বচন Last updated: 6 months ago

১. বচন” শব্দটির অর্থ সংখ্যার ধারণা। এটি ব্যাকরণের শব্দতত্ত্বের আলোচিত বিষয়। “বচন” শব্দটি সংস্কৃত থেকে এসেছে। তবে এটি ব্যাকরণের একটি পারিভাষিক শব্দ যার মূল শব্দ – ইংরেজি Number.

২. “বচন” কৃৎ প্রত্যয় সাধিত শব্দ। এর বিশ্লেষিত রূপ – বচ্ + অন

৩. বচন হয় = ২ টি পদের (বিশেষ্য ও সর্বনাম)।

৪. বচন হয় না = ৩ টি পদের (বিশেষণ, অব্যয় ও ক্রিয়া)।

৫. বচন কত প্রকার? = ২ প্রকার (একবচন ও বহুবচন)।

একবচন: যে-কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা প্রাণীর একটিমাত্র সংখ্যার ধারণা বুঝালে তাকে একবচন। বলে। যেমন: ছেলেটি খেলা করছে।

বহুবচন: যে-কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা প্রাণীর একাধিক সংখ্যার ধারণা বুঝালে তাকে বহুবচন বলে যেমন: মেয়েরা এখনও আসে

৬. বচন প্রকাশের জন্য কী ব্যবহৃত হয়? = সমষ্টিবোধক শব্দ।

৭. সমষ্টিবোধক শব্দের বেশিরভাগ আগত = সংস্কৃত ভাষা থেকে।

৮. প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক উভয় ক্ষেত্রেই বচনের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তবে প্রাণিবাচকের ক্ষেত্রে আবার বচন ২ প্রকার

ক. উন্নত প্রাণিবাচক = কেবল মানুষই উন্নত প্রাণিবাচকের উদাহরণ। যেমন: ছাত্র, শিক্ষক, আলেম ইত্যাদি।

খ. ইতর প্রাণিবাচক = মানুষ ছাড়া সকল প্রাণীই অনুন্নত বা ইতর প্রাণিবাচকের উদাহরণ। যেমন: গোরু, ছাগল, বানর, সায় হাতি, উদ্ভিদ ইত্যাদি।

৯. অপ্রাণিবাচক শব্দের উত্তরে (পরে) কোন বিভক্তি যুক্ত হয়? = কোনো বিভক্তি যুক্ত হয় না। যেমন: কলম দাও।

১০.উন্নত প্রাণিবাচক বা মনুষ্য শব্দের বহুবচনে ব্যবহৃত বিভক্তিরা, এরা, দিগ, দের। যে ধরনের শব্দে ‘রা যুক্ত হয় সে ধরনের শব্দের শেষে অনেক সময় ‘রা’ এর পরিবর্তে এরা’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: মায়েরা ঝিয়েরা একত্র হয়েছে। তবে কবিতায় বা অন্যান্য প্রয়োজনে অপ্রাণী ও ইতর প্রাণীর বহুবচনেও “রা’ বা ‘এরা যুক্ত হতে পারে। যেমন: পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায় পিপীলিকারা বিধাতার কাছে পাখা চায়। কাকেরা এক বিরাট সভা করল।

১১. উন্নত প্রাণিবাচক বা মনুষ্য শব্দের বহুবচনে ব্যবহৃত সমষ্টিবোধক শব্দ ৪ টি। যথা:

  • বৃন্দ = সুধীবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ, ভক্তবৃন্দ ইত্যাদি।
  • বর্গ = পণ্ডিতবর্গ, মন্ত্রিবর্গ ইত্যাদি।
  • গণ = দেবগণ, নরগণ, জনগণ ইত্যাদি।
  • মণ্ডলী = শিক্ষকমণ্ডলী, সম্পাদকমণ্ডলী ইত্যাদি।

১২. অপ্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে ব্যবহৃত সমষ্টিবোধক শব্দ: আবলি, গুচ্ছ, দাম, নিকর, পুঞ্জ, মালা, রাজি, রাশি, নিচয় (চয়),ব্রজ। যেমন: পুস্তকাবলি, কবিতাগুচ্ছ, কুসুমদাম, কমলনিকর, মেঘপুঞ্জ, মেঘমালা, পর্বতমালা, বৃক্ষরাজি, বালিরাশি, তারকারাজি, কুসুমনিচয়, তারাচয়, ভূধরব্রজ ইত্যাদি। এছাড়াও অপ্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে আরও কিছু সমষ্টিবোধক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যথা: গ্রাম, দল, মহল, মণ্ডল, কলাপ, সমুদয় ইত্যাদি। যেমন: গুণগ্রাম, দল, বন্ধুমহল, তারকামণ্ডল, ক্রিয়াকলাপ, কর্মসমুদয়, গ্রন্থসমুদয় ইত্যাদি।

১৩.প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক শব্দের বহুবচনে ব্যবহৃত সমষ্টিবোধক শব্দ: কুল, সকল, সব, সমূহ। যেমন:

  • কুল = কবিতাকুল, মাতৃকুল, পক্ষিকুল ইত্যাদি।
  • সব = ভাইসব, পাখিসব ইত্যাদি।
  • সকল = মনুষ্যসকল, পর্বতসকল ইত্যাদি।
  • সমূহ = বৃক্ষসমূহ, মনুষ্যসমূহ ইত্যাদি।

১৪. জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত সমষ্টিবোধক শব্দ: পাল, যূথ। যেমন:

  • রাখাল গোরুর পাল লয়ে যায় মাঠে।
  • হস্তিযূথ মাঠের ফসল নষ্ট করছে

১৫. জাতিবাচক শব্দের একবচনেই প্রকাশ পায় = বহুবচনের অর্থ। যেমন: মানুষ (সব মানুষ) সৃষ্টির সেরা জীব। হরিণ (সব হারণ) বনে বাস করে।

১৬. বচনের এর প্রয়োগঘটিত কারণে নিচের কোনটি ভুল?

ক. মানুষ মরণশীল

খ. মানুষেরা মরণশীল

গ. সব মানুষই মরণশীল।

ঘ. সকল মানুষেরাই মরণশীল

উত্তর: ঘ’ নং অপশনের উত্তরটি ভুল। কারণ একই সঙ্গে দুইবার বহুবচনবাচক প্রত্যয় বা শব্দ ব্যবহৃত হয় না। – ঘ’ নং অপশনে একইসাথে ‘সকল’ এবং ‘রা’ দুইটি বহুবচনবাচক প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়েছে।

বচনের প্রয়োগঘটিত কিছু ভুল বাক্যের উদাহরণ

– সকল আলেমগণ সভায় উপস্থিত হয়েছেন।

– সব শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

– এই প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষকগণ কঠোর পরিশ্রমী।

– সকল অভিভাবকদেরই উচিত সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।

– দেশের সকল সরকারি অফিসগুলোর আসন সংখ্যা সীমিত।

বহুবচনের প্রয়োগ বৈশিষ্ট্য(খুবই গুরুত্বপূর্ণ)।

১৭. বিশেষ্য শব্দের একবচনের ব্যবহারেও অনেক সময় বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন: সিংহ বনে থাকে(একবচন ও বহুবচন উভয়ই বোঝায়), বনে বাঘ আছে (বহুবচন), পোকার আক্রমণে ফসল নষ্ট হয়(বহুবচন), বাগানে ফুল ফুটেছে (বহুবচন), বাজারে লোক জমেছে (বহুবচন), শিপন স্যার অনলাইনে ছাত্র পড়ান (একবচন ও বহুবচন)।

১৮. বিশেষ নিয়মে সাধিত বহুবচন: মেয়েরা কানাকানি করছে, এটাই করিমদের বাড়ি, সকলে সব জানে, রবীন্দ্রনাথরা প্রতিদিন জন্মায় না। ১৯. এক বচনাত্মক বিশেষ্যের আগে অজস্র, অনেক, বিস্তর, বহু, নানা, ঢের ইত্যাদি বহুত্ববাচক শব্দ বিশেষণ হিসেবে প্রয়োগ করেও বহুবচন বোঝানো হয়। যেমন: অজস্র লোক, অনেক ছাত্র, বিস্তর টাকা, বহু মেহমান, নানা কথা, ঢের খরচ, অঢেল সম্পদ ইত্যাদি।

২০. কতিপয় বিদেশি শব্দে সে ভাষার অনুসরণে বহুবচন হয়। যেমন: সাহেব-সাহেবান, বুজুর্গ-বুজুর্গান, কাগজ-কাগজাত।

২১. অনেক সময় বিশেষ্য অথবা বিশেষণ পদের দ্বিত্ব প্রয়োগেও বহুবচন হয়। যেমন: হাঁড়ি হাঁড়ি সন্দেশ, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, বড়ো বড়ো মাঠ, লাল লাল ফুল ইত্যাদি।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

0 out of 0 Marked as Helpfull !