতে হবে। যেমন: অডিয়ো (অডিও), ভিডিয়ো (ভিডিও), স্টুডিয়ো (স্টুডিও), রেডিয়ো (রেডিও)।

তবে অভিধানে চিকিৎসা সংক্রান্ত বানানের ক্ষেত্রে শব্দের শেষে ‘ইও’ উচ্চারিত হলে বানান লেখার সময়ও ইও’ই ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন: পোলিও, হোমিও, ফিজিও ইত্যাদি।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

1 out of 1 Marked as Helpfull !