কাল ও কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ Last updated: 6 months ago

ক্রিয়ার কাল

ক্রিয়া যে সময় সংঘটিত হয় বা সম্পন্ন হয় তাকে ক্রিয়ার কাল বলে। কাল কথার অর্থ হল সময়। ক্রিয়ার কাল মূলত তিনটি- বর্তমান, অতীত এবং ভবিষ্যৎ। এই তিনটি কালের আবার চারটি করে উপভাগ রয়েছে।

বর্তমান কাল

কোনো ক্রিয়া বর্তমানে সংঘটিত হচ্ছে এরূপ বোঝাতে যে কাল হয় তাকে বর্তমান কাল বলা হয়। বর্তমান কাল হল বর্তমান সময়। যা ঘটে, যা ঘটেছে এবং যা একটু আগে ঘটে গেছে কিন্তু এখনো রেশ রয়ে গেছে তাই বর্তমান কাল।বর্তমান কালের চারটি উপভাগ হল-

১) সাধারণ বর্তমান- কোনো ক্রিয়া নিত্য সংঘটিত হয় এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয় তাকে সাধারণ বর্তমান বলে। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখে।

খ) গরুটি ঘাস খায়।

২) ঘটমান বর্তমান- কোন ক্রিয়া বর্তমানে সংঘটিত হচ্ছে এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কালো হয় তাকে ঘটমান বর্তমান বলা হয়। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখছে।

খ) গরুটি ঘাস খাচ্ছে।

৩) পুরাঘটিত বর্তমান- কোনো ক্রিয়া পূর্বেই সম্পন্ন হয়ে গেছে কিন্তু তার ফল এখনো বর্তমান, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয় তাকে পুরাঘটিত বর্তমান বলে। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখেছে।

খ) গরুটি ঘাস খেয়েছে।

৪) বর্তমান অনুজ্ঞা- বর্তমান কালে কোনো আদেশ, অনুরোধ বা উপদেশ বোঝাতে ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয় তাকে বর্তমান অনুজ্ঞা বলা হয়। যেমন-

ক) টিভি দেখ (দ্যাখ)।

খ) টিভি দেখো (দ্যাখো)।

গ) টিভি দেখুন।

বর্তমান অনুজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা প্রকৃতপক্ষে কোনো কাল নয়, ক্রিয়ার ভাব বিশেষ। কিন্তু প্রচলিত ব্যাকরণে এই দুই অনুজ্ঞা দুটি কাল হিসেবে বিবেচিত হয়।

অতীত কাল

কোনো ক্রিয়া অতীতকালে সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং বর্তমানে তার কিছু অবশিষ্ট নেই, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল তাকে বলা হয় অতীতকাল। অতীতকালের রূপ এই চারটি-

১) সাধারণ অতীত- কোনো ক্রিয়া অতীতকালে সম্পন্ন হয়ে গেছে, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয় সেটিই হল সাধারণ অতীত। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখল।

খ) গরুটি ঘাস খেল।

২) ঘটমান অতীত- অতীতের কোনো একটি বিশেষ কালপর্বে কোনো ক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছিল, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার কাল হয় তাকে ঘটমান অতীত বলা হয়। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখছিল।

খ) গরুটি ঘাস খাচ্ছিল।

৩) পুরাঘটিত অতীত- অতীত কালে যদি দুটি ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তবে তাদের মধ্যে যেটি প্রথমে হয় সেই ক্রিয়ার কালটি পুরাঘটিত অতীত হয়। তবে, অনেক সময় সাধারণ অতীত বোঝাতেও পুরাঘটিত অতীতের রূপটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কারণ,এই

দুটি কালের মধ্যে অর্থগত কোন পার্থক্য নেই। যেমন-

ক) পড়তে বসার আগে নেহা টিভি দেখেছিল।

খ) গোয়ালে ঢোকার আগে গরুটি ঘাস খেয়েছিল

[দেখল, দেখেছিল এবং খেলো, খেয়েছিল- এই ক্রিয়াগুলির মধ্যে অর্থগত কোন পার্থক্য নেই। ইংরেজিতে Past Perfect Tense-এর অনুকরণে বাংলায় পুরাঘটিত অতীত কালের আমদানি হয়েছে।]

৪) নিত্যবৃত্ত অতীত- অতীতকালে কোনো কাজ নিয়মিত ঘটত, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়াপদের যে কাল হয় তাকে নিত্যবৃত্ত অতীত বলা হয়। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখত।

খ) গরুটি ঘাস খেত।

ভবিষ্যৎ কাল

যে ক্রিয়া এখনো সংঘটিত হয়নি, ভবিষ্যতে হবে, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়াপদের যে কাল হয়, তাকে ভবিষ্যৎ কাল বলা হয়। কিন্তু কেউ ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা নয়, এইজন্য অনেক পণ্ডিত ভবিষ্যৎ কালের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চান না। যাইহোক, ভবিষ্যৎ কাল এই চার রকমের হয়-

১) সাধারণ ভবিষ্যৎ- ভবিষ্যতে কোন ক্রিয়া সংঘটিত হবে, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয় তাকে সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল বলা হয়। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখেবে।

খ) গরুটি ঘাস খাবে।

২) ঘটমান ভবিষ্যৎ- ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে কোনো ক্রিয়া সংঘটিত হবে, এরূপ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয় তাকে

ঘটমান ভবিষ্যৎ বলা হয়। যেমন-

ক) নেহা টিভি দেখেতে থাকবে।

খ) গরুটি ঘাস খেতে থাকবে।

৩) পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ- ভবিষ্যতে কনো একটি কাজ হয়ে থাকবে, এরূপ সংশয় বোঝাতে পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ কাল হয়। 

ক) নেহা টিভি দেখে থাকবে।

খ) গরুটি ঘাস খেয়ে থাকবে।

৪) ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞা- ভবিষ্যৎ কালের কোনো আদেশ, অনুরোধ বা উপদেশ বোঝাতে ক্রিয়ার যে কাল হয়, তাকে ভবিষ্যৎ

অনুজ্ঞা বলা হয়। যেমন-

ক) টিভি দেখবি।

খ) টিভি দেখবে।

গ) টিভি দেখবেন।

ক্রিয়ার প্রকার

বাংলা ক্রিয়াপদকে আরো একটি মাপকাঠিতে শ্রেণিকরণ করা হয়। সেটি হল ক্রিয়ার প্রকার। ক্রিয়ার প্রকারের ভিত্তি হল ক্রিয়ার কাল। ক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে নাকি হয়নি, এইরূপ বিচারে ক্রিয়াপদের বিভাজনকে বলা হয় ক্রিয়ার প্রকার (Aspect of Verb)। বাংলা ব্যাকরণে ক্রিয়ার প্রকার পাঁচটি। প্রকারের ভিত্তি হল কাল কিন্তু প্রকার নির্ণয় করার সময় কাল উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। নীচে প্রথম পুরুষে ‘পড়’ ধাতু সহযোগে পাঁচটি প্রকারে ক্রিয়ার কেমন রূপ হবে তা তুলে ধরা হল। 

১) সাধারণ– পড়ে, পড়ল, পড়বে। 

২) ঘটমান– পড়ছে, পড়ছিল, পড়তে থাকবে। 

৩) পুরাঘটিত-পড়েছে, পড়েছিল, পড়ে থাকবে।

৪) নিত্যবৃত্ত– পড়ত।

৫) অনুজ্ঞা– পড়, পড়বে। 

ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত কালবাচক বিভক্তি দেখে প্রকার নির্নয় করা হয়। সে পড়ছে, আমি খাচ্ছি, তুমি টিভি দেখছিলে, তিনি ঘুমোচ্ছিলেন- এই সব ক্ষেত্রেই ক্রিয়ার প্রকার হবে ঘটমান।

বিভিন্ন কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ

সাধারণ বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. অনুমতি প্রার্থনায়: এখন তবে আসি।

২. প্রাচীন লেখকের উদ্ধৃতির উল্লেখে: চণ্ডীদাস বলেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”

৩. বর্ণনীয় বিষয় প্রত্যক্ষীভূত করতে: আমি দেখেছি, বাচ্চাটি রোজ রাতে কাঁদে।

৪. ‘নেই’ ‘নাই’ বা ‘নি’ – শব্দযোগে অতীতকালের ক্রিয়ায় তিনি গতকাল হাটে যাননি।

নিত্যবৃত্ত বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. অনিশ্চয়তা প্রকাশে: কে জানে দেশে আবার সুদিন আসবে কিনা

২. স্থায়ী সত্য প্রকাশে: পাঁচ আর চারে নয় হয়।

৩. ঐতিহাসিক বর্তমানে বাবরের পর হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে বসেন

৪. কাব্যের ভণিতায়: মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস ভনে শুনে পুণ্যবান।

৫. যদি, যখন, যেন – প্রভৃতি শব্দের প্রয়োগে অতীত ও ভবিষ্যৎ কাল জ্ঞাপনের জন্য সাধারণ বর্তমান কালের ব্যবহার যেমন:

  • সকলেই যেন সভায় উপস্থিত থাকে।
  • বিপদ যখন আসে, তখন এমনি করেই আসে।
  • বৃষ্টি যদি আসে, আমরা বাড়ি চলে যাবো।

ঘটমান বর্তমান কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অর্থে: চিন্তা করোনা, আমি কালই আসছি।

২. বক্তার প্রত্যক্ষ উক্তিতে ঘটমান বর্তমান কাল ব্যবহৃত হয়। যথা: নেতা বললেন, “শত্রুর অত্যাচারে দেশ আজ বিপন্ন।” সাধারণ অতীত কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. পুরাঘটিত বর্তমানের স্থলে: এক্ষুণি জানিলাম কুসুমে কীট আছে।

২. বিশেষ ইচ্ছা প্রকাশে বর্তমান কালের পরিবর্তে: তোমার যা খুশি কর, আমি বিদায় হলাম।

নিত্যবৃত্ত অতীত কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১.অসম্ভব কল্পনায়: সাতাশ যদি হতো একশ সাতাশ।

২.সম্ভাবনা প্রকাশে: তুমি যদি যেতে তবে ভালোই হতো।

৩.কামনা প্রকাশে: আজ যদি কবির আসত, কেমন মজা হতো।

পুরাঘটিত অতীত কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. অতীতে সংঘটিত ক্রিয়ার নিশ্চিত বর্ণনায়: পানি পথের ৩য় যুদ্ধে এক লক্ষ মারাঠা সৈনিক মারা গিয়েছিল।

২. অতীতে সংঘটিত ক্রিয়ার পরম্পরা বুঝাতে শেষ ক্রিয়াপদে পুরাঘটিত অতীত কালের প্রয়োগ হয়। যেমন: বৃষ্টি শেষ হবার পূর্বে আমরা বাড়ি পৌঁছেছিলাম।

সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের বিশিষ্ট প্রয়োগ:

১. আক্ষেপ প্রকাশে অতীতের স্থলে ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহার হয়। যেমন: কে জানতো আমার ভাগ্য এমন হবে?

২. অতীত কালের ঘটনা সম্পর্কিত যে ক্রিয়াপদে সন্দেহের ভাব বর্তমান থাকে তার বর্ণনায় সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের ব্যবহার হয়। যেমন: তোমরা হয়তো “বিশ্বনবী” পড়ে থাকবে।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

0 out of 0 Marked as Helpfull !