বাচ্য Last updated: 3 months ago

  • কর্তা, কর্ম অথবা ক্রিয়ার ভাবকে প্রাধান্য দেওয়ার যে শক্তি বাক্যের রয়েছে, তাকেই বাচ্য (Voice) বলা হয়।
  • বাংলা ব্যাকরণের বাচ্য সংক্রান্ত ধারণাটি এসেছে সংস্কৃত ব্যাকরণ থেকে।
  • ‘বাচ্য’ শব্দটির প্রকৃতি প্রত্যয় বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়- √বচ্+ঘ্যণ।
  • বাচ্য ব্যাকরণের বাক্যতত্ত্বে আলোচনা করা হয়।বাচ্য শব্দের অর্থ বক্তব্য। একটি বাক্যকে যতভাবে বা ভঙ্গিতে প্রকাশ করা যায় বা বলা যায় ততগুলো ভাব বা বলার ভঙ্গিকে এক একটি বাচ্য বলে।
  • সংস্কৃত ব্যাকরণে বাচ্য আট প্রকার। যথা- কর্তৃবাচ্য, কর্মবাচ্য, করণবাচ্য, সম্প্রদানবাচ্য, অপাদানবাচ্য, অধিকরণবাচ্য, ভাববাচ্য এবং কর্মকর্তৃবাচ্য।
  • কিন্তু বাংলায় বাচ্য চার প্রকার-

১) কর্তৃবাচ্য [ Active Voice ]

২) কর্মবাচ্য [ Passive Voice]

৩) ভাববাচ্য [Neuter Voice]

৪) কর্মকর্তৃবাচ্য[Quasi-Passive Voice]

প্রাধান্য

১. কর্তৃবাচ্যে কর্তার প্রাধান্য থাকে।

২. কর্মবাচ্যে কর্মের প্রাধান্য থাকে।

৩. ভাববাচ্যে ক্রিয়ার প্রাধান্য থাকে।

অনুসারী

১. কর্তৃবাচ্যে ক্রিয়াপদ কর্তা অনুসারী হবে।

২. কর্মবাচ্যে ক্রিয়াপদ কর্ম অনুসারী হবে।

৩. ভাববাচ্যে ক্রিয়াপদ নাম পুরুষের অনুসারী হবে।

বাক্যে অবশ্যই যা থাকতে হবে

১. কর্তৃবাচ্যে অবশ্যই কর্তা থাকতে হবে। কর্ম থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে।

২. কর্মবাচ্যে অবশ্যই কর্ম থাকতে হবে। কর্তা থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে।

৩. ভাববাচ্যে অবশ্যই কর্ম থাকবে না । কর্তা থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে।

বিভক্তির ব্যবহার

কর্তৃবাচ্য

কর্মবাচ্য

ভাববাচ্য

কর্তা

কর্ম

কর্তা

কর্ম

কর্তা

কর্ম

শূন্য

শূন্য

৩য়া → দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক

শূন্য

৩য়া → দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক

(x) অর্থাৎ ভাববাচ্যে কর্ম থাকে না।

 

২য়া বা ৬ষ্ঠী হতে পারে।

২য়া বা ৬ষ্ঠী হতে পারে ।

 

ছকটি একটু বোঝার চেষ্টা করি:

  • কর্তৃবাচ্যে ১০০% কর্তা থাকতেই হবে এবং কর্তায় শূন্য বিভক্তি হবে। চিত্রটি একবার চেয়ে দেখি, কর্মবাচ্যে এবং ভাববাচ্যে কর্তায় কিন্তু তৃতীয়া বিভক্তি হয়। তাহলে এটা বলা যায়, কর্তা আছে এবং তার সাথে কোন বিভক্তি নেই - ১০০% কর্তৃবাচ্য।
  • এবার কর্মবাচ্য এবং ভাববাচ্যের অংশটি ছকে একবার দেখি । দুটির কর্তায় ৩য়া বিভক্তি আছে । অতএব, কর্তা দিয়ে এই দুটি বাচ্য নির্ণয় সম্ভব নয়। ছকে এই দুটি বাচ্যের কর্মের দিকে লক্ষ্য করি .... কর্মবাচ্যে কর্ম ১০০%  থাকবে কিন্তু ভাববাচ্যে ১০০% কর্ম থাকবে না। অএতব, কতায় বিভক্তি আছে কর্মও আছে তাহলে তা কর্মবাচ্য আবার কর্তার সাথে বিভক্তি আছে কিন্তু কর্ম নেই তা ভাববাচ্য।

 

বাক্য

ব্যাখ্যা

বাচ্য

নিতু বই পড়ে

কর্তা হিসেবে নিতু’ আছে এবং নিতুর সাথে কোন বিভক্তি নেই।

কর্তৃবাচ্য

নিতু কর্তৃক বই পড়া হয়।

কর্তার সাথে বিভক্তি আছে এবং কর্ম হিসেবে বই আছে।

কর্মবাচ্য

নিতু কর্তৃক পড়া হয় ।

কর্তার সাথে বিভক্তি আছে কিন্তু কোন কর্ম নেই।

ভাববাচ্য

নিতুর পড়া হয়।

কর্তার সাথে বিভক্তি আছে কিন্তু কোন কর্ম নেই।

ভাববাচ্য

 

কর্তৃবাচ্যের উদাহরণ

 

বাক্য

ব্যাখ্যা

বাচ্য

আমি বই পড়েছি।

কর্তা হিসেবে 'আমি' এবং কর্তায় বিভক্তি নেই।

কর্তৃবাচ্য

বিদ্বানকে সকলেই আদর করে ।

এখানে কর্তা কিন্তু ‘সকলেই' এবং তার সাথে ‘ই’ কোন বিভক্তি নয়। কর্তা আছে এবং তার সাথে বিভক্তি নেই।

কর্তৃবাচ্য

তবে যাও।

বাক্যে কর্তা হিসেবে তুমি উহ্য আছে। এবং তার সাথে বিভক্তি নেই।

কর্তৃবাচ্য

তাহলে সেখানে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করতাম।

এখানেও বাক্যে কর্তা হিসেবে তুমি উহ্য আছে। এবং তার সাথে বিভক্তি নেই।

কর্তৃবাচ্য

আমরা সেদিন পাহাড় থেকে নেমে আসলাম।

'আমরা' এর সাথে রা কিন্তু বিভক্তি নয়। তবে আমার বা আমাদের' এর সাথে র এবং এর বিভক্তি থাকে তাই আমরা এর সাথে বিভক্তি না থাকায় তা কর্তৃবাচ্য।

কর্তৃবাচ্য

 

কর্মবাচ্যের উদাহরণ

 

বাক্য

ব্যাখ্যা

বাচ্য

আমার বই পড়া হয়েছে ।

'আমার' সাথে 'র' ৬ষ্ঠী বিভক্তি এবং কর্ম হিসেবে বই আছে ।

কর্মবাচ্য

বিদ্বান সকলের দ্বারা আদৃত হন।/ সকলের দ্বারা বিদ্বান আদৃত হন।

কর্তা সকলের সাথে এর ' ৬ষ্ঠী বিভক্তি এবং কর্ম হিসেবে বিদ্বান আছে।

কর্মবাচ্য

বিশ্বজগৎ খোদাতায়ালা কর্তৃক সৃষ্ট হয়েছে বা খোদাতায়ালা কর্তৃক বিশ্বজগৎ সৃষ্ট হয়েছে ।

কর্তা খোদাতায়ালা এর সাথে কর্তৃক তৃতীয়া বিভক্তি আছে এবং কর্ম। হিসেবে বিশ্বজগৎ আছে ।

কর্মবাচ্য

রোগী কর্তৃক পথ্য সেবিত হয়। রোগীর পথ্য সেবিত হয়/ পথ্য রোগী কর্তৃক সেবিত হয়।

কর্তা রোগী এর সাথে কর্তৃক তৃতীয়া বিভক্তি আছে এবং কর্ম হিসেবে পথ্য (ঔষধ) আছে।

কর্মবাচ্য

 

ভাববাচ্যের উদাহরণ

প্রথমেই মনে রাখবে, ভাববাচ্যে কিন্তু ক্রিয়াই প্রাধান্য থকে এবং কর্ম থাকে না। বাক্যে ক্রিয়ার প্রাধান্য কিভাবে হয়, তা নিচের বাক্যগুলো লক্ষ করলেই বোঝতে পারবে।

  • করা হোক, বলা হোক, চলা হোক, যাওয়া হোক। করা যাবে না,বলা যাবে না, চলা যাবে না, যাওয়া যাবে না।
  • করা যাক, বলা যাক, চলা যাক, যাওয়া যাক।
  • করা হবে, বলা হবে, চলা হবে, যাওয়া হবে। করা হবে না, বলা হবে না, চলা হবে না, যাওয়া হবে না।
  • করতে হবে, বলতে হবে, চলতে হবে, যেতে হবে। করতে হবে না, বলতে হবে না, চলতে হবে না, যেতে হবে না। করা হল, বলা হল, চলা হল, যাওয়া হল।
  • করা হল না, বলা হল না, চলা হল না যাওয়া হল না ,করা হয় না, বলা হয় না, চলা হয় না, যাওয়া হয় না।
  • করা হয়, বলা হয়, চলা হয়, যাওয়া হয়। করা হয়েছে, বলা হয়েছে, চলা হয়েছে যাওয়া হয়েছে। করা হয় নি, বলা হয় নি, চলা হয় নি, যাওয়া হয় নি।

উপরের এই ক্রিয়াগুলো বাক্যে থাকলে বাক্যটি চিন্তা ছাড়া ভাববাচ্যের হবে। বাক্যে কর্তা বা কর্ম আছে কি-না তা না ভেবে পরীক্ষায় আসলে ভাববাচ্যে হিসেবে উত্তর করতে হবে। যেমন- আমার যাওয়া হল না । অনুগ্রহপূর্বক সবিস্তার বর্ণনা করা হোক। তার যেন আসা হয়। আমাদের সেদিন পাহাড় থেকে নেমে আসা হল। তোমার বেড়ানো হল। আপনার শ্রবণ করা হোক। আমার খাওয়া হয়েছে । তবে কেন আসা হল? তোমাকেই ঢাকা যেতে হবে । তবে যাওয়া হোক । তাতে বিশেষ ক্ষতি হয় না ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

কর্তাকে বিন্দুমাত্র প্রাধান্য না দিয়ে যদি শুধু কর্মকেই প্রাধান্য দেয়া হয় তবে তাই হবে কর্মকর্তৃবাচ্য । অর্থাৎ বিষয়টি এমন হবে যে, কে কর্তা তা আমরা ভুল করেও মনে করি না। কেবল তার তৈরিকৃত জিনিসটির বা কাজটির বা সৃষ্টিটির বা কর্মটির কথাই আমাদের মনে আসে।

বাক্য

ব্যাখ্যা

বাচ্য

আযান হচ্ছে।

কে আযান দিচ্ছে সেই কর্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে কর্ম হিসেবে আযানকেই গুরুত্ব দেয়া হয় ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

কাজটি ভাল দেখায় না।

কে কাজটি করে সেই কর্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা কর্ম হিসেবে কাজটিকেই গুরুত্ব দেই ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

সুতি কাপড় অনেক দিন টিকে

কে সুতি কাপড় তৈরি করল সেই কর্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা কর্ম। হিসেবে সুতি কাপড়কেই গুরুত্ব দেই ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

ট্রেনটি দ্রুত চলছে।

ট্রেন কিন্তু নিজে চলতে পারে না। কেউ না কেউ চালায় । কে ট্রেনটি চালায় সেই কর্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা কর্ম হিসেবে ট্রেনটিকেই গুরুত্ব দেই।

কর্মকর্তৃবাচ্য

চাঁদ দেখা যাচ্ছে।

যে চাদ দেখছে সেই কর্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা কর্ম হিসেবে চঁাদকেই গুরুত্ব দেই ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

১. ঢোল বাজে

২. শঙ্খ বাজে।

৩. বাঁশি বাজে ঐ মধুর লগনে ।

৪. বাজনা বাজে।

‘বাজনা' অর্থে বাজে দিয়ে যত বাক্য হবে তার সবগুলো কোন চিন্তা ছাড়াই কর্মকর্তৃবাচ্যের উদাহরণ হবে ।

কর্মকর্তৃবাচ্য

 

বাচ্য পরিবর্তনের উদাহরণ

১.(কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য)

কর্তৃবাচ্য - বিদ্বানকে সকলেই আদর করে।

কর্মবাচ্য - বিদ্বান সকলের দ্বারা আদৃত হন।

কর্তৃবাচ্য - কামাল পুস্তক পাঠ করছে।

কর্মবাচ্য - কামাল কর্তৃক পুস্তক পঠিত হচ্ছে।

২.কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্য

কর্তৃবাচ্য - আমি যাব না।

ভাববাচ্য - আমার যাওয়া হবে না।

কর্তৃবাচ্য - তোমরা কখন এলে?

ভাববাচ্য - তোমাদের কখন আসা হল?

৩.কর্মবাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য

কর্মবাচ্য - দস্যুদল কর্তৃক গৃহটি লুণ্ঠিত হয়েছে।

কর্তৃবাচ্য - দস্যুদল গৃহটি লুণ্ঠন করেছে।

কর্মবাচ্য - হালাকু খাঁ কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংস হয়।

কর্তৃবাচ্য - হালাকু খা বাগদাদ ধ্বংস করেন।

৪.ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য

ভাববাচ্য - তোমাকে হাঁটতে হবে।

কর্তৃবাচ্য - তুমি হাঁটবে।

ভাববাচ্য - তার যেন আসা হয়।

কর্তৃবাচ্য - সে যেন আসে।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

4 out of 4 Marked as Helpfull !