বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার ও শব্দের শ্রেণিবিভাগ Last updated: 6 months ago

শব্দ হলো বাগযন্ত্রের সাহায্যে বিশেষ কৌশলে উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনি সমষ্টি। অর্থাৎ এক বা একাধিক ধ্বনি বা বর্ণ মিলে যখন একটি পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে তাকে শব্দ বলে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দের শ্রেণিবিভাগ করা যায়। যেমন:

১. গঠনমূলক শ্রেণিবিভাগ = ২ টি (মৌলিক ও সাধিত)।

২. অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ = ৩ টি (যৌগিক, রূঢ়ি ও যোগরূঢ়)।

৩. উৎসমূলক শ্রেণিবিভাগ = ৫ টি (তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি)।

[২০২১ সালের ৯ম-১০ম শ্রেণির নতুন বাংলা ব্যাকরণ বইতে অর্ধ-তৎসম শব্দের উল্লেখ নেই। কিন্তু বাংলা ভাষায় অর্ধ-তৎসম শব্দের অস্তিত্ব বিদ্যমান বলে আমরা এটা সম্পর্কেও শিখব এবং পরীক্ষায় উৎসমূলক শ্রেণিবিভাগ আসলে ৫ প্রকারই দাগাবেন।]

৪. পদভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ = ৮ টি (বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া, ক্রিয়া বিশেষণ, অনুসর্গ, যোজক ও আবেগ)।

শব্দের গঠনমূলক শ্রেণিবিভাগ

৫. মৌলিক শব্দ: যে সকল শব্দগুলোকে আর কোনো অর্থযুক্ত ক্ষুদ্রতম অংশে বিশ্লেষণ করা যায় না বা ভেঙে আলাদা করা যায় না সেগুলোকে মৌলিক শব্দ বলে। যেমন: গোলাম, ভাই, বোন, মাছ, বই, লাল, গোলাপ, ফুল, নাক, তিন, হাত, কলম ইত্যাদি। মৌলিক শব্দগুলোই ভাষার মূল উপকরণ। এখানে একটি বিষয় লক্ষ করুন – মৌলিক শব্দগুলোর সাথে কোনো বিভক্তি বা প্রত্যয় যুক্ত হয়নি। আর আমরা জানি, বিভক্তিহীন নামশব্দকে বলে প্রাতিপদিক। তার মানে মৌলিক শব্দগুলোকেই আমরা প্রাতিপদিক বলতে পারি।

৬. সাধিত শব্দ: মৌলিক শব্দ বা ধাতু অথবা প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি, উপসর্গ বা প্রত্যয় যোগে কিংবা সমাসনিষ্পন্ন হয়ে যেসব শব্দ গঠিত হয় তাকে সাধিত শব্দ বলা হয়। যেমন:

উপসর্গ যোগে – পরাজয়, উপহার, উপকার, গরমিল

প্রত্যয় যোগে – চলন্ত, ঢাকাই, হাতা, গোলাপি, ফুলেল

সমাস যোগে – নীলপদ্ম, পীতাম্বর, বীণাপাণি।

সন্ধি যোগে – দ্বৈপায়ন, হিমাচল, বিদ্যালয়, দম্পতি।

শব্দের অর্থমূলক শ্রেণিবিভাগ

৭. যৌগিক শব্দ: যে সকল শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ব্যাবহারিক অর্থ একই তাকে যৌগিক শব্দ বলে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থ মানে হলো শব্দটি বিশ্লেষণ করলে আমরা যে অর্থ পাই আর ব্যাবহারিক অর্থ মানে হলো বাস্তবে আমরা শব্দটিকে যে অর্থে ব্যবহার করি। এই দুটো দিক বিবেচনা করে অর্থ যদি একই রকম হয় তাহলে তাকে যৌগিক শব্দ বলে। যেমন:

শব্দ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যাবহারিক অর্থ
গায়ক √গৈ + ণক (অক) গান করে যে
চিকামারা চিকা + মারা দেওয়ালে লিখন
কর্তব্য √কৃ + তব্য যা করা উচিত
পক্ষী পক্ষ + ইন যার পক্ষ (ডানা) আছে
মিতালি মিতা + আলি বন্ধুর মতো ভাব
দৌহিত্র দুহিতা+ষ্ণ্য কন্যার পুত্র, নাতি

রূঢ় শব্দঃ সন্ধি, প্রত্যয় বা উপসর্গজাত যে সকল শব্দ মূল শব্দের অর্থের অনুগামী না হয়ে অন্য কোনো বিশেষ অর্থ জ্ঞাপন করে তাকে রূঢ়ি বা রূঢ় শব্দ বলে। যেমন:

শব্দ বিশ্লেষণ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ব্যাবহারিক অর্থ
হস্তী হস্ত + ইন হস্ত আছে যার পশু বিশেষ
প্রবীণ প্র + বীণ প্রকৃষ্ট বীণা বাজাতে পারেন যিনি বয়স্ক ব্যক্তি
গবেষণা গো + এষণা গোরু খোঁজা ব্যাপক পর্যালোচনা
সন্দেশ সম + দেশ কোনো সংবাদ মিষ্টান্ন বিশেষ

যোগরূঢ় শব্দ: সমাসনিষ্পন্ন যে সকল শব্দ সম্পূর্ণভাবে সমস্যমান পদসমূহের অনুগামী না হয়ে অন্য কোনো বিশিষ্ট অর্থ গ্রহণ করে তাকে যোগরূঢ় শব্দ বলে।

শব্দ বিশেষ অর্থ স্বাভাবিক অর্থ
জলধি সমুদ্র জল ধারণ করে যে (গ্লাস, নদী, পুকুর, জগ, মগ)
বলদ বোকা বল দেয় যে (যে-কোনো ধরনের মেশিন যা থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়)
তুরঙ্গম ঘোড়া যা তাড়াতাড়ি যায় (বিমান, রকেট, বাঘ, হরিণ, নেকড়ে)

রূঢ়ি ও যোগরূঢ় শব্দের মধ্যে পার্থক্য: রূঢ়ি ও যোগরূঢ় শব্দের গঠন প্রায় একই রকম। দুইটি শব্দের ক্ষেত্রেই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ব্যাবহারিক অর্থ আলাদা। পার্থক্য এইটুকুই যে যোগরূঢ় শব্দগুলো সমাসনিষ্পন্ন শব্দ

শব্দের উৎসমূলক শ্রেণিবিভাগ

তৎসম / সংস্কৃত শব্দগুলো নির্ণয়ের কিছু চমৎকার কৌশল:

১. সাধু ভাষার ৮৫% শব্দই তৎসম শব্দ।

২. হিন্দু ধর্ম সংক্রান্ত সকল শব্দই তৎসম। যেমন: ব্রাহ্মণ, দেবতা, মন্দির, দুর্গা, পুজা, সরস্বতী, গণেশ, রাম, কৃষ্ণ, সীতা

৩. প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মানুযায়ী ঈ উ এবং ঋ আর এসব বর্ণের কার চিহ্ন (ী,ূ,ৃ) যুক্ত সকল শব্দ তৎসম। যেমন:ঈশান, ঊর্ধ্ব, উর্মি, ঋন্ধ, ঋজু, ঋষি ইত্যাদি।

৪. কোনো শব্দের সাথে ‘ণ’ যুক্ত থাকলে নিঃসন্দেহে তৎসম আর ‘ষ’ যুক্ত থাকলে তা সাধারণত তৎসম শব্দ। যেন, মাণিক্য, তৃণ, ঋণ, পাষাণ, মানুষ, বিশিষ্ট ইত্যাদি।

ব্যাতিক্রম: পোষা, ষোলো, বোষ্টম, কেষ্ট, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টীয়, খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টান, কৃষান তৎসম শব্দ নয় অর্থাৎ অ তৎসম শব্দ।

৫. “ক্ষ’ ও ‘ক্ষ্ম যুক্ত সকল শব্দই তৎসম। কারণ ক্ষ’ শব্দটির বিশ্লেষণ করলে পাই ‘ক + ষ। আর যেহেতু ‘ষ’ আছে সেহেত তৎসম শব্দ। যেমন: শিক্ষা, পরীক্ষা, চক্ষু, নক্ষত্র যক্ষ্মা, লক্ষ্মী, সূক্ষ্ম, লক্ষ্মণ, ইত্যাদি।

৬. তৎসম উপসর্গের সংখ্যা ২০টি। যথা: প্র, পরা, অপ, সম, নি, অনু, অব, নির, দুর, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অভি, অপি, উপ, আ। এই ২০টি উপসর্গযুক্ত সকল শব্দ তৎসম। যেমন: আদর, প্রভাব, পরাজয়, অপমান ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: আ, সু, বি, নি – এই ৪টি উপসর্গযুক্ত থাকলে সেটি বাংলা শব্দও হতে পারে, আবার তৎসম শব্দও হতে পারে। এই ক্ষেত্রে মূল শব্দ অনুযায়ী সেটি নির্ধারণ করতে হবে।

৭. সংস্কৃত প্রত্যয়যুক্ত সকল শব্দই তৎসম শব্দ। যেমন: কারক, শ্রবণ, সাহিত্য, হৈমন্তিক ইত্যাদি।

৮. বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধিঘটিত সকল শব্দ তৎসম। যেমন: স্বতঃস্ফুর্ত, দুঃখ, দুস্থ(দুঃ +স্থ), নীরব নিঃ +রব),অহরহ (অহঃ + অহ) ইত্যাদি।

৯. বহুবচনবাচক শব্দ (বৃন্দ, গণ, বর্গ, মণ্ডলী, আবলি, গুচ্ছ, দাম, নিকর, পুঞ্জ, মালা, রাজি, রাশি, নিচয়) যুক্ত থাকলেই তা তৎসম শব্দ। যেমন: পণ্ডিতবর্গ, পুস্তকাবলি, মেঘপুঞ্জ, কমলনিকর, বৃক্ষরাজি ইত্যাদি।

১০. ‘ৎ’ যুক্ত সকল শব্দই তৎসম। যেমন: ইন্দ্রজিৎ, উৎকণ্ঠা, উৎকৃষ্ট, উৎপাত, কিঞ্চিৎ, কুৎসিত, ঘূৎকার, চিৎকার, জ্যোৎস্না,তৎসম, তৎপর, তৎকালীন, তৎপুরুষ, তৎক্ষণাৎ, তাৎপর্য, দিৎসা, পরভৃৎ, ফুকার, বৎস, বাৎসল্য, বৎসর, বাৎসরিক, ব্যুৎপত্তি, ভবিষ্যৎ, অগ্নিসাৎ, ভূমিসাৎ, আত্মসাৎ, মৎস্য, মাৎস্যন্যায়, যকাল, যৎসামান্য, যন্ত্রবৎ, যাবৎ, যুগপৎ, যুযুৎসা, রণজিৎ, সৎ, সৎসঙ্গ, হঠাৎ ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম: বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী নিচের ৪টি শব্দ ব্যতিক্রম

– উৎকপালি (বাংলা), গৎ (হিন্দি), নাৎসি (জার্মান), পিৎজা (ইতালি)।

১১. দিকের সংখ্যা মোট ১০টি। যথা: উত্তরদক্ষিণপূর্বপশ্চিমঈশান (উত্তর-পূর্ব কোণ)নৈঋত (দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ)অগ্নি(দক্ষিণ-পূর্ব কোণ), বায়ু (উত্তর-পশ্চিম কোণ), আকাশ বা উর্ধ্ব এবং পাতাল বা অধঃ এই ১০ দিক সম্পর্কিত সকল শব্দ তৎসম।

উত্তর : উত্তরণ, উত্তরায়ণ, উত্তরসূরি, উত্তরীয়, উত্তরপত্র, উত্তরাধিকার, উত্তরোত্তর, উত্তরাশা ইত্যাদি।

দক্ষিণঃ দক্ষিণা, দক্ষিণানি, দক্ষিণায়ন, দক্ষিণান্ত, দক্ষিণ-হস্ত, দক্ষিণপন্থি ইত্যাদি।

পূর্ব : পূর্বজন্ম, পূর্বপুরুষ, পূর্বপ্রচলিত, পূর্ববঙ্গ, পূর্ববর্তী, পূর্বরাত্র, পূর্বাচল, পূর্বাভাষ, পূর্বাশা, পূর্বশর্ত, পূর্বসূরি ইত্যাদি।

পশ্চিম : পশ্চিমা, পশ্চিমাঞ্চল, পশ্চিমাভিমুখী ইত্যাদি।

অগ্নি : অগ্নিকুণ্ড, অগ্নিকন্যা, অগ্নিপরীক্ষা, অগ্নিপ্রভা, অগ্নিবীণা, অগ্নিমূর্তি, অগ্নিশিখা, অগ্নিসাৎ, অগ্নিমান্দ্য ইত্যাদি।

বায়ুঃ বায়কোণ, বায়ুকোষ, বায়ুগতি, বায়ুগ্রস্ত, বায়ুদূষণ, বায়ুপথ, বায়ুপ্রবাহ, বায়ুবিজ্ঞান, বায়ুসখা, বায়ুস্তর ইত্যাদি।

উর্ধ্ব : উর্ধ্বতন, উর্ধ্বদৃষ্টি, উর্ধ্বগামী, উর্ধ্বমা, উৰ্ব্বস্থ, উর্ধনয়ন, উর্ধ্বদেহ, উর্ধ্বনেত্র, উর্ধ্বশ্বাস ইত্যাদি।

অধঃ : অধঃপতন, অধঃশির, অধঃস্থ, অধঃস্থিত ইত্যাদি।

১২. ভূ-মণ্ডল সম্পর্কিত বেশিরভাগ শব্দই তৎসম শব্দ। যেমন: চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, তারকা ইত্যাদি।

১৩. উপর্যক্ত নিয়ম বহির্ভূত আরও কিছু তৎসম শব্দ: চন্দন তার দাদার জীবনে

গল্প শুনে নিদাঘের (গ্রীষ্মকালের) আভাস পেয়ে তনুর চাচা আর লতার 

জামাইকে নিয়ে জঙ্গলের সুড়ঙ্গ দিয়ে পঞ্চম তলা 

বিশিষ্ট ভবনের শিখরে উঠে মস্তিষ্কে হস্ত রেখে গোল

হয়ে আসন গেড়ে বসল।

অর্ধ-তৎসম শব্দ: সংস্কৃত শব্দের কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে অর্ধ-তৎসম শব্দ। অর্ধ-তৎসম মানে আধা সংস্কৃত। যেমন:

গৃহিণী -গিন্নি

জ্যোৎস্না -জোছনা

শ্রাদ্ধ-ছেরাদ্দ

অগ্রহায়ণ-অঘ্রান

প্রাণ-পরান

পুরোহিত – পুরুত

গাত্র – গতর

কীর্তন-কেত্তন

কুৎসিত -কুচ্ছিত

নিমন্ত্রণ -নেমন্তন্ন

গ্রাম- গেরাম

প্রণাম-পেন্নাম

চন্দ্র -চন্দ

রৌদ্র-রোদুর

অর্ধ-তৎসম শব্দ মনে রাখার টেকনিক: আঞ্চলিক ও অপ্রচলিত শব্দগুলোই অর্ধ-তৎসম শব্দ।

তদ্ভব(খাটি বাংলা) শব্দ: তদ অর্থ তা (সংস্কৃত), ভব অর্থ জাত অর্থাৎ তদ্ভব অর্থ সংস্কৃত থেকে জাত। এটি একটি পারিভাষিক শব্দ। যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত ভাষার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে সে সব শব্দ তদ্ভব শব্দ বলা হয়। একে খাঁটি বাংলা শব্দও বলা হয়। যেমন: হস্ত (তৎসম) > হথ (প্রাকৃত) > হাত (তদ্ভব), হস্তী (তৎসম) > হথী (প্রাকৃত) > হাতি (তদ্ভব), চর্মকার (তৎসম) > চম্মআর (প্রাকৃত) > চামার (তদ্ভব), মস্তক (তৎসম) > মথ (প্রাকৃত) > মাথা (তদ্ভব), ভর্ত (তৎসম) > ভত্ত (প্রাকৃত) > ভাত (তদ্ভব) ইত্যাদি। এরকম আরও কিছু তদ্ভব শব্দ –

চন্দ্র -চাঁদ

সর্প -সাপ

কর্ণ -কান

ভ্রান্ত-ভুল

পক্ষী –পাখি

মৎস্য – মাছ

চক্র – চাকা

দেশি শব্দ: বাংলাদেশি আদিম অধিবাসীদের শব্দগুলোকে বলে দেশি শব্দ। অতি প্রাচীন বলে কিছু কিছু শব্দের মূল কোন অধিবাসীদের তা নির্ণয় করা গেলেও দেশি ভাষার সকল শব্দের মূল অনেক সময় নির্ণয় করা যায় না। যেমন: পেট (তামিল), কুড়ি (কোল), চুলা (মুণ্ডারি), টোপর, ডাব, খিড়কি, ঝিনুক, জারুল, ফুপা ইত্যাদি।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়

১. ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রচলিত মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সম্পাদিত ৯ম-১০ম শ্রেণির ব্যাকরণ বইতে ‘গঞ্জ’ শব্দটি দেশি শব্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২১ সালের নতুন প্রকাশিত ৯ম-১০ম শ্রেণির ব্যাকরণ বইতে দেশি শব্দের মধ্যে ‘গঞ্জ’ শব্দটির উল্লেখ নেই। বাংলা একাডেমির আধনিক বাংলা অভিধানে ‘গঞ্জ’ শব্দটির উৎসভাষা হিসেবে ফারসি দেওয়া আছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এলে এটা সর্বোত্তম উত্তর হিসেবে ফারসিই দাগাবেন। তবে অপশনে ‘ফারসি’ না থাকলে; দেশি থাকলে তখন দেশি দাগাবেন।

২. আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে ‘কুড়ি এবং চুলা’ শব্দ দুটি তদ্ভব। কিন্তু আমাদের নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ বইতে এই শব্দদুটিকে দেশি শব্দ বলা হয়েছে এবং সেখানে ‘কুড়ি’ শব্দটি কোল অধিবাসীদের আর ‘চুলা’ শব্দটা মুণ্ডারী অধিবাসীদের বলা হয়েছে। তাই পরীক্ষার প্রশ্ন যদি এই শব্দ দুটো আসে বা এরকম শব্দগুলো আসে তাহলে Best Answer হিসেবে আমরা দেবো তদ্ভব। তবে অপশনে যদি তদ্ভব না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা দেবো দেশি শব্দ

আবার লক্ষ রাখতে হবে যদি সরাসরি প্রশ্নে এটা উল্লেখ করে যে কুড়ি’ শব্দটি কোন অধিবাসীদের? বা ‘চুলা’ শব্দটি কোন অধিবাসীদের? তখন কিন্তু এই কোল বা মুণ্ডারী অধিবাসীদের এটাই সঠিক উত্তর হবে।

ফারসি শব্দ

ফারসি (ইরানের) গুরুত্বপূর্ণ শব্দ মনে রাখার টুকিটাকি উপায়:

১. আইন, দরবার, দারোগা, চাপরাশি, নালিশ, পেয়াদা, কাজি, পেশকার, ফরিয়াদি, সালিশ আইন সংক্রান্ত এই শব্দগুলো ফারসি। তবে ‘আইন’ সংক্রান্ত বেশিরভাগ শব্দই আরবি যেমন: আদালত, আসামি, ইশতেহার, এজলাস, এজাহার, কানন, জেরা, তামাদি, দাখিল, নাজির, ফয়সালা, মক্কেল, মামলা, মুনশি, মনসে মুলতুবি, মেয়াদ, মোক্তার, মোকদ্দমা, হাকিম – এগুলো সব আরবি শব্দ। আবার কাঠগড়া ও জরিমানা এ শব্দদুটি ‘আরবি + ফারসি’ অর্থাৎ মিশ্র শব্দ।

২. শব্দের শেষে গর/কর থাকলে এবং তা যদি কোনো পেশাকে বোঝায় তাহলে তা ফারসি শব্দ। যেমন: জাদুকর, সওদাগর, কারিগর ইত্যাদি। [অজগর, সাগর, ভীতিকর, আয়কর, ভয়ংকর – এই শব্দগুলোর শেষে গর / কর থাকলে কোনো পেশাকে বোঝায় না বলে এগুলো ফারসি শব্দ নয়; এগুলো সংস্কৃত শব্দ]।

৩. ফারসি উপসর্গযোগের সংখ্যা ১০টি। যথা: নিম, ফি, বে, দর, কার, বদ, না, কম, বর, ব। ফারসি উপসর্গসাধিত সকল শব্দই ফারসি বলে বিবেচিত হবে। যেমন: বেতাল, নিমরাজি, কারখানা, দরদালান, কমবখত, নারাজ, বকলম ইত্যাদি।

ফারসি প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক শব্দ: কারখানা থেকে চশমা চুরি যাওয়ায় রসিদ বাদশাহের দরবারে নালিশ করল। বাদশা আস্তানার দফতরের বারান্দায় একতারা বাজাতে

বাজাতে হাজার বান্দার দস্তখতসহ জবানবন্দি লইল।

হঠাৎ দোকান থেকে বর্গি  

বেশে কুর্তা আর লুঙ্গি পরে পেরেশান অবস্থায় 

ফরমান নিয়ে মেথর এসে ফরিয়াদি হয়ে বলল চশমাটা রানি সাহেবার তোশকের 

এ কথা বরদাশত করতে না পেরে বাদশাহ দারোগাকে রানির গর্দান কাটার নির্দেশ

দেন এবং চাকরকে (মেথর) একটি কবুতর বখশিস দেন।

ফারসি ধর্ম সংক্রান্ত শব্দ: হাদিসে আছে নামাজ পড়লে ও রোজা রাখলে খোদা গুনাহ মাফ করেন। ফলে দোজখ হতে মুক্তি এবং ফেরেশতা ও পয়গম্বরদের সাথে বেহেশতে যাওয়া যায়।

ফারসি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: ফারসি শব্দগুলো আমরা একটি বিয়ের গল্প দিয়ে মনে রাখব। এই গল্পের ৪ টি পর্ব

১. বৌদি মরিচা পড়া দরজা বন্ধ করে হিন্দি সিনেমার মতো সওদাগরের কাছে চায় শুধুই জামদানি। আর এই জামদানির নমুনা আমদানি রপ্তানি করতে গিয়ে সওদাগরের তো জান শেষ। কিন্তু সে এখনও নওজোয়ান; সে চায় একটু দরদ। শেষ পর্যন্ত  তাই সিদ্ধান্ত নিল নতুন করে করবে শাদি

২. আজগুবি এই বিয়ের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হলো খোলা আসমানের নিচে এক বাগান বা বাগিচা। সেখানে গোলাপের

গালিচা বিছিয়ে পাঞ্জাবি পায়জামা পরে চেহারায় ময়দা আর চোখে সুরমা লাগিয়ে মুখে রুমাল দিয়ে আমাদের হবু ভাবীর আবরুর দিকে বদমাশি দৃষ্টিতে তাকিয়ে খোশ মেজাজে বসে আছে নওশা বিয়ে করবে বুলবুলের হিন্দু মেয়ে নার্গিসকে।

৩ বিয়ের আসরে সফেদাআঙুরপোলাওসবজিবিরিয়ানি

মোরগমুরগির রোস্ট, বাদামফিরনিজর্দা নিয়ে বাঁধল হাঙ্গামা

[দ্রষ্টব্য: পায়েস, মরিচ, শিঙাড়া সংস্কৃত]।

৪. সওদাগরের বিয়ের নিশান পেয়ে তাজা তরমুজের মতো ভাবী নতুন জামা আর পোশাক পরে বাজার থেকে সানাই বাজিয়ে আর আজাদ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে চলে এলো সরেজমিনে। এসে শুধু বলল “জানোয়ার, আমি তোকে খুন করব, গোরস্থানে জিন্দা কবর (আরবি) দিব”। ভাবীকে দেখে হুঁশ হারিয়ে বেহুশ হয়ে দরিয়ায় লাফ দিল।

ফরাসি (ফ্রান্সের) শব্দমাদাম কুপন নিয়ে রেনেসাঁসের পর আঁতাঁত করে রেস্তোরাঁর ডিপোতে ঢুকল। কিন্তু ক্যাফেতে ছিল ওলন্দাজ বুর্জোয়া। তারা তাকে ম্যাগাজিনের ফর্মা অনুযায়ী ম্যাটিনি শো দেখালো।

পোর্তগিজ শব্দ: ২ টি গল্পের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে।

প্রথম গল্প: পাদরি গির্জার গুদামে গিয়ে চাবি দিয়ে আলমারি খুলে 

বালতিতে করে পাউরুটিআনারসআলপিন বের করে এনে নিলাম করে দিল।

দ্বিতীয় গল্পআয়া ইস্পাতের গরাদ দেওয়া কামরার ভেতর কেদারায় বসে গামলায় করে পেয়ারা আর কাজুর আচার বানাচ্ছে। জানালা দিয়ে এটা দেখে ইংরেজ বেহালা মিস্ত্রি তা খাওয়ার ফন্দি করছে। এইসব দেখে আয়া মিস্ত্রির হাত মাস্তুলের সাথে ফিতা দিয়ে বেধে তাতে পেরেক ঠুকে মুখে আলকাতরা মাখিয়ে বের করে দিল। এটা শুনে মিস্ত্রির ইস্তিরি সাগুর দানার মতো কার্তুজ আর বোমা মেরে আয়ার তোয়ালের বোতাম উড়িয়ে দেয়। আয়া তখন তাকে বোতল খুলে পিরিচে করে কপি (কফি – তুর্কি) ও পেপে খাওয়ায়।

আরবি শব্দ:

আরবি ধর্ম সংক্রান্ত শব্দ: আল্লাহ তায়ালা ইসলামের মল দলিল কুরআনে তওবাতসবিহজজাকাত ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন। এতে আরও উল্লেখ আছে ওজু করে কোরবানি করা হালাল ও গোসল না করে কোরবানি করা হারাম। কেয়ামতের দিন এসবের ওপর ভিত্তি করে সকলের ইমান পরীক্ষা করে জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ধারণ করা হবে।

আরবি প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক শব্দ: হাশরের দিন গায়েবি আদালতে 

সকল আলেম ও ইনসানের আসল ও নকল এলেমের কিচ্ছা শোনা হবে।

ওই দিন এজলাসে কোনো উকিল বা কিতাব কানুন থাকবে না এবং ওজরও খাটবে না।

মোক্তার দোয়াত কলম দ্বারা বইয়ে সকলের নগদ ও বাকির হিসাব লিখবে।

মহকুমার মুনসেফ ওই দিন হিসাবের রায় খারিজ করবেন।

আরবি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: নায়িকা দৌলতের আশায় শরবত খেয়ে আলখাল্লা পরে গায়ে আতর মেখে নিদিষ্ট তারিখে নবাব আকবরের জলসা ঘরে আজব কায়দায় 

গজল গেয়ে আর জৌলুস দেখিয়ে আজনবিদের মশগুল করে। 

মহল্লার দুই ফাজিল আদমি আবির ও নাজিম আফিম 

খেয়ে ইনকিলাব পত্রিকা পড়ে এই খবর পেয়ে তার দিকে ইশারায়

গভীর নজর দিয়ে মশকরা করতে করতে বলে, “একদম খাসা”।

নায়িকা তখন তাদের মোলায়েম হাতে হালুয়া খাওয়ায়।

কিন্তু বন্দুক দেখিয়ে বলে শয়তান,মুসাফিরজল্লাদ একটু সবুর কর।

যত ইচ্ছা তবলা বাজাতে পারবি কিন্তু অন্তরে তুফান হাওয়া হাজির হলেও আদবকায়দা 

ভুলে আমার ইজ্জতে হামলা করবি না। কারণ আমি মজলুম জননেতা 

কামালের আমানত। তকদিরের দোষে আমি গরিব কিন্তু খারাপ না।

তুর্কি শব্দ

উজবুক খোকা চকমকে চাকুকাঁচি ও তোপ দিয়ে মোগল 

সম্রাটের বাবা খান সাহেবকে কুর্নিশ করে কোপ মেরে কুলির বউ 

বেগমকে নিয়ে বাহাদুর বেশে পালিয়ে গেল। পরে বারুদে

গন্ধ পেয়ে সওগাত হিসেবে লাশ দেখে চোগা পরা 

বাবুর্চি কোর্মা খাওয়া ফেলে উর্দু ভাষায় মুচলেকা দিল।

হিন্দি শব্দ

ডেকিকিঘরের কাচারিতে বসে খোট্টা বংশোদ্ভূত নানানানি এক সমঝোতা

বৈঠকে সকাল থেকে সন্ধ্যা ইস্তক (পর্যন্ত) দাবা খেলে।

এই কাহিনি শুনে ধুতি আর পাগড়ি পরা খেমটাওয়ালী 

তাগড়া মেয়ে ঝাড়ু আর ঝান্ডা (পতাকা)

হাতে টহল দেওয়ার কাজ বাদ দিয়ে ফুচকা ওয়ালা

সাথে চোঙায় বসে ঠান্ডা রুটি দিয়ে জিলাপি খায়।

জাপানি শব্দ

হাসনুহানা জুডো ক্যারাটে শিখে সুনামির ভয়ে রিকশায় করে প্যাগোডায় যায়।

ইংরেজি শব্দ

অফিস, কেক, কোট, ক্লাস, ক্যালেন্ডার, গ্লাস, চপ, চেয়ার, জজ, জ্যাম, দিনেমার, টিন, টেবিল, কামান, টেলিভিশন, ডায়েরি, নোট, পেন, পেন্সিল, প্যান্ট, প্লেন, ফিল্ম, ফ্যাশন, ফুটবল, ফটোকপি, ফটোস্ট্যাট, বার্গার, বল, ব্যাগ, বাক্স, বাল, মাস্টার। মিটিং, মেম্বার, রোড, লাইব্রেরি, লাগেজ, শেয়ার, স্কুল, হ্যান্ডবল, হাসপাতাল, রোস্ট।

অন্যান্য শব্দ

১. গুজরাটি শব্দ: খাদি, হরতাল।

২. গ্রিক শব্দ: কেন্দ্র, দাম।

৩. চীনা শব্দ: চা, সাম্পান, লিচু। (দ্রষ্টব্য: লুচি তদ্ভব শব্দ)।

৪. মায়ানমার(বর্মি) শব্দ: ফুঙ্গি।

৫. জার্মানি শব্দ: নাৎসি, কিন্ডারগার্টেন।

৬. ইতালি শব্দ: মাফিয়া, জেব্রা, ম্যাজেন্টা।

৭. মালয় (মালয়েশিয়ার) শব্দ: কাকাতুয়া, কিরিচ।

৮. ওলন্দাজ শব্দ: ইস্কাপন, হরতন, রুইতন। (তাসের তিনটি কার্ড) । দ্রষ্টব্য: টেক্কা দেশি শব্দ, তুরুপ পোর্তুগিজ শব্দ।

৯. স্প্যানিশ শব্দ: ডেঙ্গু, হারিকেন।

১০. রঙের নামঃ বাংলা একাডেমির ‘আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে রঙের নামের উৎসগুলো সাজানো হলো –

→ নীল, ধূসর, হলুদ = সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ

→ সাদা, গোলাপি, লাল, সবুজ, আসমানি, বাদামি, সফেদ = ফারসি শব্দ।

→ কালো, বেগুনি, খয়েরি, ছাই, সোনালি, রুপালি = বাংলা বা তদ্ভব শব্দ

→ কমলা = দেশি শব্দ

→ চকলেট = ফরাসি শব্দ (ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান অনুসারে এটা ম্যাক্সিকান)।

→ ম্যাজেন্টা = ইতালি শব্দ

বিশেষভাবে লক্ষণীয়

২০২০ সাল পর্যন্ত বহাল থাকা মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচিত ৯ম-১০ম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বই অথবা ২০২১ সালে প্রণিত ৯ম-১০ম শ্রেণির নতুন বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে উল্লিখিত শব্দের উৎস সম্পর্কিত অনেক তথ্যই বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আধুনিক বাংলা অভিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই এসব তথ্য থেকে প্রশ্ন আসলে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি যে কোনটা। দাগাব।

এক্ষেত্রে যে বিষয়াচকে আমি প্রাধান্য দেই তা হচ্ছে, বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (১ম খণ্ড) বইটিকে আমরা। ব্যাকরণের যে-কোনো বিষয়ের জন্য অগ্রাধিকার দিব। শব্দের উৎসগত তথ্যের জন্য আমরা আধুনিক বাংলা অভিধানকে অগ্রাধিকার দিব। তবে প্রশ্নে প্রদত্ত অপশনে যদি আধুনিক বাংলা অভিধানে উল্লিখিত তথ্য না থাকে সেক্ষেত্রে আমরা প্রমিত বাংলা। ভাষার ব্যাকরণ বা ৯ম-১০ম শ্রেণির বইয়ের তথ্যানুযায়ী উত্তর করব। এরকম কিছু দ্বিধান্বিত শব্দের উদাহরণ নিচে উল্লেখ করা হলো –


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

0 out of 0 Marked as Helpfull !