পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ Last updated: 6 months ago

যে শব্দে পুরুষ বুঝায় তাকে পুরুষবাচক এবং যে শব্দে স্ত্রী বুঝায় তাকে স্ত্রীবাচক শব্দ বলে। যেমন: বাপ – মা, ভাই – বোন, ছেলে – মেয়ে —কেউই মৃত্যুর সময় তার কাছে ছিল না। এই বাক্যে বাপ, ভাই, ছেলে হলো পুরুষবাচক শব্দ এবং মা, বোন, মেয়ে হলো স্ত্রীবাচক শব্দ।

বাংলায় পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ মূলত ২ ভাগে বিভক্ত।যেমন:

১. পতি ও পত্নীবাচক অর্থে: আব্বা – আম্মা, চাচা – চাচী, কাকা – কাকী, জেঠা – জেঠী, মামা – মামী, দাদা – দাদী, নানা –  নানী, ননদ – নন্দাই, দেওর – জা, বাবা – মা ইত্যাদি।

২. পুরুষ ও মেয়ে বা স্ত্রীজাতীয় অর্থে: খোকা – খুকী, পাগল – পাগলী, বামন – বামনী, ভেড়া – ভেড়ী, মোরগ – মুরগী, বালক – বালিকা ইত্যাদি।

লিঙ্গ: ছেলে মেয়ের ধারণাকে বলা হয় লিঙ্গ। অর্থাৎ, পুংলিঙ্গ মানে পুরুষ, আর স্ত্রীলিঙ্গ মানে নারী বা মেয়ে বা স্ত্রী। এই বিভাজনই হলো লিঙ্গভেদ।

লিঙ্গ চার প্রকার। যথা: পুংলিঙ্গ, স্ত্রী লিঙ্গ, উভয় লিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গ। যে শব্দ দ্বারা পুরুষ বোঝায় তা পুংলিঙ্গ (যেমন: বাবা), যে শব্দ দ্বারা স্ত্রী বোঝায় তা স্ত্রী লিঙ্গ (যেমন: মা), যে শব্দ দ্বারা পুরুষ ও স্ত্রী উভয়কেই বোঝায় তা উভয় লিঙ্গ (যেমন: শিশু, পাখিসন্তান, মানুষ, আমি, তুমি,রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ইত্যাদি) এবং যে শব্দ দ্বারা পুরুষ ও স্ত্রী কোনটিকে না বুঝিয়ে অচেতন পদার্থ বোঝায় তাকে ক্লীবলিঙ্গ (যেমন: বই) বলে। তবে বাংলা ব্যাকরণে ক্লীবলিঙ্গ প্রচলিত নয়। উল্লেখ্য ‘হিজড়া’ শব্দটি ক্লীব লিঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।

নিত্য পুরুষবাচক শব্দ

যে সকল পুরুষবাচক শব্দের লিঙ্গান্তর হয় না তাদের নিত্য পুরুষবাচক শব্দ বলে।

কবিরাজ, কাপুরুষ, রাষ্ট্রপতি, ঢাকি, বামুন, কৃতদার, অকৃতদার, সেনাপতি, যোদ্ধা, বিচারপতি, পুরোহিত, স্ত্রৈণ।

নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ: যে সকল স্ত্রীবাচক শব্দের কোনো পুরুষবাচক রূপ হয় না তাকে নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ বলে। যেমন: ডাইনি, পেতনি, শাঁখচুন্নি, সতিন, সৎমা, এয়ো, দাই, সধবা, বিধবা, অন্তঃসত্ত্বা, অসূর্যম্পশ্যা, অরক্ষণীয়া, সপত্নী, কুলটা, রূপসি, ললনা ইত্যাদি।

পুরুষবাচক শব্দকে স্ত্রীবাচক করার নিয়ম:

পুরুষবাচক শব্দের শেষে কিছু স্ত্রীবাচক প্রত্যয় যোগ করে স্ত্রীবাচক শব্দের রূপচর করা হয়। নিমে এগুলো উল্লেখ করা হলো – ১. পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘ই’ থাকলে স্ত্রীবাচক শব্দে ‘নি’ যুক্ত হয় আর পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘ঈ’ থাকলে স্ত্রীবাচক শব্দে ‘নী’ যুক্ত হয় এবং আগের ‘ঈ’ কার ‘ই’ কারে পরিবর্তিত হয়। যেমন: ভিখারি – ভিখারিনি, শিকারি – শিকারিনি, যোগী – যোগিনী।

২. ‘নী’ প্রত্যয় যোগে অবজ্ঞার্থে স্ত্রীবাচক শব্দ: ডাক্তার – ডাক্তারনী, মাস্টার – মাস্টারনী, জমিদার – জমিদারনী, দারোগা -দারোগানী। (তবে ‘নী’ প্রত্যয় যুক্ত থাকলেই যে তা কেবল অবজ্ঞার্থ প্রকাশ করবে তা নয়। নী’ প্রত্যয় যোগে গঠিত স্ত্রীবাচক শব্দ সাধারণ অর্থও প্রকাশ করতে পারে। যেমন: কামার – কামারনী, কুমার – কুমারনী, জেলে – জেলেনী, ভিখারি – ভিখারিনি, অভিসারী – অভিসারিণী, ধোপ – ধোপানী, বেদে – বেদেনী, মজুর – মজুরনী ইত্যাদি)।

‘নী’ প্রত্যয় যুক্ত হলে কখন অবজ্ঞার্থ বোঝায় আর কখন সাধারণ অর্থ বোঝায় তা মনে রাখার সহজ উপায়।

নিচু জাত + নী = সাধারণ অর্থ। যেমন: জেলেনী, ধোপানী, বেদেনী, কামারনী, কুমারনী, অভিসারিণী, ভিখারিনি।

৩. আনী’ প্রত্যয় যোগে স্ত্রীবাচক শব্দ: মেথর – মেথরানি, চাকর – চাকরানি, ঠাকুর – ঠাকুরানি, মাতুল – মাতুলানী, নাপিত -নাপিতানী, ইন্দ্র – ইন্দ্রাণী ইত্যাদি। তবে ‘আনী’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যদি শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে তাহলে তা পুরুষ বা এ কোনটাই বোঝায় না, অন্য কোনো বিশেষ অর্থ বোঝায়। যেমন: অরণ্য – অরণ্যানী (বৃহৎ অর্থে), বন – বনানী (বৃহৎ অর্থে), হিম– হিমানী (হিম শব্দের অর্থ জমাটবদ্ধ আর হিমানী শব্দের অর্থ বরফ খণ্ড) ।

৪. ‘ইনী’ প্রত্যয় যোগে স্ত্রীবাচক শব্দ: কাঙাল –কাঙালিনী, গোয়ালা – গোয়ালিনী, বাঘ – বাঘিনী, কুহক – কুহকিনী ইত্যাদি।

৫. পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘অক’ থাকলে স্ত্রীবাচক শব্দে ‘ইকা’ হয়। যেমন: নায়ক নায়িকা, বালক-বালিকা, গায়ক-গায়িকা, সেবক – সেবিকা, অধ্যাপক – অধ্যাপিকা ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: গণক – গণকী, নর্তক – নর্তকী, চাতক – চাতকী, রজক – রজকিনি, যুবক-যুবতি।

  • তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ‘ইকা’ প্রত্যয় যুক্ত থাকলেই তা সবসময় স্ত্রীবাচকতা বোঝায় না। অনেক সময় ক্ষুদ্রার্থ প্রকাশ করার জন্যও ‘ইকা’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে থাকে। যেমন: নাটক – নাটিকা, মালা – মালিকা, গীতি – গীতিকা, পুস্তক –পুস্তিকা, একাঙ্ক – একাঙ্কিকা। এগুলো পুরুষ বা স্ত্রীবাচক শব্দ নয়, এগুলো ক্ষুদ্ৰাৰ্থক প্রত্যয়।
  • আবার এটাও মনে রাখতে হবে যে কেবল ‘ইকা’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েই ক্ষুদ্ৰাৰ্থ প্রকাশিত হয় না। ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েও ক্ষুদ্রাথ প্রকাশ করতে পারে। যেমন: ডিঙা – ডিঙি, কাঠ কাঠি, ছোরা – ছুরি, পোঁটলা – পুটলি, কোষা -কুষি ইত্যাদি।

বিশেষ নিয়মে সাধিত স্ত্রীবাচক শব্দ

(ক) যেসব পুরুষবাচক শব্দের শেষে ‘তা‘ রয়েছে সেসব স্ত্রীবাচক করতে ‘ত্রী‘ হয়। যেমন: নেতা—নেত্রী, কর্তা—কর্ত্রী, শ্রোতা শ্রোত্রী, ধাতা—ধাত্রী।

(খ) পুরুষবাচক শব্দের শেষে অত্ , বান্ , মান্ , ঈয়ান্ , থাকলে যথাক্রমে অতী, বতী, মতি, ঈয়সী হয়। যথা : সৎ—সতী, মহৎ—মহতী, গুণবান—গুণবতী,রূপবান—রূপবতী, শ্রীমান—শ্রীমতী, বুদ্ধিমান—বুদ্ধিমতী, গরীয়ান—গরিয়সী।

(গ) কোনো কোনো পুরুষবাচক শব্দে বিশেষ নিয়মে স্ত্রীবাচক শব্দ গঠিত হয়। যেমন : রাজা—রানি, যুবক—যুবতী, শ্বশুর—শাশুড়ি, নর—নারী, বন্ধু—বান্ধবী, দেবর—জা, পতি—পত্নী ইত্যাদি।

ভিন্ন শব্দ যোগে গঠিত স্ত্রীবাচক শব্দ:কলি – কামিন, শুক (শালিক) –শারি, গুরু – গুবী, বিদ্বান – বিদুষী, খানসামা – আয়া,বাদশা – বেগম।

বিদেশি স্ত্রীবাচক শব্দ: খান—খানম, মরদ—জেনানা, মালেক—মালেকা, মুহতারিম—মুহতারিমা, সুলতান—সুলতানা।
৯. যে সকল স্ত্রীবাচক শব্দের ২ টি করে পুরুষবাচক রূপ রয়েছে: বোন – ভাই ও দুলাভাই, ননদ-দেবর ও নন্দাই।

১০. কিছু পুরুষবাচক শব্দের দুটি করে স্ত্রীবাচক শব্দ আছে। যেমন : দেবর—ননদ (দেবরের বোন) / জা (দেবরের স্ত্রী) ; ভাই—বোন এবং ভাবী (ভাইয়ের স্ত্রী) ; বন্ধু—বান্ধবী (মেয়ে বন্ধু) এবং বন্ধুপত্নী (বন্ধুর স্ত্রী) ইত্যাদি।

১১. বাংলা স্ত্রীবাচক শব্দের বিশেষণ স্ত্রীবাচক হয় না। যেমন : সুন্দর বলদ—সুন্দর গাই, সুন্দর ছেলে—সুন্দর মেয়ে, মেজ খুড়ো মেজ খুড়ী ইত্যাদি।

১২. উভয় লিঙ্গ: যে সকল শব্দ পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই বোঝায় সেগুলোকে উভয়লিঙ্গ বলা হয়। যেমন: মানুষ, শিশু, সন্তান, শিক্ষিত,শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী, শত্রু, মিত্র, শিল্পী, পাখি, অভিভাবক, জঙ্গি ইত্যাদি।

১৩. বাংলায় কতগুলো স্ত্রীবাচক শব্দের পরে আবার স্ত্রীবাচক প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন: রজক – রজকী / রজকিনি, গোপ – গোপী/ গোপিনী, মাতঙ্গ – মাতঙ্গী / মাতঙ্গিনী, হেমাঙ্গ – হেমাঙ্গী / হেমাঙ্গিনি, বিহঙ্গ – বিহঙ্গী /বিইঙ্গিনি, অভাগা – অভাগা -অভাগিনি, ননদাই – ননদী / ননদিনি, সুনয়ন – সুনয়না / সুনয়নী, সুকণ্ঠ – সুকণ্ঠা / সুকণ্ঠী, কৃশোদর – কৃশোদরা / কৃশোদরী।

১৪. কিছু কিছু পুরুষবাচক শব্দের শেষে স্ত্রীবাচক প্রত্যয় যোগ করা যায় না। তখন এগুলোর পূর্বে স্ত্রীবাচক শব্দ যোগ করতে হয়। যেমন: কবি – মহিলা কবি, ডাক্তার – মহিলা ডাক্তার, শিল্পী – মহিলা শিল্পী, কর্মী – মহিলা কর্মী, পুলিশ – মহিলা পুলিশ ইত্যাদি।

সতর্কতা ও সাবধানতা

বাজারে প্রচলিত প্রায় সকল ব্যাকরণ বইতে এই তথ্যটি দেখতে পাওয়া যায় সুকেশ (অর্থ — যে পুরুষের মাথায় সুন্দর চুল আছে)আর এর স্ত্রীবাচক রূপ — সুকেশা, সুকেশী, সুকেশিনী ৩টিই সঠিক। এই তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুল।

বাংলা একাডেমির “আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে –

→ সুকেশ = সুন্দর কেশবিশিষ্ট [পুরষবাচক]

→ সুকেশা = সুন্দর কেশবিশিষ্টা [স্ত্রীবাচক]

— সুকেশী = সুন্দর কেশবিশিষ্ট [পুরষবাচক]

→ সুকেশিনী = সুন্দর কেশবিশিষ্টা [স্ত্রীবাচক]

তার মানে বাজারের প্রচলিত প্রায় সব বইয়ে ‘সুকেশ’ শব্দের স্ত্রীবাচক রূপ হিসেবে ‘সুকেশা’, ‘সুকেশী’ ও ‘সুকেশিনী’ – তিনটিই সঠিক বলে যে তথ্যটি পাওয়া যায় তা নিশ্চিত ভুল। “সুকেশ’ শব্দের স্ত্রীবাচক শব্দ কেবল ‘সুকেশা’ আর ‘সুকেশী’ শব্দের স্ত্রীবাচক শব্দ কেবল ‘সুকেশিনী

গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুরুষ ও স্ত্রীবাচক শব্দ


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

0 out of 0 Marked as Helpfull !