সমাস Last updated: 4 months ago

১. সমাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয় = শব্দতত্ত্বে।

২. সমাস” শব্দটি কোন ভাষার শব্দ? = সংস্কৃত ভাষার।

৩. ‘সমাস” শব্দটি কোন প্রত্যয় সাধিত শব্দ? = কৃৎ প্রত্যয়।

৪. সমাস শব্দের বিভিন্ন বিশ্লেষণ গুলি আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন। যেগুলি হল-

ক) প্রত্যয় : √সম + অস্‌ + অ।

খ) সন্ধি : সম+আস

গ) সমাস : সম্(এক) আস(হওয়া)= এক হওয়া।

৫. সমাসের রীতি বাংলায় এসেছে = সংস্কৃত ভাষা থেকে।

৬. শব্দ তৈরি ও প্রয়োগের বিশেষ রীতি = সমাস।  

৭. সমাস কাকে বলে? = অর্থ সম্বন্ধ আছে এরূপ একাধিক পদের একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি পদ গঠনের প্রক্রিয়াকে সমাস বলে।যেমন: দেশের সেবা = দেশসেবা।

৮. অর্থসম্বন্ধ ব্যতীত পদের কখনো সমাস হয় না।

৯. সমাসে মিলন হয় = পদের।

১০. সন্ধিতে মিলন হয় = ধ্বনির।

১১. “সমাস” শব্দের অর্থ = সংক্ষেপণ।

১২. সমাস সৃষ্টির উদ্দেশ্য = বাক্যে শব্দের ব্যবহার সংক্ষেপকরণ।

১৩. সমাসের অংশগুলোকে একত্রে বলে =প্রতীতি।

১৪. সমাসের প্রতীতি/ জ্ঞান / উপাদান কয়টি? -৫ টি। যথা:

  • পূর্বপদ
  • প্রপদ/উত্তরপদ/শেষপদ
  • সমস্তপদ/সমাসযুক্ত পদ /সমাসবব্ধ পদ / সমাস নিষ্পন্ন পদ।
  • ব্যাসবাক্য/বিগ্রহবাক্য/সমাস বাক্য
  • সমস্যমান পদ।

১৫. উদাহরণের সাহায্যে সমাসের প্রতীতি চিহ্নিতকরণ:

১৬. সমস্তপদ গঠিত হয় = পূর্বপদ ও পরপদের সমন্বয়ে।

১৭. সমাস নিষ্পন্ন শব্দটিকে বলে = সমস্তপদ।

১৮. সমস্তপদের অন্তর্গত পদগুলোকে বলে = সমস্যমান পদ।

১৯. সমস্যমান পদের প্রথম অংশকে বলে = পূর্বপদ।

২০. সমস্যমান পদের শেষ অংশকে বলে = পরপদ।

২১. সমাস কত প্রকার? = ৬ প্রকার (দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, বহুব্রীহি,তৎপুরুষ, অব্যয়ীভাব, দ্বিগু)

২২. সমাস মূলত কত প্রকার? = ৪ প্রকার (দ্বন্দ্ব, বহুব্রীহি, তৎপুরুষ ও অব্যয়ীভাব)।

বি. দ্রঃ ২০২১ সালে প্রকাশিত ৯ম-১০ম শ্রেণির নতুন ব্যাকরণ বইয়ে সমাস ৪ প্রকার আছে ঠিকই তবে সেখানে অব্যয়ীভাব সমাসকে বাদ দিয়ে কর্মধারয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২৩. দ্বিগু সমাসকে অনেক বৈয়াকরণ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কোন সমাসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন? = কর্মধারয় সমাসের।

২৪. কর্মধারয় সমাসকে অনেক বৈয়াকরণ কোন সমাসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন? = তৎপুরুষ সমাসের।

২৫. সমাস মূলত ৪ প্রকার – এই দিক বিবেচনায় তৎপুরুষ সমাসের অন্তর্ভুক্ত আছে কয়টি সমাস? = ২ টি (দ্বিগু ও কর্মধারয় সমাস)।

২৬. অব্যয়ীভাব সমাস = পূর্বপদ প্রধান।

২৭. দ্বিগু, কর্মধারয় ও তৎপুরুষ সমাস = পরপদ প্রধান।

২৮. দ্বন্দ্ব সমাস = উভয়পদ প্রধান।

২৯. বহুব্রীহি সমাস = কোনো পদই প্রধান নয়। অন্য পদ প্রধান / তৃতীয় পদ প্রধান।

৩০. দ্বন্দ্ব সমাসের বিপরীত = বহুব্রীহি সমাস।

৩১. অব্যয়ীভাব সমাসের বিপরীত = কর্মধারয়, তৎপুরুষ ও দ্বিগু।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাসকে সুনিপুণ গৃহিণীর সাথে তুলনা করেছেন। কারণ, কোনো গৃহিণী যেমন তার সুনিপুণ গৃহিণীপনার সাহায্যে বিভিন্ন উপাদানের দ্বারা খাদ্যবস্তু তৈরি করে এবং বিভিন্ন স্বভাবের ব্যক্তিবর্গকে একসূত্রে আবদ্ধ রাখে সমাস প্রক্রিয়াও তেমনি বিভিন্ন অর্থযুক্ত (যদি অর্থগত সম্বন্ধ থাকে) শব্দ বা পদ নিয়ে নতুন শব্দ বা পদ গঠন করে। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাসকে সুনিপুণ গৃহিণীপনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ব্যাসবাক্য মনে রাখার কৌশল

দ্বন্ধ সমাস

ও, এবং, আর থাকলে

কর্মধারয় সমাস

যেই-সেই, যা-এ, যিনি-তিনি, যে-সে থাকলে।

তৎপুরুষ সমাস

বিভক্তি লোপ পেলে

 বহুব্রীহি

যার, যাতে থাকলে

দ্বিগু সমাস

সমাহার থাকলে

অব্যয়ীভাব

নৈকট্য/সমীপে, কিংবা, অভাব, পর্যন্ত, সাদৃশ্য, ক্ষুদ্রতা, যোগ্যতা, অতিক্রম, পশ্চাৎ, অতিক্রান্ত থাকলে

 

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের সমান প্রাধান্য থাকে, তাকে দ্বন্ব সমাস বলে।দ্বন্ব সমাসে পূর্বপদ ও পর পদের সম্বন্ধ বোঝানোর জন্য ব্যাসবাক্যে এবং , ও, আর - এ তিনটি অব্যয় ব্যবহৃত হয়।  যেমন; দেয়াত ও কলম = দোয়াত-কলম। এখানে দোয়াত ও কলম প্রতিটি পদেরই অর্থের প্রাধান্য সমস্ত পদে রক্ষিত হয়েছে। 

দ্বন্দ সমাস কয়েক প্রকারে সাধিত হয়। উদাহরণস্বরুপ:

মিলনার্থক শব্দযোগে = মা-বাপ, মাসি-পিসি, জিন-পরি, চা-বিস্কুট, মশা-মাছি, ছেলে-মেয়ে ইত্যাদি।

বিরোধার্থক শব্দযোগে = দা-কুমড়া, অহি-নকুল, স্বর্গ-নরক, ছোট-বড়, ভালো-মন্দ ইত্যাদি।

বিপরীতার্থক শব্দযোগে = আয়-ব্যয়, জমা-খরচ, ছোট-বড়, ছেলে-বুড়ো, লাভ-লস 

সমার্থক শব্দযোগে = হাট-বাজার, ঘর-দুয়ার, খাতা-পত্র, কাপড়-চোপড়, পোকা-মাকড়, দয়া-মায়া, ধূতি-চাদর ইত্যাদি।

দুটি সর্বনামযোগে = যা-তা, যে-সে, যথা-তথা, তুমি-আমি, এখানে-সেখানে ইত্যাদি

দুটি ক্রিয়াযোগে = দেখা-শোনা, যাওয়া-আসা, চলা-ফেরা, দেওয়া-থোওয়া ইত্যাদি

দুটি ক্রিয়া বিশেষণযোগে = ধীরে-সুস্থে, আগে-পাছে, আকারে-ইঙ্গিতে ইত্যাদি।

দুটি বিশেষণযোগে = ভালো-মন্দ, কম-বেশি, আসল-নকল, বাকি-বকেয়া ইত্যাদি।

অঙ্কবাচক শব্দযোগে = নয়-ছয়, উনিশ-বিশ, সাত-সতেরো।

অলুক দ্বন্দ্ব: যে ফন্দ্ব সমাসে কোনো সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ হয় না, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন দুধে-ভাতে, জলে-স্থলে, দেশে-বিদেশে, হাতে-কলমে। 

বহুপদী দ্বন্দ্বঃ তিন বা বহু পদে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: সাহেব-বিবি-গোলাম, হাত পা-নাক-মুখ-চোখ ইত্যাদি।

একশেষ দ্বন্দ্ব: প্রধান পদটি অবশিষ্ট থেকে অন্যপদ লুপ্ত হলে বা শেষপদ অনুসারে শব্দের রূপ নির্ধারিত হলে তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: সে, তুমি ও আমি = আমরা; এখানে শেষপদ ‘আমি’ অনুসারে সমস্তপদ ‘আমরা’ নির্ধারিত হয়েছে। অনুরূপ, জয়া ও পতি = দম্পতি, তুমি ও সে = তোমরা, কাকা, মামা ও বাবা = বাবারা ইত্যাদি।

কর্মধারয় সমাস

সংজ্ঞা- ‘কর্মধারয়’ শব্দের অর্থ হল ‘কর্ম’ বা ‘বৃত্তি’ ধারণকারী।  কর্মধারয় সমাসে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়। মূলত, এই সমাসে বিশেষণ বা বিশেষণ ভাবাপন্ন পদ পূর্বপদ ও বিশেষ্য বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদ পরপদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর ব্যাসবাক্যটিতে ঐ বিশেষ্য বা বিশেষ্য ভাবাপন্ন পদটি সম্পর্কে কিছু বলা হয়। অর্থাৎ পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়।

যেমন- নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম। এখানে, পূর্বপদ ‘নীল’ বিশেষণ ও পরপদ ‘পদ্ম’ বিশেষ্য। ব্যাসবাক্যে ‘পদ্ম’ সম্পর্কে বলা হয়েছে পদ্মটি ‘নীল’ রঙের। অর্থাৎ, ‘পদ্ম’ বা পরপদের অর্থই এখানে প্রধান, পরপদ ছাড়া পূর্বপদের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই এটি কর্মধারয় সমাস।

কর্মধারয় সমাসের জন্য কয়েকটি বিশেষ নিয়ম খেয়াল রাখুন-

  • দুইটি বিশেষণ একই বিশেষ্য বোঝালে সেটি কর্মধারয়সমাস হয়। যেমন, যে চালাক সেই চতুর = চালাক-চতুর। এখানে পরবর্তী বিশেষ্যটি অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে এটি দ্বন্দ্ব সমাস হবে না।
  • দুইটি বিশেষ্য একই ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝালে সেটিও কর্মধারয় সমাস হয়। যেমন, যিনি জজ তিনি সাহেব = জজসাহেব। একই কারণে এটি দ্বন্দ্ব না কর্মধারয় হবে।
  • কার্যে পরপম্পরা বোঝাতে দুটি কৃদন্ত বিশেষণ বা ক্রিয়াবাচক বিশেষণ পদেও কর্মধারয়সমাস হয়। যেমন, আগে ধোয়া পরে মোছা = ধোয়ামোছা। এখানে ‘মোছা’ কাজটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
  • পূর্বপদে স্ত্রীবাচক বিশেষণ থাকলে তা পুরুষবাচক হয়ে যাবে। যেমন, সুন্দরী যে লতা = সুন্দরলতা
  • বিশেষণবাচক মহান বা মহৎ শব্দ পূর্বপদ হলে মহা হয়। মহৎ যে জ্ঞান = মহাজ্ঞান
  • পূর্বপদে ‘কু’ বিশেষণ থাকলে এবং পরপদের প্রথমে স্বরধ্বনি থাকলে ‘কু’, ‘কৎ’ হয়। যেমন, কু যে অর্থ = কদর্থ।
  • পরপদে ‘রাজা’ থাকলে ‘রাজ’ হয়। যেমন, মহান যে রাজা = মহারাজ।
  • বিশেষণ ও বিশেষ্য পদে কর্মধারয় সমাস হলে কখনো কখনো বিশেষ্য আগে এসে বিশেষণ পরে চলে যায়। যেমন, সিদ্ধ যে আলু = আলুসিদ্ধ।

কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ —

ক) সাধারণ কর্মধারয় সমাস

খ) মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস

গ) উপমান কর্মধারয় সমাস

ঘ) উপমিত কর্মধারয় সমাস

ঙ) রূপক কর্মধারয় সমাস

সাধারণ কর্মধারয় সমাস :

বিশেষ্য(Noun)+ বিশেষ্য(Noun):– এখানে দুটি বিশেষ্য পদ যোগে একটি বিশেষ্যপদ ই তৈরী হবে সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে। যেমন:–

জ্ঞাতি যিনি শত্রুও তিনি = জ্ঞাতিশত্রু ,যিনি রাম তিনিই কৃষ্ণ = রামকৃষ্ণ ,যিনি রাজা তিনিই ঋষি = রাজর্ষি

ওপরের সমস্ত পদ গুলোর গঠন (Noun + Noun) দেখে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটা উপমিত কর্মধারয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো সাধারণ কর্মধারয়, কারণ –উপমিত কর্মধারয়ের উদাহরণে পূর্বপদ ও পরপদ দ্বারা দুটি আলাদা বিষয়কে বোঝায়। যেমন: চাঁদমুখ(চাঁদ আর মুখ দুটি আলাদা বিষয়), ফুলকুমারী (ফুল আর কুমারী দুটি আলাদা বিষয়) ইত্যাদি। আর সাধারণ কর্মধারয়ের উদাহরণগুলোতে পূর্বপদ ও পরপদ দ্বারা একই বিষয়কে বোঝায়। যেমন: জজসাহেব (জজ আর সাহেব দ্বারা একই ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে), রাজর্ষি (রাজা আর ঋষি দ্বারা একই ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে) ইত্যাদি।

বিশেষণ(Adjective) + বিশেষণ(Adjective) :– এই সমাসে দুটি বিশেষণ ই একসঙ্গে একই ব্যক্তি/ বস্তু তে উপস্থিত বোঝাবে যেমন–

কাঁচা অথচ মিঠে = কাঁচামিঠে (একটি ফল) ,আগে ধোয়া পরে মোছা = ধোয়ামোছা (একটি স্থান )

বিশেষণ(Adjective)+বিশেষ্য(Noun):- এখানে বিশেষ্য ও বিশেষণ পদ পূর্বপদ –পরপদ রূপে বসে একই ব্যক্তি/বস্তু কে প্রকাশ করে যেমন:-

সাধারণ যে জন = জনসাধারণ ,পাণ্ডু ( খসড়া ) যে লিপি = পাণ্ডুলিপি ,প্রিয় যে সখা = প্রিয়সখ

বিশেষ্য(Noun)+বিশেষণ(Adjective):- Noun+Adjective যোগে গঠিত সাধারণ কর্মধারয় সমাসের ব্যাসবাক্য করার ক্ষেত্রে Adjective আগে বসে। যেমন-  উত্তম যে পুরুষ = পুরুষোত্তম , ভাজা যে চাল = চালভাজা ,অধম যে নর = নরাধম।

সমপদওলোৱ গঠন (Noun + adj.) দেখে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটা আবার উপমান কর্মধারয় বলে মনে হতে পারে। কিন্ত এটা সাধারণ কর্মধারয়, কারণ – উপমান কর্মধারয়ের উদাহরণগুলো বাস্তবে একমুখী। যেমন: অরুণরাঙা (অরুণ কেবল রাঙাই হয়), তুষারশীতল (তুষার তেল শীতলই হয়), নিমতিতা (নিম কেবল তিস্তাই হয়) ইত্যাদি। আর সাধারণ কর্মধারয়ের উদাহরণগুলো একমুখী হয় না। যেমন- হলুদবাটা (হলুদ কেবল বাটা অবস্থাই থাকে না), নরাধম (নৱ কেবল অধমই হয় না), আলুসিদ্ধ (আলু কেবল সিদ্ধ অবস্থায়ই থাকে না) ইত্যাদি।

মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস :

এই কর্মধারয় সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যে অবস্থিত পদ লোপ পায়। যেমন:–

জীবনহানির আশঙ্কায় বীমা =জীবনবীমা,আক্ষেপ-দ্যোতক অনুরাগ=আক্ষেপানুরা,ছাত্র থাকাকালীন জীবন = ছাত্রজীবন,সিঁদুর রাখিবার কৌটা = সিঁদুরকৌটা

মনে রাখার বিষয় :–

[তৎপুরুষ সমাসে ব্যাসবাক্যের মধ্যস্থিত বিভক্তি-স্থানীয় অনুসর্গ লোপ পায়। আর মধ্যপদলোপী কর্মধারয়সমাসে অনুসর্গ নয়, কোনো পদের লোপ ঘটবে।]

সিংহাসন

সিংহ চিহ্নিত আসন

 

 

মধ্যপদলোপী সমাস

জোৎস্নারাত

জোৎস্না সুভিত রাত

মৌমাছি

মৌ-সঞ্চয়কারী মাছি

ভিক্ষান্ন

ভিক্ষা লব্ধ অন্ন

পলান্ন

পল মিশ্রিত অন্ন

হাসিমুখ

হাসি মাখা মুখ

উপমান কর্মধারয় সমাসঃ

উপমান ও উপমিত কর্মধারয় সমাস আলাদা করে চেনার আগে কতোগুলো সংজ্ঞা/ টার্মস জানা জরুরি। সেগুলো হলো- উপমান, উপমেয় ও সাধারণ ধর্ম।

  • কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা হলে যাকে তুলনা করা হলো, তাকে বলা হয় উপমেয়
  • আর যার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমান
  • আর উপমেয় আর উপমানের যে গুণটি নিয়ে তাদের তুলনা করা হয়, সেই গুণটিকে বলা হয় সাধারণ ধর্ম ।

যেমন, ‘অরুণের ন্যায় রাঙা প্রভাত’।

এখানে ‘প্রভাত’কে ‘অরুণ’র মতো ‘রাঙা’ বলে তুলনা করা হয়েছে। সুতরাং, এখানে ‘প্রভাত’ উপমেয়উপমান হলো ‘অরুণ’। আর প্রভাত আর অরুণের সাধারণ ধর্ম হলো ‘রাঙা’

উপমানের (যার সাথে তুলনা করা হয়) সঙ্গে সাধারণ ধর্মবাচক পদের সমাসকে উপমান কর্মধারয়সমাস বলে।

মনে রাখার বিষয়:-

এখানে উপমান পদটি প্রথমে বসে, তারপর সাদৃশ্যবাচক শব্দ,শেষে সাধারণ ধর্মবাচক পদ বসে উপমান + সাদৃশ্য বাচক শব্দ + সাধারণ ধর্মবাচক পদ = উপমান কর্মধারয়সমাস

যেমন:– শঙ্খের ন্যায় শুভ্র = শঙ্খশুভ্র,বজ্রের মতো কঠিন = বজ্রকঠিন ,আলতার মতো রাঙা = আলতারাঙা

উপমিত কর্মধারয় সমাস:

উপমেয় (যাকে তুলনা করা হয়) -র সাথে উপমান এর যে সমাস হয় , তাকে উপমিত কর্মধারয়সমাস বলে ।

মনে রাখার বিষয়:–

এই সমাসে কোনো সাধারণ ধর্মবাচক পদের উল্লেখ থাকে না। উপমেয় + উপমান + সাদৃশ্য বাচক শব্দ = উপমিত কর্মধারয়সমাস । যেমন:–

নয়ন কমলের ন্যায় = নয়নকমল, অধর বিম্বের ন্যায় = বিম্বাধর, কথা অমৃতের তুল্য = কথামৃত

 

উপমান ও উপমিত কর্মধারয় সমাস চিহ্নিতকরণের সহজ সূত্র

অনেকেই প্রচলিত ধারায় ব্যাসবাক্য দিয়ে উপমান ও উপমিত নির্ণয় করেন। ব্যাসবাক্যের মাঝে ন্যায় থাকলে তা উপমান আর ব্যাসবাক্যের শেষে ন্যায় থাকলে তা উপমিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে। পরীক্ষার প্রশ্নে তো ব্যাসবাক্য দেওয়া থাকে না, শুধু সমস্তপদ দেওয়া থাকে। আর সেখান থেকে ব্যাসবাক্য নির্ণয় করতে গেলেই আমরা ভুল করি। যেমন: ‘চাঁদমুখ’ এর ব্যাসবাক্য কেউ বলতে পারেন চাঁদের ন্যায় মুখ’ অর্থাৎ উপমান আবার কেউ বলতে পারেন ‘মুখ চাঁদের ন্যায়’ অর্থাৎ উপমিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোনটা সঠিক? একারণে আমরা ব্যাসবাক্য দিয়ে সমাস নির্ণয়ের পদ্ধতিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। তাহলে উপায়? বাজারের অনেক প্রচলিত বইতে উপমান ও উপমিত’র আরেকটা টেকনিক দেখতে পাওয়া যায়। সেটা হচ্ছে

উপমান = Noun + Adjective

উপমিত = Noun + Noun

এই পদ্ধতিতে উপমান উপমিত'র অধিকাংশই সমাধান করা যায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে Noun বা Adjective সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অপ্রতুল জ্ঞানের অভাবে ভুলের সম্ভাবনা থাকে। যেমন: ফুলকুমারী – এখানে ‘ফুল’ Noun, এটা তো নিশ্চিত কিন্তু কমারী কী। ‘কুমারী’ দিয়ে একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে কি হয়নি এরূপ অবস্থা বুঝাচ্ছে অর্থাৎ Adjective. তাহলে নিয়মানুসারে Noun + Adjective হওয়ায় ফুলকুমারী' উপমান কর্মধারয় সমাস হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের সকল ব্যাকরণ বইতে ‘ফুলকুমারী’কে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলা হয়েছে যার ব্যাসবাক্য করা হয়েছে ‘কুমারী ফুলের ন্যায়। তার মানে ‘ফুলকুমারী’ সমস্তপদে ‘কুমারী’কে ধরা হয়েছে Noun হিসেবে। একারণে আমরা এই Noun + Adjective / Noun + Noun পদ্ধতি শিখব না। আসুন আরও সহজে নতুন টেকনিকে উপমান ও উপমিত শিখি।

সমস্তপদটি সত্য হলেই “উপমান আর মিথ্যা হলেই ‘উপমিত”

উপমান কর্মধারয় - অরুণরাঙা = অরুণ (সূর্য) তো সবসময় রাঙাই (লাল) হয়; ভ্রমরকৃষ্ণ = ভ্রমর তো সবসময় কৃষ্ণই (কালো), তুষারশীতল এল তুষার তো সবসময় শীতলই হয়; কাজলকালো = কাজল তো সবসময় কালোই হয়। এরূপ - কুসুম নয়নকোমল, দুধসাদা, সিঁদুররাঙা, তুষারধবল, রক্তলাল, ধনুকবাঁকা, হস্তিমূৰ্থ, স্বর্ণোজ্জল, বজ্রকঠিন, শিশিরস্নিগ্ধ, কাচ নিমতিতা, আলতারঙা, প্রস্তরকঠিন ইত্যাদি।

উপমিত কর্মধারয় - অধরপল্লব = অধর (ঠোঁট) কখনোই পল্লব (পাতা) হয় না; বাহুলতা = বাহু কখনোই লতা হয় না; নয়নকাল নয়ন কখনোই কমল (পদ) হয় না; পদালোচন = পদ্ম কখনোই লোচন (চোখ) হয় না; ফুলকুমারী = ফুল কখনোই কুমারী হয় না এরূপ - বজ্রকণ্ঠ, সিংহপুরুষ, বাহুলতা, সোনামুখ ইত্যাদি।

উপমান ও উপমিত কর্মধারয় সমাসের ব্যাসবাক্য নির্ণয়

অনেক সময় প্রশ্নে সমাসবদ্ধ পদটির ব্যাসবাক্য নির্ণয় করতে বলা হয়। এক্ষেত্রে আগে আমরা সমাসটি নির্ণয় করে নেব। তারপর তা উপমান হয় তাহলে “ন্যায় / মতো” শব্দটি মাঝে বসবে আর যদি উপমিত হয় তাহলে “ন্যায় / মতো” শব্দটি শেষে বসবে। আর একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে উপমিত কর্মধারয়ের সমস্তপদ যাই হোক না কেন ব্যাসবাক্য করার সময় সর্বদা মনে রাখবেন যায় তুলনা করা হচ্ছে সে ব্যাসবাক্যে আগে বসবে আর যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে সে ব্যাসবাক্যে পরে বসবে। আমরা মুখের সাথে চাঁদের তুলনা দেই না; চাঁদের সাথে মুখের তুলনা দেই। তাই অবশ্যই সঠিক রূপ হবে – মুখ চাঁদের ন্যায় = চাঁদমুখ। এরূপ – সিংহপুরুষ = পুরুষ সিংহের ন্যায় ইত্যাদি।

রূপক কর্মধারয় সমাস

যে সমাসে উপমেয় ও উপমান এর মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয়, তাকে রূপক কর্মধারয়সমাস বলে।

মনে রাখার বিষয়:–

এখানে উপমেয় আর উপমান এর মধ্যে ‘রূপ’ শব্দটি বসে। উপমেয় + রূপ + উপমান = রূপক কর্মধারয়সমাস যেমন:–

যৌবন রূপ কুসুম = যৌবনকুসুম, প্রাণ রূপ প্রবাহিণী = প্রাণপ্রবাহিণী, জীবন রূপ যুদ্ধ = জীবনযুদ্ধ, সুখ রূপ দীপ = সুখদীপ।

রূপক কর্মধারয় সমাস চিহ্নিতকরণের সহজ সূত্র

রূপক কর্মধারয় সমাসবদ্ধ পদের প্রথমাংশ অদৃশ্যমান এবং পরের অংশ দশ্যমান। ওপরে উল্লিখিত উদাহরণগুলোর বেশিরভাগই এই নিয়মে সাধিত। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে।

১. দেহ রূপ ঘড়ি = দেহঘড়ি

২. দেহ রূপ পিঞ্জর = দেহপিঞ্জর।

৩. দেহ রূপ কাণ্ড = দেহকাণ্ড

8. দেহ রূপ তত্ত্ব = দেহতত্ত্ব ।

৭. প্রাণ রূপ স্বপ্ন = প্রাণস্বপ্ন

৫. দেহ রূপ কল্প = দেহকল্প

৮, প্রেম রূপ ডোর (বন্ধন) = প্রেমডোর।

৬. কায়া রূপ তরু = কায়াতরু।

৯. মন রূপ পবন = মনপবন

এই উদাহরণগুলোর প্রথম ৬টির সমস্তপদের দুটি অংশই দশ্যমান আবার শেষের ৩টির সমস্তপদের দুটি অংশই দশ্যমান। মোট কথা, দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান মূল ব্যাপার নয়। মূল ব্যাপার হচ্ছে – সমস্তপদের দুটি অংশের মধ্যে অভিন্ন কল্পনা।

কর্মধারয় সমাসের শ্রেণিবিন্যাস চেনার সহজ উপায়

সমাসের নাম

সমাস হওয়ার শর্ত

উদাহরণ

উপমান কর্মধারয়

দুটি বস্তুর তুলনা করা হয় যা সত্য

কাজলকাল

উপমিত কর্মধারয়

দুটি বস্তুর তুলনা করা হয় যা মিথ্যা

সিংহপুরুষ

রূপক কর্মধারয়

দুটি বস্তুর তুলনা করা হয় যা অসম্ভব, রূপক ও অদৃশ্য

মনমাঝি

মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

সমাসের ব্যাসবাক্যে মধ্যপদ লোপ

ঘরে আশ্রিত জামাই→ঘরজামাই

সাধারণ কর্মধারয়

পরপদের অর্থের প্রাধান্য

গিন্নিমা

 

তৎপুরুষ সমাস

যে সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি ও সন্নিহিত অনুসর্গ লোপ পায় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: লবণ দ্বারা অক্ত (যুক্ত) = লবণাক্ত; এখানে পূর্বপদের (লবণ) সন্নিহিত অনুসর্গ ‘দ্বারা’ লোপ পেয়েছে ‌এবং পরপদের (অক্ত) অর্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। একইভাবে তৎপুরুষ সমাসের অধিকাংশ উদাহরণে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় ও পরপদের অর্থের প্রাধান্য থাকে। তৎপুরুষ শব্দটি এই রীতিতে নিষ্পন্ন সমাসের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। আরও উদাহরণ –

নিম রূপে/ভাবে রাজি = নিমরাজি, অন্ধ করে যে = অন্ধকার, বিয়ের জন্য পাগলা = বিয়ে পাগলা, স্নাতক হতে উত্তর = স্নাতকোত্তর, গোলায় ভরা = গোলাভরা, দৃঢ় ভাবে বদ্ধ = দৃঢ়বদ্ধ ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাস ৯ প্রকার যথাঃ- ১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ, ২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস, ৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস, ৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস, ৫. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস, ৬. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস, ৭. নঞ তৎপুরুষ সমাস, ৮. উপপদ তৎপুরুষ সমাস, ৯. অলুক তৎপুরুষ সমাস

দ্বিতীয়া-তৎপুরুষ

পূর্বপদে দ্বিতীয়া-বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস, তাকে দ্বিতীয়া-তৎপুরুষ বলে। যেমন: স্বর্গকে/স্বর্গে গত = স্বর্গগত। এ সমাসে সাধারণত (কে, রে, ব্যাপিয়া) ইত্যাদি লোপ পায়। আরও উদাহরণ- বইকে পড়া = বইপড়া, বিস্ময়কে আপন্ন = বিস্ময়াপন্ন, বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন, আমকে কুড়ানো = আমকুড়ান, দেবকে দত্ত = দেবদত্ত, গাকে ঢাকা = গা-ঢাকা, ছেলেকে ভুলানো = ছেলে-ভুলানো, দুঃখকে অতীত = দুঃখাতীত, রথকে দেখা = রথদেখা।

মনে রাখার টেকনিক

টেকনিক – ১: সমস্তপদের শেষে প্রাপ্ত, পন্ন, গত, আশ্রিত, অতীত থাকলেই তা দ্বিতীয়া তৎপুরুষ হবে। যেমন:

প্রাপ্ত = অবসরপ্রাপ্ত, ভারপ্রাপ্ত, বৃত্তিপ্রাপ্ত, সুযোগপ্রাপ্ত, সাহায্যপ্রাপ্ত, ক্ষমতাপ্রাপ্ত, পুরস্কারপ্রাপ্ত, দুঃখপ্রাপ্ত ইত্যাদি।

পন্ন = বিপদাপন্ন, বিস্ময়াপন্ন, স্মরণাপন্ন, মরণাপন্ন, সঙ্কটাপন্ন, সঙ্গতিপন্ন, ভাবাপন্ন ইত্যাদি।

গত = পুঁথিগত, ব্যক্তিগত, পরলোকগত, শরণাগত, হস্তগত, কুক্ষিগত ইত্যাদি।

আশ্রিত = চরণাশ্রিত, দেবাশ্রিত, দুর্গাশ্রিত, শরণাগত, হস্তগত, কুক্ষিগত ইত্যাদি।

অতীত = দুঃখাতীত, বর্ণনাতীত, শোকাতীত, আনন্দাতীত, কুক্ষিগত ইত্যাদি।

টেকনিক – ২: সময়ের ব্যাপ্তি বুঝালেই তা দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী, ক্ষণকাল ধরে স্থায়ী = ক্ষণস্থায়ী, চিরকাল ধরে কুমারী = চিরকুমারী। এরূপ — দীর্ঘস্থায়ী, চিরস্থায়ী, চিরশত্রু, চিরদুঃখী, চিরকৃতজ্ঞ, চিরস্মরণীয়, চিরবসন্ত, চিরহরিৎ, চিরবঞ্চিত, চিরপ্রচলিত, চিরকুমার ইত্যাদি।

টেকনিক – ৩: সমস্তপদের দ্বারা কোনো কাজ বুঝালেই তা ২য়া তৎপুরুষ সমাস। যেমন: শরনিক্ষেপ – এখানে “শর’ মানে তীর আর নিক্ষেপ’ মানে ছোড়া। তার মানে ‘শরনিক্ষেপ’ দ্বারা তীর ছোড়ার কাজকে বোঝায়। এরূপ — ঢাকবাজানো, ঘরসাজানো, কলাবেচা, রথদেখা, আমকুড়ানো, বীজবোনা, ভাতরাঁধা, গা-ঢাকা, তপোবনদর্শন ইত্যাদি এগুলো সবই কাজ বোঝায়।

তৃতীয়া-তৎপুরুষ

পূর্বপদে তৃতীয়া-বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস, তাকে তৃতীয়া-তৎপুরুষ বলে। যেমন: রজ্জু(দড়ি) দ্বারা বন্ধ = রজ্জুবন্ধ। তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাসে সাধারণত ব্যাসবাক্যের (দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক) ইত্যাদি লোপ পায়। উদাহরণ- মন দিয়ে গড়া = মনগড়া, মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা, চিনি দিয়ে পাতা = চিনিপাতা, শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ, ধনে আঢ্য(সমৃদ্ধ) = ধনাঢ্য, বাক্ দ্বারা বিতণ্ডা = বাকবিতণ্ডা, হীরক দ্বারা খচিত = হীরকখচিত, চন্দন দ্বারা চর্চিত = চন্দনচর্চিত, স্বর্ণ দ্বারা মণ্ডিত = স্বর্ণমণ্ডিত, রত্ন দ্বারা শোভিত = রত্নশোভিত, মেঘ দ্বারা শূন্য = মেঘশূন্য, বাক্(কথা) দ্বারা দত্তা = বাগদত্তা, বাক্(কথা) দ্বারা দত্তা = বাগদত্তা, বিদ্যা দ্বারা হীন(শূন্য) = বিদ্যাহীন, এক দ্বারা ঊন(কম) = একোন(এক কম এমন), জ্ঞান দ্বারা শূন্য = জ্ঞানশূন্য, পাঁচ দ্বারা কম = পাঁচকম

মনে রাখার টেকনিক

টেকনিক – ১: সমস্তপদের প্রথমাংশের দ্বারা দ্বিতীয়াংশের কাজ সম্পাদিত হলেই তা ওয়া তৎপুরুষ সমাস। যেমন: মেঘলুপ্ত - এখানে লুপ্ত মানে লুকিয়ে আছে। তাহলে ‘মেঘলুপ্ত’ মানে মেঘ দ্বারা লুকিয়ে থাকা ক্রিয়ার কাজটি সম্পাদিত হয়েছে বুঝাচ্ছে। একইভাবে কন্টকাকীর্ণ – এখানে আকীর্ণ মানে ছড়িয়ে থাকা বা ব্যাপ্ত থাকা। তাহলে ‘কণ্টকাকীর্ণ’ মানে কাঁটা দ্বারা ছড়িয়ে থাকা ক্রিয়ার কাজটি সম্পাদিত হয়েছে বুঝাচ্ছে।

টেকনিক – ২: উন, হীন, শূন্য, কম এই শব্দগুলো সমস্তপদের শেষে থাকলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: একোন। (এক দ্বারা উন), বিদ্যাহীন (বিদ্যা দ্বারা হীন), জ্ঞানশূন্য (জ্ঞান দ্বারা শূন্য)। এরূপ — ক্ষমাহীন, দৃষ্টিহীন, পুষ্পশূন্য, পাঁচকম ইত্যাদি।

 

অলুক তৃতীয় তৎপুরুষ: তৎপুরুষ সমাসে তৃতীয়া বিভক্তি লোপ না পেলে সে সমাসকে অলুক তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: তেলে ভাজা = তেলেভাজা, কলে ছাঁটা = কলেছাটা, তাঁতে বোনা = তাঁতেবোনা, পোকায় কাটা = পোকায়কাটা।

চতুর্থী-তৎপুরুষ

পূর্বপদে চতুর্থী-বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস, তাকে চতুর্থী-তৎপুরুষ বলে। যেমন: যজ্ঞের নিমিত্ত ভূমি = যজ্ঞভূমি। চতুর্থী তৎপুরুষ সমাসে সাধারণত ব্যাসবাক্যের ( কে, জন্য, নিমিত্ত ) ইত্যাদি লোপ পায়। উদাহরণ- গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি, হজ্জের নিমিত্ত যাত্রা = হজ্জযাত্রা, তপের(সাধনার) নিমিত্ত বন = তপোবন (আশ্রম),   রান্নার নিমিত্তে ঘর = রান্নাঘর, ছাত্রের জন্য আবাস = ছাত্রাবাস, চোষের জন্য কাগজ = চোষকাগজ, ডাকের জন্য মাসুল = ডাকমাসুল, মুসাফিরের জন্য খানা = মুসাফিরখানা, মালের জন্য গুদাম = মালগুদাম, মাপের জন্য কাঠি = মাপকাঠি।

মনে রাখার টেকনিক

সমস্তপদের দ্বারা যদি এমনটা বোঝায় যে পরপদ পূর্বপদের জন্য তাহলেই তা ৪র্থী তৎপুরুষ। যেমন: বিদ্যালয় - এখানে ‘আলয়’ মানে স্থান। তাহলে আলয়টা কীসের জন্য? উত্তর: বিদ্যার জন্য। রান্নাঘর – এখানে ঘরটা কীসের জন্য? উত্তর: রান্নার জন্য। গুরুভক্তি - এখানে ভক্তি কার জন্য? উত্তর: গুরুর জন্য। মাপকাঠি – এখানে কাঠি কীসের জন্য? উত্তর: মাপার। জন্য। সেচনকলস – এখানে কলস কীসের জন্য? উত্তর : সেচনের জন্য। এভাবে সবই মিলবে।

পঞ্চমী-তৎপুরুষ

পূর্বপদে পঞ্চমী-বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস, তাকে পঞ্চমী-তৎপুরুষ বলে। যেমন: মুখ হইতে ভ্রষ্ট = মুখভ্রষ্ট। পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাসে সাধারণত ব্যাসবাক্যের ( হইতে, থেকে, চেয়ে ) ইত্যাদি লোপ পায়। উদাহরণ- ইতি হতে আদি = ইত্যাদি, স্কুল থেকে পালানো = স্কুলপালান, পরানের চেয়ে প্রিয় = পরানপ্রিয়, জেল থেকে মুক্ত = জেলমুক্ত, আগা থেকে গোড়া = আগাগোড়া, জেল থেকে খালাস = জেলখালাস, ঋণ থেকে মুক্ত = ঋণমুক্ত, গ্রাম থেকে ছাড়া = গ্রামছাড়া।

মনে রাখার টেকনিক

সমস্তপদের দুটি অংশের মধ্যে বিয়োজক ( – ) সম্পর্ক বোঝাবে। মিলিয়ে নিন, বেশিরভাগই মিলবে। কিছু কিছু মিলবে। যেমন: উল্লিখিত উদাহরণগুলোর শেষের দিকের সমস্তপদগুলো বিয়োজক সম্পর্ক বোঝায় না। তাহলে এগুলো পরীক্ষায় আসলে কীভাবে বুঝবেন? মনে রাখবেন, ৫মী তৎপুরুষ হচ্ছে অপাদান কারকের মতো। অপাদান কারকের যতগুলো নিয়ম আছে। সে নিয়মগুলো সমস্তপদে প্রয়োগ করা গেলে তা ৫মী তৎপুরুষ। যেমন: অপাদান কারকের অনেকগুলো নিয়মের মধ্যে একটি নিয়ম হচ্ছে তুলনা বুঝালে যার সাথে তুলনা করা হয় সে অপাদান কারক। উল্লিখিত উদাহরণগুলোর শেষের দিকের সমস্তপদগুলোতে এই তুলনার বিষয়টিই সুস্পষ্ট। তাই সহজে মনে রাখতে পারেন, ৫মী তৎপুরুষ = অপাদান কারক

ষষ্ঠী তৎপুরুষ

ব্যাসবাক্যে ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) থাকবে কিন্তু সমস্তপদে তা লোপ পাবে। যেমন: চায়ের বাগান = চাবাগান, রাজার কন্যা = রাজকন্যা, ছাত্রের সমাজ = ছাত্রসমাজ, দেশের সেবা = দেশসেবা, বাঁদরের নাচ = বাঁদরনাচ ইত্যাদি।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের উদাহরণ

উপলের খণ্ড = উপলখণ্ড বনের মধ্যে = বনমধ্যে, ধর্মের চর্চা = ধর্মচর্চা, জীবনের সঞ্চার = জীবনসঞ্চা, পাথরের কুচি = পাথরকুচি, পরের অধীন = পরাধীন, কর্মের কর্তা = কর্মকর্তা, ভারের অর্পণ = ভারার্পণ , পুকুরের ঘাট = পুকুরঘাট চন্দ্রের গ্রহণ = চন্দ্রগ্রহণ। পুষ্পের সৌরভ = পুষ্পসৌরভ, মৃত্যুর শয্যা = মৃত্যুশয্যা,  কবিদের গুরু = কবিগুরু, রাষ্ট্রের পতি = রাষ্ট্রপতি, রণের কৌশল = রণকৌশল, সুখের সময় = সুখসময়।

মনে রাখার টেকনিক

সমস্তপদের দুটি অংশের মধ্যে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক বা Logical Combination থাকলে তা ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ স হবে। যেমন: রাজপুত্র = পুত্রটা আসছে কোথা থেকে? রাজা থেকে। তার মানে রাজার সাথে পুত্রের সম্পর্ক যৌক্তিক অর্থাৎ তৎপুরুষ। ভুজবল = বল মানে শক্তি যা আসছে ভুজ মানে হাত থেকে। তার মানে ভূজের সাথে বলের সম্পর্ক যৌক্তিক ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ। পুষ্পসৌরভ = সৌরভটা আসছে কোথা থেকে? পুষ্প থেকে। তার মানে পুষ্পের সাথে সৌরভের সম্পর্ক যৌন অর্থাৎ ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ। ভোটাধিকার = অধিকারটা কীসের? ভোটের। তার মানে ভোটের সাথে অধিকারের সম্পর্ক যৌক্তিকতার ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ। এভাবে সবগুলোই হবে, মিলিয়ে নিন।

৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্য সংক্রান্ত কিছু টেকনিক

  • ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে কালের কোনো অংশ পরে থাকলে সমস্তপদে তা পূর্বে বসে। যেমন: অহ্নের পূর্বভাগ = পূর্বাহ্ন , অহ্নের সায়ম (সন্ধ্যা) ভাগ = সায়াহ্ন।
  • ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে ‘অর্ধ’ এবং মাঝ’ শব্দটি পরপদে থাকলে সমস্তপদে তা পূর্বে বসে। যেমন: রাত্রির অর্ধেক = অর্ধরাত্র, দরিয়ার মাঝ = মাঝদরিয়া, গজনির রাজা = গজনিরাজ, বৎসরের অর্ধেক = অর্ধবৎসর, রাতের মাঝ = মাঝরাত, দিবসের অর্ধেক = অর্ধদিবস, ভাগের অর্ধেক = অর্ধভাগ।
  • ‘রাজা’ শব্দটি শ্রেষ্ঠ অর্থে ব্যবহৃত হলে সমস্তপদে তা পূর্বে বসে। যেমন: পথের রাজা = রাজপথ, হাঁসের রাজা = রাজহাঁস, মিস্ত্রির রাজা = রাজমিস্ত্রি, সর্পের রাজা = রাজসর্প, ধর্মের রাজা = রাজধর্ম , নীতির রাজা = রাজনীতি।
  • ‘রাজা’ শব্দটি King অর্থে ব্যবহৃত হলে সমস্তপদে তা পরে বসে। যেমনঃ গজনির রাজা = গজনিরাজ, বঙ্গের রাজা = বঙ্গরাজ, জাপানের রাজা = জাপানরাজ, নেপালের রাজা = নেপালরাজ।
  • ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্যে শিশু, দুগ্ধ, ডিম্ব ইত্যাদি বহুবচনবাচক বা সমষ্টিবোধক শব্দ পরপদে থাকলে তা ষষ্ঠী শব্দ পরপদে থাকলে স্ত্রীবাচক পূর্বপদটি সমস্তপদে পুরুষবাচক তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন: মৃগীর শিশু = মৃগশিশু, ছাগীর দুগ্ধ = ছাগদুগ্ধ, হস্তীর যূথ = হস্তিযূথ, মৃগীর দুগ্ধ = মৃগদুগ্ধ , ছাগীর শিশু = ছাগশিশু , ছাত্রের বৃন্দ = ছাত্রবৃন্দ, পঙ্গের পাল = পঙ্গপাল, কুকুরীর ছানা =কুকুরছানা , হংসীর ডিম্ব = হংসডিম্ব।

অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস

যে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে সমস্যমান পদগুলোর বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ঘোড়ার ডিম = ঘোড়ার-ডিম, কলুর বলদ = কলুর-বলদ, বাঘের দুধ = বাঘের-দুধ, হাতের পাঁচ = হাতের-পাঁচ , সোনার তরী = সোনার-তরী, ভোরের পাখি = ভোরের-পাখি, মাটির মানুষ = মাটির-মানুষ, সোনার বাংলা = সোনার-বাংলা।

নিপাতনে সিদ্ধ অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস: ভ্রাতার পুত্র = ভ্রাতুস্পুত্র।

সপ্তমী-তৎপুরুষ

পূর্বপদে সপ্তমী-বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস, তাকে সপ্তমী-তৎপুরুষ বলে। যেমন: দিবাতে নিদ্রা = দিবানিদ্রা। সপ্তমী তৎপুরুষ সমাসে সাধারণত ব্যাসবাক্যের (এ, য়, তে,এতে) বিভক্তি লোপ পায়। উদাহরণ- গাছে পাকা = গাছপাকা, পূর্বে ভূত = ভূতপূর্ব , পূর্ব অদৃষ্ট = অদৃষ্টপূর্ব, দিবায় নিদ্রা = দিবানিদ্রা।

মনে রাখার টেকনিক

সমস্তপদের ১ম অংশকে কোথায়, কখন বা কী বিষয়ে – এই ৩টি দ্বারা প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া গেলেই তা ৭মী তৎপুরুষ। যেমন: রাতকানা = কখন কানা? উত্তর: রাতে কানা, বাক্সবন্দি = কোথায় বন্দি? উত্তর: বাক্সে বন্দি, দিবাস্বপ্ন = কখন স্বপ্ন? উত্তর: দিবায় স্বপ্ন, তৃষ্ণার্ত = কীসে আর্ত? উত্তর: তৃষ্ণায় আর্ত, ভোজনপটু = কীসে পটু? উত্তর: ভোজনে পটু ইত্যাদি। এভাবে সবই মিলবে, মিলিয়ে নিন।

নঞ তৎপুরুষ

ব্যাসবাক্যের পূর্বে না বাচক শব্দ (ন / না /নয় / নাই / নেই) বসে যে তৎপুরুষ সমাস গঠিত হয় তাকে নঞ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ন আচার = অনাচার, ন কাতর = অকাতর, নয় ধোয়া = আধোয়া, নয় আবাদী = অনাবাদী ইত্যাদি।

নয়-কাতর = অকাতর

নয় কাঁড়া = আকাঁড়া

নয় ধর্ম = অধর্ম

নয় উচিত = অনুচিত

নয় পর্যাপ্ত = অপর্যাপ্ত

নয় এক = অনেক

নয় হাজির = গরহাজির

ন অতিশীতোষ্ণ = নাতিশীতোষ্ণ

ন-আচার = অনাচার

ন গাছ = আগাছা

ন উক্ত = অনুক্ত

ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস

ন অতি দীর্ঘ = নাতিদীর্ঘ

ন অতি খর্ব = নাতিখর্ব

ন মঞ্জুর = নামঞ্জুর

ন বালক = নাবালক

ন মানুষ = অমানুষ

ন ভাব = অভাব

ন সঙ্গত = অসঙ্গত

ন অন্য = অনন্য

ন চেনা = অচেনা

নাই মিল = গরমিল

নাই হুঁশ = বেহুঁশ

বে আইনি = বেআইনি

উপপদ তৎপুরুষ

[বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সমাসের যে জায়গাগুলো থেকে বেশি প্রশ্ন আসে, তার মধ্যে উপপদ তৎপুরুষ সমাস অন্যতম।]

মনে রাখতে হবে: বাক্য সংক্ষেপণ (এক কথায় প্রকাশ) ঘটে থাকলে এবং সমস্তপদের শেষে ক্রিয়া (কাজ)-বাচক পদ যুক্ত থাকলেই সেগুলো সাধারণত উপপদ তৎপুরুষ সমাস হয়।

উদাহরণ ও ব্যাখ্যা:বাক্য সংক্ষেপণ (এক কথায় প্রকাশ): জলচর (জলে চরে যা), পঙ্কজ (পঙ্কে জন্মে যা), সত্যবাদী (সত্য বলে যে), ইন্দ্রজিৎ (ইন্দ্রকে জয় করেছে যে)।

সমস্তপদের শেষে ক্রিয়াবাচক পদ:

পকেটমার- এখানে ‘মার’ একটি ক্রিয়াবাচক পদ।

ছেলেধরা- এখানে ‘ধরা’ একটি ক্রিয়াবাচক পদ।

পাতাচাটা- এখানে ‘চাটা’ একটি ক্রিয়াবাচক পদ।

মাছিমারা- এখানে ‘মারা’ একটি ক্রিয়াবাচক পদ।

অলুক তৎপুরুষ

যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্ব পদের দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ হয় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ঘিয়ে ভাজা, গরুর গাড়ি, গায়েপড়া ইত্যাদি।

তৎপুরুষ সমাসের শ্রেণিবিন্যাস চেনার সহজ উপায়

সমাসের নাম

সমাস হওয়ার শর্ত

উদাহরণ

দ্বিতীয়া তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে, ব্যাপিয়া) লোপ পায়

আমকে কুড়ানো→ আমকুড়ানো

তৃতীয়া তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া কর্তৃক) লোপ পায়

মন দিয়ে গড়া→মনগড়া

চতুর্থী তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে চতুর্থী বিভক্তি (নিমিত্ত, দান, ভক্তি, জন্য) লোপ পায়

বসতের নিমিত্তে বাড়ি→বসত বাড়ি

পঞ্চমী তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে) লোপ পায়

বিলাত থেকে ফেরত→বিলাতফেরত

ষষ্ঠী তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর, দের) লোপ পায়

চায়ের বাগান→চাবাগান

সপ্তমী তৎপুরুষ

পূর্বপদ হতে সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পায়

গাছে পাকা→গাছপাকা

অলুক তৎপুরুষ

বিভক্তি লোপ পায় না

সোনার বাংলা

উপপাদ তৎপুরুষ

পরপদের ক্রিয়ামূলের সাথে কৃৎ প্রত্যয় (যা, যে) থাকে

পকেট মারে যে→পকেটমার

নঞ্ তৎপুরুষ

পূর্বপদে না বাচক অব্যয় (অ, আ, না, নি, বে) থাকে

ন কাতর→অকাতর

 

বহুব্রীহি সমাস

সে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনটির অর্থই প্রধানভাবে না বুঝিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে বুঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমনঃ বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার = বহুব্রীহি। এখানে ‘বহু’ কিংবা ‘ব্রীহি’ কোনোটিরই অর্থের প্রাধান্য নেই, যার বহু ধান আছে এমন লোককে বোঝাচ্ছে। একইভাবে, শূল পাণিতে (হাতে) যার = শূলপাণি। এখানে ‘শূল’ পূর্বপদ এবং ‘পাণি’ উত্তর পদ। কিন্তু ‘শূলপাণি’, শব্দ বোঝাচ্ছে মহাদেবকে, যার হাতে শূল আছে। এরকম আরেকটি শব্দ ‘নীলকণ্ঠ’ অর্থাৎ নীল কণ্ঠে যার। এই শব্দে নীল বা কণ্ঠ কোনোটাই প্রধান বক্তব্য নয়; এখানে বুঝতে হবে শিবকে, কেননা বিষপানে শিবের কণ্ঠই নীল হয়ে গিয়েছিল। এই সমাসের ব্যাসবাক্যে যে, যিনি, যার, যাতে ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ থাকে। যেমন : লোচন যার = আয়তলোচনা (স্ত্রী), মহান আত্মা যার = মহাত্মা , স্বচ্ছ সলিল যার = স্বচ্ছসলিলা, নীল বসন যার = নীলবসনা, স্থির প্রতিজ্ঞা যার = স্থিরপ্রতিজ্ঞ, ধীর বুদ্ধি যার = ধীরবুদ্ধি।

  • সহ’ কিংবা ‘সহিত’  শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুবীহি সমাস হলে ‘সহ’ ও ‘সহিত’ এর স্থলে ‘’ হয়। যেমনঃ বান্ধবসহ বর্তমান = সবান্ধব, সহ উদর (অর্থাৎ মাতৃগর্ত) যার = সহোদর
  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদে মাতৃ, পুত্র, স্ত্রী ইত্যাদি শব্দ থাকলে এ শব্দগুলোর সঙ্গে ‘’ যুক্ত হয়। যেমন: নদী মাতা (মাত) যার = নদীমাতৃক, বি (বিগত) হয়েছে পত্নী যার = বিপত্নীক।
  • বহুব্রীহি সমাসে সমস্তপদে ‘অক্ষি শব্দের স্থলে অক্ষ’ এবং নাভি শব্দ স্থলে নাভ হয়। যেমন- কমলের ন্যায় অক্ষি যার = কমলাক্ষ, পদ্মা নাভিতে যার = পদ্মনাভ।
  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘জায়া’ শব্দ স্থানে ‘জানি হয় এবং পূর্বপদের কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন- যুবতী জায়া যার = যুবজানি (‘যুবতী’ স্থলে ‘যুব’ এবং ‘জায়া’ থলে ‘জানি’ হয়েছে)।
  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদের চুড়া শব্দ সমস্তপদে ‘চূড়’ এবং ‘কর্ম’ শব্দ সমস্তপদে ‘কর্মা’ হয়। যেমন- চন্দ্র চুড়া যার = চন্দ্রচূড়। বিচিত্র কর্ম যার = বিচিত্রকর্মা।
  • বহুব্রীহি সমাসে ‘সমান' শব্দের থানে ‘’ এবং ‘সহ’ হয়। যেমন- সমান কর্মী যে = সহকর্মী, সমান বর্ণ যার = সবর্ণ, সমান উদর যার = সহোদর ইত্যাদি।
  • বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘গন্ধ’ শব্দ স্থানে ‘গন্ধি’ বা ‘গন্ধা’ হয়। যথা— সুগন্ধ যার = সুগন্ধি, পদ্মের ন্যায় গন্ধ যার = পদ্মগন্ধা, মৎস্যের ন্যায় গন্ধ যার = মৎস্যগন্ধা।

বহুব্রীহি সমাস চেনার কৌশল

১. ব্যাসবাক্যের মধ্যে 'যার' /'যাঁর' পদটি থাকলে সেটি বহুব্রীহি সমাস হবে। যেমন: নীল অম্বর যাঁর - নীলাম্বর, বীণা পাণিতে যাঁর - বীণাপাণি।

২. সমস্তপদের শেষে '' প্রত্যয় থাকলে বহুব্রীহি সমাস হবে। যেমন: সস্ত্রীক, সকর্মক, অকর্মক, অপুত্রক প্রভৃতি‌। এখানে খেয়াল রাখতে হবে শেষের ক যেন প্রত্যয় হিসেবে থাকে। ক যদি মূল শব্দের মধ্যেই থাকে, তাহলে বহুব্রীহি সমাস নাও হতে পারে। ক-এর পরিবর্তে 'অক' প্রত্যয় থাকলেও চলবে না।

৩. ব্যাসবাক্যের শুরুতে 'নেই'/'নাই' শব্দ এবং শেষে 'যার'/'যাঁর'/'যেখানে'/'যাতে' থাকলে নঞ্ বহুব্রীহি সমাস হবে।

৪. এক‌ই ক্রিয়ার বিনিময় বোঝাতে শব্দদ্বৈত থাকলে বহুব্রীহি সমাস হবে। যেমন: চুলোচুলি, লাঠালাঠি প্রভৃতি।

৫. শব্দের গোড়ায় সহিত অর্থে স থাকলে সহার্থক বহুব্রীহি সমাস হবে। যেমন: সপরিবার, সপুত্র, সস্ত্রীক প্রভৃতি।

বহুব্রীহি সমাসের প্রকারভেদ

বহুব্রীহি সমাস আট প্রকার। যথাঃ সমানাধিকরণ বহুব্রীহি, ব্যধিকরণ বহুব্রীহি, ব্যতিহার বহুব্রীহি, মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি,নঞর্থক বহুব্রীহি, অলুক বহুব্রীহি, প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি এবং সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি।

(১) সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাসঃ যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদ বিশেষণপরপদ বিশেষ্য, তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমনঃ পীত অম্বর যার = পীতাম্বর, পোড়া মুখ যার = মুখপোড়া, দশ ভুজ যায় = দশভুজা,কালো পাড় যার = কালোপেড়ে (শাড়ি), হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী, খোশ মেজাজ যার= খোশমেজাজ ইত্যাদি।

(২) ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাসঃ যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ ও পরপদের উভয় স্থানে বিশেষ্য পদ (নাম পদ) হয় সেটিই ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস। যেমনঃ বীণা পাণিতে যার = বীণাপাণি, রত্ন গর্ভে যার = রত্নগর্ভা, নীল কণ্ঠে যার = নীলকণ্ঠ, আশীতে (দাঁতে) বিষ যার = আশীবিষ (অর্থাৎ সাপ), শশ অঙ্কে যার = শশাঙ্ক (চাঁদ), শূল পাণিতে যার = শূলপাণি, কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব ইত্যাদি।

নোটঃ পরপদ কৃদন্ত বিশেষণ হলেও ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন- দুই কান কাটা যার = দুকানকাটা।

(৩) ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাসঃ পরপর ক্রিয়া বোঝাতে যে বহুব্রীহি সমাসে একই পদ দ্বিত্ব হয়ে পূর্বপদ ও উত্তরপদে বসে, তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে। এ সমাসে পূর্বপদে’ এবং উত্তরপদে যুক্ত হয়। যেমন: হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি, হেসে হেসে যে আলাপ = হাসাহাসি, লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ = লাঠালাঠি, কানে কানে যে কথা = কানাকানি।

(৪) মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাসঃ যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের ব্যাখ্যামূলক মধ্যবর্তী পদ লুপ্ত হয় তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে। এর অন্য নাম উপমাত্মক বহুব্রীহি। যেমন- হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি, মৃগের নয়নের ন্যায় নয়ন যার = মৃগনয়না, স্বর্ণের আভার মত আভা যার = স্বর্ণাভ, চন্দ্রের ন্যায় বদন যার = চন্দ্রবদনা, মীনের ন্যায় অক্ষি যার = মীনাক্ষী, পদ্মের ন্যায় গন্ধ যার = পদ্মগন্ধা, সোনার মত উজ্জ্বল মুখ যার = সোনামুখী, এক দিকে চোখ যার = একচোখা।

(৫) নঞ বা নঞর্থক বহুব্রীহি সমাসঃ যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদ নঞর্থক বা নিষেধাৰ্থক অব্যয় তাকে নঞর্থক বহুব্রীহি সমাস বলে। নঞ বহুব্রীহি সমাসে সাধিত পদটি বিশেষণ হয়। যেমন- নি (নাই) ভুল যার = নির্ভুল, নাই ঈমান যার = বেঈমান, নাই অহঙ্কার যার = নিরহঙ্কার, নাই লজ্জা যার = নির্লজ্জ, ন (নাই) জ্ঞান যার = অজ্ঞান, না (নাই) চারা (উপায়) যার = নাচার, না (নয়) জানা যা = নাজানা, অজানা, অ (নেই) বুঝ যার = অবুঝ, বে (নেই) হায়া যার = বেহায়া, ন (নাই) জ্ঞান যার = অজ্ঞান, বে (নাই) হেড যার = বেহেড, না (নয়) জানা যা = নাজানা ইত্যাদি।

(৬) অলুক বহুব্রীহি সমাসঃ যে বহুব্রীহি সমাসে বিভক্তির লোপ হয় না, তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। অথবা, যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তন হয় না, তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। যেমন— হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = হাতেখড়ি, গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়ে-হলুদ,মাথায় পাগড়ি যার = মাথায়পাগড়ি ইত্যাদি।

(৭) প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহিঃ যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে বলা হয় প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস। যেমন: এক দিকে চোখ (দৃষ্টি) যার = একচোখা (চোখ + আ),ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখো (মুখ + ও), নিঃ (নেই) খরচ যার = নি-খরচে (খরচ + এ)।

(৮) সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাসঃ পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলে। এ সমাসে সমস্তপদে , বা যুক্ত হয়। যেমন : দশ গজ পরিমাণ যার = দশগজি, চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা, তিন পায়া যার = তেপায়া, দুই নল যার = দোনলা। 

বহুব্রীহি সমাসের শ্রেণিবিন্যাস  চেনার সহজ উপায়

সমাসের নাম

সমাস হওয়ার শর্ত

উদাহরণ

ব্যতিহার

দ্বিরুক্ত থাকে

চুলাচুলি

সংখ্যাবাচক

পূর্বপদে সংখ্যা থাকে, তবে মনে রাখতে হবে কোনো পদেরই অর্থের প্রাধান্য থাকে না

চৌচালা

অলুক

পূর্বপদ বা পরপদ কোনো পরিবর্তন হয় না

গায়ে হলুদ

নঞ্

পূর্বপদে না বাচক অব্যয় (অ, আ, না, নি, বে) বসে

নির্ভুল

প্রত্যায়ান্ত

পরপদে এ, আ,ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত থাকে

একচোখা (চোখ+আ), নি-খরচে (খরচ+এ)

ব্যাধিকরণ

পূর্বপদ ও পরপদের উভয় স্থানে বিশেষ্য পদ (নাম পদ) হয়

আশীতে (দাঁতে) বিষ যার→আশীবিষ

সমানাধিকরণ

পূর্বপদে বিশেষণ (গুণবাচক পদ) ও পরপদে বিশেষ্য পদ (নাম পদ) হয়

উচ্চশির

মধ্যপদলোপী

ব্যাসবাক্যে মধ্যপদ লোপ পেয়ে সমাসবদ্ধপদ তৈরি হয়

বিড়ালের মতো চোখ যে নারী→বিড়ালচোখী

নিপাতন সিদ্ধ

কোনো নিয়মে তৈরি হয় না

নরাকারের পশু যে→নরপশু

 

অলুক দ্বন্দ্ব, অলুক তৎপুরুষ, অলুক বহুব্রীহি

সমাসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে অলুক সমাস। কেননা মোট তিনটি সমাসের মধ্যে ‘অলুক’ রয়েছে। দুটি কথায় এ সমস্যার সমাধান করে নেওয়া যাক। আমরা জানি অলুক অর্থ: বিভক্তি লোপ পায় না এমন। অর্থাৎ যে-সকল সমাসের সমস্তপদে বিভক্তি লোপ পায় না,বরং যুক্ত থাকে,সেগুলোকে অলুক সমাস বলে।

মনে রাখতে হবে:

১. সকল পদেই বিভক্তি যুক্ত থাকলে- অলুক দ্বন্দ্ব।

২. কেবল পূর্বপদে বিভক্তি যুক্ত থাকলে:পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেলে অলুক তৎপুরুষ,কোনো পদের অর্থই প্রাধান্য না পেলে (নতুন অর্থ দিলে) অলুক বহুব্রীহি।

উদাহরণ ব্যাখ্যা:

ক. দেশে-বিদেশে: অলুক দ্বন্দ্ব।

[ব্যাখ্যা: ‘দেশে’ ও ‘বিদেশে’ দুটো পদের সঙ্গেই বিভক্তি (‘এ’ বিভক্তি) যুক্ত আছে।]

খ. গোরুর গাড়ি: অলুক তৎপুরুষ।

[ব্যাখ্যা: কেবল পূর্বপদে (গোরুর) বিভক্তি (‘র’ বিভক্তি) যুক্ত আছে। এখানে, ‘গোরুর গাড়ি’ বললে আমরা কোনো গোরুকে বুঝি না; বরং গোরুর গাড়ি হচ্ছে একটি গাড়ি।সুতরাং এখানে পরপদের (গাড়ি) অর্থ প্রাধান্য পেয়েছে।]

গ. মুখে-ভাত: অলুক বহুব্রীহি।

[ব্যাখ্যা: কেবল পূর্বপদে (মুখে) বিভক্তি (‘এ’ বিভক্তি) যুক্ত আছে। এখানে, ‘মুখে-ভাত’ বলতে ‘মুখ’কেও বোঝায় না, আবার ‘ভাত’কেও বোঝায় না; বরং একটি অনুষ্ঠানকে বোঝায়। সুতরাং এখানে কোনো পদের অর্থই প্রাধান্য পাচ্ছে না; নতুন একটি অর্থ (অনুষ্ঠান) দিচ্ছে।]

ব্যাসবাক্য গঠন:
১. অলুক দ্বন্দ্ব: অলুক দ্বন্দ্ব সমাসের ব্যাসবাক্য তৈরি করতে পদগুলোর মাঝে কেবল ও/এবং/আর বসিয়ে দিলেই হয়ে যায়।

যেমন: দেশে-বিদেশে = দেশে ও বিদেশে।

২. অলুক তৎপুরুষ: এ সমাসের ব্যাসবাক্য ও সমস্তপদ একই রকম হয়ে থাকে। যেমন: গোরুর গাড়ি = গোরুর গাড়ি।

৩. অলুক বহুব্রীহি: ব্যাসবাক্যের শেষে ‘যার বসিয়ে দিলেই অলুক বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্য হয়ে যায়। যেমন: মাথায়পাগড়ি

= মাথায় পাগড়ি যার।

তবে কোনো অলুক বহুব্রীহি সমাস দ্বারা যদি অনুষ্ঠান বোঝায়, তাহলে শেষে ‘দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে’ কথাটি বসিয়ে দিতে হবে।

যেমন: মুখে-ভাত = মুখে ভাত দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে।

দ্বিগু সমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদসমূহে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক বিশেষণ হয় এবং উত্তর পদ বিশেষ্য থাকে তাকে দ্বিগু সমাস বলে। অথবা সমাহার বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদে যে সমাস হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাস সর্বদা সমাহার বা সমষ্টি বোঝায়।

পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ থাকলে, ওই শব্দ দিয়ে যদি সমাহার বা সমষ্টি না বোঝায় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য না পায়,তবে তা দ্বিগু সমাস নয়। অর্থের দিক থেকে দ্বিগু সমাসে পরপদের অর্থই প্রধান। 

  • সমাসবদ্ধ শব্দটির বিশেষণ হলে বা পূর্বপদ ও পরপদের অর্থ প্রাধান্য না পেয়ে তৃতীয় কোনো অর্থ প্রাধান্য পেলে তা হবে বহুব্রীহি সমাস।  যেমনঃ তে (তিন)  পায়া যায় = তেপায়া; দোনলা, ত্রিনয়ন
  • উভয় পদের অর্থ প্রদান হলে তা হবে দ্বন্দ্ব সমাস।  যেমনঃ সাতপাঁচ। সমষ্টি বা সমাহার না বুঝিয়ে পরপদের অর্থ প্রধান হলেন কর্মধারায় সমাস হয়। যেমনঃ চতুর্দোলা।

দ্বিগু সমাস নির্ণয়ের সহজ উপায়

  • দ্বিগু সমাসে সাধারণত প্রথম পদটি সংখ্যাবাচক হয় এবং পর পদটি হবে বিশেষ্য।
  • সমস্তপদটি দ্বারা সমষ্টি বা সমাহার বোঝায় এবং সমস্তপদটি বিশেষ্য পদ হয়। যেমনঃ তে (তিন) মাথার সমাহার = তেমাথা,নব (নয়) রত্নের সমাহার = নবরত্ন ইত্যাদি। 
  • দ্বিগু সমাস কখনো অ-কারান্ত হলে আ-কারান্ত হলে বা ই-কারান্ত হয়। যেমনঃ শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী। এ রুপ - ত্রিপদী,পঞ্চনদ (নদী নয়)।

ব্যাসবাক্যসহ দ্বিগু সমাসের উদাহারণ

চতুষ্পদী = চার পদের সমাহার

চৌমাথা = চৌ (চার) মাথার সমাহার

তেপান্তর = তিন প্রান্তরের সমাহার

তেমাথা = তে (তিন) মাথার সমাহার

তেরোনদী = তেরো নদীর সমাহার

ত্রিফলা = ত্রি (তিন) ফলের সমাহার

ত্রিলোক = তিন লোকের সমাহার

পঞ্চনদ = পঞ্চ নদের সমাহার

পসুরি = পাঁচ সেরের সমাহার

শতাব্দি = শত অব্দের সমাহার

সপ্তডিঙা = সপ্ত ডিঙার সমাহার

সপ্তাহ = শত অহের সমাহার

সপ্তর্ষী = স্পত ঋষির সমাহার

সেতার = তিন তারের সমাহার 

প্রাদি সমাস

প্র, প্রতি, অনু, পরি, ইত্যাদি অব্যয় বা উপসর্গের সঙ্গে কৃৎ প্রত্যয় সাধিত বিশেষ্য বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যর সমাস হলে তাকে প্রাদি সমাস বলে। যেমন, প্র (প্রকৃষ্ট) যে বচন = প্রবচন। এখানে বচন সমস্যমান পদটি একটি বিশেষ্য, যার মূল (ধাতু)বচ ধাতু বা কৃৎ প্রত্যয়। ‘প্র’ অব্যয়ের সঙ্গে কৃৎ প্রত্যয় সাধিত বিশেষ্য ‘বচন’র সমাস হয়ে সমস্ত পদ ‘প্রবচন’ শব্দটি তৈরি হয়েছে। সুতরাং, এটি প্রাদি সমাস। এরূপ - পরি (চতুর্দিকে) যে ভ্রমণ = পরিভ্রমণ, অনুতে (পশ্চাতে) যে তাপ = অনুতাপ, প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) ভাত (আলোকিত) = প্রভাত, প্র (প্রকৃষ্ট রূপে) গতি = প্রগতি ইত্যাদি।

অব্যয়ীভাব সমাস

যে সমাসের পূর্বপদে একটি অব্যয় এবং পরপদে একটি বিশেষ্য থাকে এবং অর্থের দিক থেকে পূর্বপদ অর্থাৎ অব্যয়ের অর্থই প্রাধান্য পায়, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। অর্থাৎ, পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়ের অর্থই প্রাধান্য থাকে তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। এ সমাসে কেবল অব্যয়ের অর্থযোগে ব্যাসবাক্যটি রচিত হয়। যেমন – মরণ পর্যন্ত = আমরণ, দিন দিন = প্রতিদিন ইত্যাদি।

বিভিন্ন অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস

সামীপ্য (উপ)

কণ্ঠের সমীপে= উপকণ্ঠ, কূলের সমীপে= উপকূল, অক্ষির সমীপে = প্রত্যক্ষ, বনের সমীপে = উপবন

বিপসা (অনু, প্রতি)

দিন দিন= প্রতিদিন, ক্ষণে ক্ষণে= অনুক্ষণে, ক্ষণ ক্ষণ= অনুক্ষণ

অভাব অর্থে (নিঃ= নির)

আমিষের অভাব= নিরামিষ, ভাবনার অভাব= নির্ভাবনা, জলের অভাব= নির্জল, উৎসাহের অভাব= নিরুৎসাহ, ভাতের অভাব = হাভাত

পর্যন্ত (আ)

সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত= আসমুদ্রহিমাচল, পা থেকে মাথা পর্যন্ত= আপাদমস্তক, মরণ পর্যন্ত = আমরণ

সাদৃশ্য (উপ)

শহরের সদৃশ= উপশহর, গ্রহের তুল্য= উপগ্রহ, বনের সদৃশ= উপবন

অনতিক্রম্যতা অর্থে (যথা)

রীতিকে অতিক্রম না করে= যথারীতি, সাধ্যকে অতিক্রম না করে= যথাসাধ্য। এরূপ- যথাবিধি, যথাযোগ্য,যথাশাস্ত্র

অতিক্রান্ত (উৎ)

বেলাকে অতিক্রান্ত= উদ্বেল, শৃঙখলাকে অতিক্রান্ত= উচ্ছৃঙখল

বিরোধ (প্রতি)

বিরুদ্ধ বাদ= প্রতিবাদ, বিরুদ্ধ কূল= প্রতিকূল, বিরুদ্ধ রোধ = প্রতিরোধ

পশ্চাৎ (অনু)

পশ্চাৎ গমন= অনুগমন, পশ্চাৎ ধাবন= অনুধাবন

ঈষৎ (আ)

ঈষৎ নত= আনত, ঈষৎ রক্তিম= আরক্তিম, ঈষৎ লালচে = লালচে

ক্ষুদ্র অর্থে (উপ)

গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ, নদীর তুল্য = উপনদী, জেলার ক্ষুদ্র = উপজেলা

পূর্ণ বা সমগ্র অর্থে (পরি বা সম)

পরিপূর্ণ, সম্পূর্ণ

দূরবর্তী অর্থে (প্র, পর)

অক্ষির অগোচরে= পরোক্ষ। এরূপ- প্রপিতামহ

প্রতিনিধি অর্থে (প্রতি)

মূর্তির প্রতিনিধি = প্রতিমূর্তি, এরূপ- প্রতিচ্ছায়া, প্রতিচ্ছবি, প্রতিবিম্ব

প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থে (প্রতি)

প্রতিপক্ষ, প্রত্যুত্তর ইত্যাদি।

সম্পর্ক অর্থে (সম, বিষয়)

সম্বল = বলের সম্পর্কে, সম্মান= মানের সম্পর্কে, সমক্ষে= অক্ষের সম্পর্কে

যোগ্যতা অর্থে (অনু)

অনুসন্তান= যোগ্য সন্তান, অনুকূল= কুলের যোগ্য, অনুদান= দানের যোগ্য

কারক বিভক্তি অর্থে

ভরদুপুর, দিনভর, ভরপেট ইত্যাদি।

 

নিত্য সমাস

যে সমাসের ব্যাসবাক্য হয় না, কিংবা ব্যাসবাক্য করতে গেলে অন্য পদের সাহায্য নিতে হয়, তাকে নিত্য সমাস বলে। যেমন: অন্য দেশ = দেশান্তর; ঈষৎ লাল = লালচে,অন্যকাল = কালান্তর ইত্যাদি। নিত্য সমাসের কয়েকটি উদাহরণ

কেবল দর্শন = দর্শনমাত্র

সমস্তগ্রাম = গ্রামশুদ্ধ

অন্যদেশ = দেশান্তর

কেবল মাত্র = তন্মাত্র

একটি কাপড় = কাপড়খানা

কেবল জল = জলমাত্র

অন্যস্থান = স্থানান্তর

অন্যগ্রাম = গ্রামান্তর

অনেক মানুষ = মানুষগুলো

অন্যগৃহ = গৃহান্তর

নঞ্ তৎপুরুষ,নঞ্ বহুব্রীহি

মনে রাখতে হবে:

১. পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেলে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস হবে।

২. কোনো পদের অর্থই প্রাধান্য না পেলে (অন্য অর্থ দিলে) নঞ্ বহুব্রীহি সমাস হবে।

উদাহরণ ব্যাখ্যা:

ক. অবিশ্বাস: নঞ্ তৎপুরুষ।

[ব্যাখ্যা: ‘অবিশ্বাস’ অর্থ কী? এর অর্থ- বিশ্বাস নেই। কী নেই? বিশ্বাস। তাহলে দেখা যাচ্ছে- এখানে পরপদ ‘বিশ্বাস’-এর অর্থ প্রাধান্য পাচ্ছে।]

খ. অজ্ঞান: নঞ্ বহুব্রীহি।

[ব্যাখ্যা: ‘অজ্ঞান’ অর্থ কী? ‘অজ্ঞান’ অর্থ- যার জ্ঞান নেই। অর্থাৎ ‘অজ্ঞান’ দ্বারা জ্ঞানকে বোঝাচ্ছে না, সেই ব্যক্তিকে বোঝাচ্ছে যার জ্ঞান নেই। সুতরাং এখানে অন্য একটি অর্থ (জ্ঞানহীন ব্যক্তি) দিচ্ছে।]

ব্যাসবাক্য গঠন:

১. নঞ্ তৎপুরুষ: নঞ্ তৎপুরুষ সমাসের ব্যাসবাক্য তৈরি করতে সমস্তপদের না-বাচক শব্দাংশের স্থানে ন/না/নি/নাই/নেই/নয় বসিয়ে দিলেই হয়ে যায়। যেমন: অবিশ্বাস = ন বিশ্বাস। এখানে, না-বাচক শব্দাংশ ‘অ’-এর স্থানে ‘ন’ বসানো হয়েছে।

. নঞ্ বহুব্রীহি: ব্যাসবাক্যের শুরুতে ন/না/নি/নাই/নেই/নয় এবং শেষে যা/যার/যাতে বসিয়ে দিলেই নঞ্ বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্য হয়ে যায়। যেমন: অজ্ঞান = নেই জ্ঞান যার। এখানে, শুরুতে ‘নেই’ এবং শেষে ‘যার’ বসানো হয়েছে।

 


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

4 out of 4 Marked as Helpfull !