বাংলা ভাষার প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ Last updated: 3 months ago

ভাষা ব্যবহারে অশুদ্ধি ঘটে থাকে প্রধানত ৩ টি কারণে –

ক. উচ্চারণ দোষে,  খ. শব্দ গঠন ক্রটিতে এবং গ. শব্দের অর্থগত বিভ্রান্তিতে

১. অজ্ঞানতা: অজ্ঞানতা শব্দটির প্রকৃত অর্থ – জ্ঞান শূন্যতা। অজ্ঞতা অর্থে এই শব্দটির প্রয়োগ প্রচলিত হলেও ভুল।

২. অপোগণ্ড: শব্দটির প্রকৃত অর্থ নাবালক/ শিশু। অপদার্থ বা অকর্মণ্য অর্থে এই শব্দের প্রয়োগ প্রচলিত হলে ভুল।

৩. আয়ত্তাধীন: বহুল প্রচলিত একটি ভুল বাক্য হল – বিষয়টি অমির আয়ত্তাধীন নয়। কিন্তু ‘আয়ত্ত’ শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘অধীন। তাই শুদ্ধ বাক্যটি হবে বিষয়টি আমার অধীন নয়। বিষয়টি আমার আয়ত্তে নেই।

৪. আঙ্গিকঃ ‘আঙ্গিক' শব্দটি বিশ্নেষণ হচ্ছে – অঙ্গ + ষ্ণিক; যার সঠিক অর্থ হচ্ছে অঙ্গ সম্বন্ধীয়। কিন্তু বর্তমানে কলাকৌশল’ অর্থে এই শব্দটির অবাধ প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: বাড়িটি নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে। পুরাতন কমিটি ভেঙে নতুন আঙ্গিকে কমিটি গঠন করা হোক। তাই কলাকৌশল অর্থে ‘আঙ্গিক' শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও ভুল।

৫ অধীনস্ত: বহুল প্রচলিত হলেও শব্দটি ভুল। সঠিক শব্দ হবে অধীন।

৬. আকণ্ঠ পর্যন্ত: আকণ্ঠ শব্দের অর্থই হচ্ছে কণ্ঠ পর্যন্ত। তাই ‘আক’ শব্দের পরে আবার পর্যন্ত যোগ করা হলে তা বাহুল্য দোষের সৃষ্টি করবে।

৭. আশ্চর্য / আশ্চার্যান্বিত: ‘আশ্চর্য’ শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে ‘বিস্ময়কর’ । বিস্মিত অর্থে এই শব্দের ব্যবহার বহুল প্রচলিত হলেও ভুল। যেমন: ব্যাপারটি দেখে আমি আশ্চর্য হলাম। সঠিক বাক্য হবে –ব্যাপারটি দেখে আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম।

৮. ইদানীংকালে: ইদানীং অর্থই হচ্ছে বর্তমান কাল। এর পরে তাই আবার ‘কাল’ যোগ করা হলে তা বাহুল্য দোষের সৃষ্টি করবে।

৯. তক্কালীন সময়ে: তৎকালীন অর্থই হচ্ছে সেই সময়ে। এর পরে আবার সময়ে যোগ করলে তা বাহুল্য দোষের সৃষ্টি করবে।

১০. কর্তৃপক্ষগণঃ কর্তৃপক্ষ একটি বহুবচনজ্ঞাপক শব্দ। এর পরে আবার বহুবচনজ্ঞাপক শব্দ ‘গণ’ ব্যবহার করা হলে তা ভুল হবে।

১১. কার্যকরী: কার্যকর শব্দের অর্থই হচ্ছে উপযোগী। তাই ‘ঈ-কার’ বাহুল্য দোষের সৃষ্টি করে।

১২. কৃচ্ছতা: কৃচ্ছ শব্দটির অর্থ হচ্ছে শারীরিক কেশ, কষ্টসাধ্য ব্রত। তাই এর পরে তা প্রত্যয় যোগ প্রচলিত হলেও ভুল।

১৩. জাতীয়করণ: জাতীয়করণ শব্দের অর্থ জাতির অন্তর্ভুক্তিকরণ; সরকারের তত্ত্বাবধানে আনা নয়। অথচ কোন কিছু সরকারি করা হলে বলা হয় – জাতীয়করণ করা হয়েছে। শুনতে বেখাপ্পা লাগলেও এখানে সঠিক শব্দ হবে সরকারিকরণ।

১৪. আন্তর্জাতিকঃ আন্তর্জাতিক শব্দটির আভিধানিক অর্থ “জাতির অন্তর্গত বা জাতির অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কিত। এজন্য অনেকে মনে করেন, International, বিভিন্ন রাষ্ট্র বা জাতিসম্বন্ধীয় অর্থে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটির ব্যবহার শুদ্ধ নয়। কিন্তু এই মতবাদটি ভুল। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘আন্তর্জাতিক (অন্তর্জাতি + ইক)' শব্দের অর্থ বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধীয় (International)। যেমন: জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক [বিভিন্ন রাষ্ট্র সম্বন্ধীয় (International)] সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। একই অভিধানমতে, বাংলায় আন্তর্জাতিক শব্দটির অর্থ ‘সার্বরাষ্ট্রিক। যেমন: জাতিসংঘ, একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। সুতরাং International, বিভিন্ন রাষ্ট্রসম্বন্ধীয় প্রভৃতি অর্থে আন্তর্জাতিক শব্দের ব্যবহার শুদ্ধ প্রমিত।

১৫.পদক্ষেপ:  শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পদার্পণ / পা ফেলা। বর্তমানে ব্যবস্থা গ্রহণ” অর্থে এই শব্দটির অবাধ প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: বেকারত্ব রোধে সরকার নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তাই ব্যবস্থা গ্রহণ অর্থে “পদক্ষেপ” শব্দটি বহুল প্রচলিত হলেও ভুল।

১৬. জন্মবার্ষিকী/জন্মবার্ষিক: জন্মবার্ষিক না কি জন্মবার্ষিকী – কোনটি শুদ্ধ এটা এটা নিয়ে আমাদের অনেকেরই দ্বিধার সৃষ্টি হয়। প্রচলিত অনেক বইতে এমনটা দেখতে পাওয়া যায় যে, জন্মবার্ষিক শব্দটিই যথেষ্ট। অকারণে স্ত্রী প্রত্যয় যোগ ভুল প্রচলিত হলেও তা অশুদ্ধ।

১৭. প্রেক্ষিত: প্রেক্ষিত শব্দটির মূল অর্থ হচ্ছে প্রেক্ষণ (দর্শন করা হয়েছে যা)। পরিপ্রেক্ষিত (পটভূমি বা পারিপার্শ্বিক) অর্থে এই শব্দের ব্যবহার অশুদ্ধ।

১৮.প্রামাণ্য: শব্দটির অর্থ প্রামাণিকতা / বিশ্বস্ততা। এই বিশেষ্য শব্দটি প্রমাণসিদ্ধ, প্রমাণিত, প্রামাণিক বা বিশ্বস্ততা বিশেষণ অর্থে প্রয়োগ ভুল।

১৯.বমালসুদ্ধ: বমাল শব্দের অর্থই হচ্ছে মাল সহ। সুতরাং শেষে ‘সুদ্ধ’ শব্দটির প্রয়োগ ভুল। ২০. বিদেহী / বিদেহ: বিদেহ শব্দটিই একটি বিশেষণ যার অর্থ দেহশূন্য বা অশরীরী। তাই শেষে আবার ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগে বিশেষণ করা হলে তা ভুল প্রয়োগ।

২১.শায়িত / শয়ান: শায়িত শব্দের অর্থ ‘শয়ন করানো হয়েছে এমন’। যিনি নিজে শুয়ে আছেন তাকে ‘শয়ান’ বলা হয়। শুয়ে আছেন অর্থে শায়িত শব্দের প্রয়োগ প্রচলিত হলেও ভুল। যেমন: হিমেল বিছানায় শায়িত আছে। সঠিক বাক্যটি হবে – হিমেল বিছানায় শয়ান আছে।

২২.পরিবারবর্গ: ‘পরিবার’ একটি বহুবচনজ্ঞাপক শব্দ। এর পরে আবার বহুবচনজ্ঞাপক শব্দ ‘বর্গ’ ব্যবহার করলে তা ভুল হবে।

২৩. আশঙ্কা/সম্ভাবনাঃ আগামীকাল বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে’ – আপাতদৃষ্টিতে বাক্যটি সঠিক মনে হলেও ব্যাকরণিক ভাবে এতা ভুল। সম্ভাবনা বসে Positive অর্থে আর Negative অর্থে বসে ‘আশঙ্কা'। সঠিক বাক্য হবে -আগামীকাল বজ্রসহ হালকা বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

২৪.সত্ত্বেও/ফলে: ‘কঠোর সাধনা সত্ত্বে তার বিসিএস পাওয়া সম্ভব হয়েছে’ – আপাতদৃষ্টিতে বাক্যটি সঠিক মনে হলেও  ব্যাকরণিক ভাবে এটা ভুল। পূর্ববর্তী কাজের প্রভাবে পরবর্তী কাজ হলে তখন বসে ‘ফলে’ আর পূর্ববর্তী কাজের প্রভাবে পরবর্তী কাজ না হলে তখন বসে ‘সত্তেও। সঠিক বাক্য হবে- কঠোর সাধনার ফলে তার বিসিএস পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

২৫.ভাষাভাষী: ভাষা ব্যবহারকারী অর্থে শুধু ‘ভাষা’ –ই  যথেষ্ট ও যথার্থ। ভাষাভাষী এর প্রয়োগ বাহুল্য। বহুল প্রচলিত একটি  অশুদ বাক্য হচ্ছে – ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর ৪র্থ বৃহত্তম মাতৃভাষা। সঠিক বাক্য হবে – ভাষার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর ৪র্থ বৃহত্তম মাতৃভাষা।

২৬. খাঁটি গোরুর দুধ/গোরুর খাটি দুধ:  খাঁটি গোরুর দুধ, না কি গোরুর খাঁটি দুধ – কোনটা সঠিক? মানে গোরু খাঁটি, না-কি দুধ খাঁটি? – এই বিষয়টা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই দ্বিধার সষ্টি হয়ে থাকে। এই দ্বিধা সৃষ্টির অবশ্য যথেষ্ঠ কারণও রয়েছে।দুটি আলাদা রেফারেন্স থেকে দুটি বিষয়কেই সঠিক বলা হয়েছে এক্ষেত্রে।

গোরুর খাটি দুধ সঠিকের পক্ষে যুক্তি: পদক্রমের নিয়মানুযায়ী সাধারণভাবে বিশেষণ সর্বদা বিশেষ্যের পূর্বে বসাতে হয়। এই বাক্যে ‘গোরু” এবং “দুধ’ দুটিই বিশেষ্য আর ‘খাঁটি হচ্ছে বিশেষণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে ‘খাটি’ পদটি পূর্বে বসবে না কি ‘দুধ’ পদের পূর্বে বসবে? বাক্যটির দিকে লক্ষ করলেই বুঝা যায় এখানে ‘খাঁটি’ পদের দ্বারা দুধ কেমন তা বোঝানো হয়েছে, “গোরু’ কেমন তা বোঝানো হয়নি। তাই সঠিক বাক্য হবে “গোরুর খাঁটি দুধ।

খাঁটি গোরুর দুধ সঠিকের পক্ষে যুক্তি: আচ্ছা, ‘খাঁটি গোরুর দুধ’ না লিখে কেউ যদি ‘খাঁটি গোদুগ্ধ’ লেখেন, তাহলে কি আমরা তাকে ভুল বলব? নিশ্চয়ই নয়। “খাঁটি গোদুগ্ধ’ যদি কোনো দোষ না করে থাকে, তাহলে ‘খাঁটি গোরুর দুধ’ কী দোষ করল? ‘গোদুগ্ধ’ ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। আর ‘গোরুর দুধ’ অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস এবং অলুক অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসের উদাহরণ আলাদা লেখা যায়। যেমন: কলুর বলদ, তাসের ঘর, চোখের বালি ইত্যাদি। লক্ষণীয়, সমাসবদ্ধ পদকে ভেঙে তাদের মাঝখানে বিশেষণ বসানো যাবে না। সুতরাং খাঁটি পদটিকে কখনোই ‘গোরুর দুধ’ সমস্তপদের মাঝে বসানো যাবে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা পরীক্ষার হলে কী করব? বিগত সালের প্রশ্ন ও অপশন বিশ্লেষণ করলে ‘গোরুর খাঁটি দুধ'কেই শুদ্ধ হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া কিছু ভিন্নমত থাকলেও অধিকাংশ লেখক ‘গোরুর খাঁটি দুধ’কেই শুদ্ধ বলে মতামত দিয়েছেন। তাই পরীক্ষার হলে অপশনের ওপর নির্ভর করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ ধরে নিন কোনো একটা প্রশ্ন। আসলো যে নিচের কোন বাক্যটি শুদ্ধ? সেখানে অপশনে উল্লিখিত ৪টি অপশনের মধ্যে ৩টি নিশ্চিত ভুল। আর ১টি অপশনে। আছে ‘খাঁটি গোরুর দধ’। তখন আপনাকে এটাই সর্বোত্তম সঠিক উত্তর বলে দাগাতে হবে। তবে ‘খাঁটি গোরুর দুধ’ ও ‘গোরুর। খাঁটি দুধ দুইটাই থাকে সেক্ষেত্রে ‘গোরুর খাঁটি দুধ’কে আমরা সর্বোত্তম সঠিক উত্তর বলে দাগাবো।

একইভাবে বিরাট গোরু ছাগলের হাট ও গোরু ছাগলের বিরাট হাট দুটোই সঠিক। তবে ‘গোরু ছাগলের বিরাট হাট' অপশনে থাকলে এটিকে সর্বোত্তম শুদ্ধ উত্তর হিসেবে দাগাতে হবে।

২৭. স / স্ব: ‘স’ এর অর্থ সাথে আর ‘স্ব’ এর অর্থ নিজ। এই দুই স-এর ব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতা করলে বাক্য ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন: আপনি স্বপরিবারে নিমন্ত্রিত – প্রচলিত হলেও বাক্যটি ভুল। এখানে ‘স্বপরিবার' বলতে বোঝানো হয়েছে নিজ পরিবার; তার মানে আপনি নিজ পরিবারে আমন্ত্রিত। তাই সঠিক বাক্য হবে – আপনি সপরিবার নিমন্ত্রিত। লক্ষণীয় – ‘স' অর্থ " সাথে অর্থাৎ সপরিবার অর্থ পরিবারের সাথে। তাই সপরিবার শব্দটির সাথে ‘এ-কার’ যোগ করলে তা ভুল হবে।

২৮. গত ১০ বছর আগে: গত ১০ বছর আগে তিনি মারা গেছেন – বাক্যটি ভুল। এখানে গত এবং আগে একই অর্থবোধক শব্দ। তাই সঠিক বাক্য হবে – ১০ বছর আগে তিনি মারা গেছেন।

২৯. সমৃদ্ধশালী: বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী দেশ – বহুল প্রচলিত হলেও বাক্যটি ভুল। ‘সমৃদ্ধ’ শব্দটি বিশেষণ; এর বিশেষ্য রূপ ‘সমৃদ্ধি'। তাই ‘সমৃদ্ধ’ শব্দটির সাথে ‘শালী যোগ করে পুনরায় তাকে বিশেষণ করাটা অনর্থক। সঠিক রূপ হবে –একটি সমৃদ্ধ দেশ।

৩০. সর্বাধিক কম: বিল্লাল পরীক্ষায় সর্বাধিক কম নাম্বার পেয়েছে – বাক্যটি অশুদ্ধ। কারণ সর্বাধিক অর্থ ‘সবচেয়ে বেশি। তাহলে বাক্যটির অর্থ দাড়ায় সবচেয়ে বেশি কম নাম্বার – যা ভুল। সঠিক বাক্য হবে – বিল্লাল পরীক্ষায় সবচেয়ে কম নাম্বার পেয়েছে। ।

৩১. অপমান: প্রীতি শুভকে অপমান করল – বাক্যটি ভুল। কারণ কেউ কাউকে অপমান করে না, করে অপমানিত। সুতরাং সঠিক বাক্য হবে – প্রীতি শুভকে অপমানিত করল।

৩২. সময়কাল: সময়কালে না পড়লে পরে পস্তাতে হবে – বাক্যটি ভুল। সময় ও কাল দুটো একটি আরেকটির সমার্থক শব্দ। তাই এখানে যে-কোনো একটি ব্যবহার করতে হবে। সঠিক বাক্য হবে – সময় থাকতে না পড়লে পরে পস্তাতে হবে।

৩৩. অশ্রুজল: আর অশ্রুজল বিসর্জন দিও না – বাক্যটি ভুল। কারণ অশ্রু শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘চোখের জল’। এর পরে আবার জল ব্যবহার করলে দ্বিত্ব প্রয়োগ হয়ে বাক্যটি ভুল হয়। সঠিক বাক্য হবে – আর অশ্রু বিসর্জন দিও না অথবা আর চোখের জল বিসর্জন দিয়ো না।

৩৪. বিষয়/প্রসঙ্গ: দরখাস্ত লেখার ক্ষেত্রে লেখা হয় – ‘বিষয়: বেতন মওকুফ প্রসঙ্গে। এক্ষেত্রে বাক্যটি ভুল। কারণ বিষয় ও প্রসঙ্গ একই অর্থবোধক শব্দ। সঠিক রূপ হবে – ‘বিষয়: বেতন ভাতা মঞ্জরি'। অর্থাৎ যেখানে ‘বিষয় আছে সেখানে প্রসঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

৩৫. ধূমপান নিষিদ্ধ: ইংরেজি Smoking is Prohibited – এর বাংলা অর্থ হিসেবে কেউ কেউ বলেন, “ধূমপান নিষেধ’, যেখানে নিষেধ’ শব্দটি অপপ্রয়োগ। এই মতামতটি ব্যাকরণমতে আদৌ ঠিক নয়। এক্ষেত্রে নিষেধ’ ও ‘নিষিদ্ধ’ দুটোই শুদ্ধ ও প্রমিত। বরং নিষেধ’ শব্দটি যেমন বহুল প্রচলিত তেমনি ব্যাকরণগতভাবেও শুদ্ধ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] গ্রন্থে নিষেধ’ শব্দটিকে বিশেষ্যও বলা হয়েছে আবার বিশেষণও বলা হয়েছে। সে হিসেবে ‘ধূমপান নিষেধ’ ও ‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ দুটো প্রকাশভঙ্গিই শুদ্ধ।

৩৬. বিশেষণের দ্বিত্ব প্রয়োগ: বিশেষণ পদকে পুনরায় বিশেষণ করার একটি প্রবণতা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। যেমন: সলজ্জিত হয়ে সে কথা বলল। সচিত্রিত ব্যাখ্যার দ্বারা বিষয়টা বোঝানো হল। সশঙ্কিত চিত্তে সে গৃহে প্রবেশ করল। সবাই একত্রিত হল – বাক্যগুলো ভুল। সঠিক রূপ হবে – সলজ্জ / লজ্জিত হয়ে সে কথা বলল। সচিত্র / চিত্রিত ব্যাখ্যার দ্বারা বিষয়টা বোঝানো হল। শঙ্কিত চিত্তে সে গৃহে প্রবেশ করল। সবাই একত্র হল।

৩৭. বিবিধ প্রকার: বিবিধ প্রকার বই পড়ে তথ্যটি জানতে পারলাম – বাক্যটি ভুল। কারণ ‘বিবিধ’ ও ‘প্রকার’ একই অর্থ প্রকাশ করে। তাই সঠিক বাক্য হবে – বিবিধ বই পড়ে তথ্যটি জানতে পারলাম।

৩৮. প্রতিদ্বন্দ্বিতা / উৎকর্ষতা: প্রতিদ্বন্দ্বী / উৎকর্ষ শব্দটি বিশেষ্য। তাই এর সাথে পুনরায় তা প্রত্যয় যোগ করে বিশেষ্য করার চেষ্টা করা অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত।

৩৯. আরোগ্য: অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি আরোগ্য হলেন – বাক্যটি ভুল। আরোগ্য হলেন হবে না; আরোগ্য লাভ করা হয়। তাই সঠিক বাক্য হবে – অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি আরোগ্য লাভ করলেন।

৪০. হার / শতাংশ: আমদানি শুল্কের হার ২৫ শতাংশ = বহুল প্রচলিত হলেও এই বাক্যটি ভুল। কারণ এখানে ‘হার’ এবং ‘শতাংশ’ একই অর্থবোধক শব্দ। কাজেই শুদ্ধ বাক্য হবে – আমদানি শুল্কের হার ২৫ অথবা আমদানি শুল্ক এখন ২৫ শতাংশ।

৪১.কেবলমাত্র: কেবলমাত্র / শুধুমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত – বহুল প্রচলিত হলেও বাক্যটি ভুল। কারণ কেবল’,শুধু’ আর ‘মাত্র একই অর্থ প্রকাশ করে। তাই সঠিক রূপ হবে — কেবল/ শুধু অনুমোদিত ব্যক্তিবর্গের জন্য নির্ধারিত।

৪২. বুঝা/ বোঝা: দুটি বানানই শুদ্ধ, তবে প্রয়োগ ভিন্ন। সাধু রীতির ক্রিয়াপদে সর্বদা বুঝ’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: তারে বুঝাইলাম,সে বঝিলো না, বুঝিতেও চাইলো না, মনে ভাবিলাম, বুঝাইয়াও আর কাজ নাই। তবে চলিত রীতির সমাপিকা ক্রিয়াপদে ‘বোঝ। ব্যবহৃত হয়। যেমন: সে বোঝে। তিনি বোঝেন। সে বোঝাক, তুমি বোঝো। ব্যতিক্রম: আমি বুঝি।। অন্যদিকে, চলিত রীতির অসমাপিকা ক্রিয়াপদে ‘বুঝ’ ব্যবহৃত। যেমন: সে পড়াটি বুঝতে চাচ্ছে না, না বুঝলে নাই, আমারও আর বুঝিয়ে কাজ নেই। উল্লেখ্য সর্বক্ষেত্রে ‘Burden’ অর্থে ‘বোঝা। যেমন: আমের বোঝা মাথায় চাপিয়ে বাজারে যাই। পিতামাতার দায়িত্ব সন্তানের কাছে যেন কখনোই বোঝা না হয়।

৪৩. ওঠে/উঠে: ওঠে সমাপিকা ক্রিয়া আর উঠে অসমাপিকা ক্রিয়া। কাজেই শব্দদটো ব্যবহারের সময় একটু লক্ষ রাখতে হবে।  ধ্রুব সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে নামাজ পড়ে বাক্যটি ভুল। এখানে ‘উঠে’ হবে।

৪৪. দুর্নিবার/অনিবার্য:  দুর্নিবার এবং অনিবার্য দুটো শব্দই ঠিক। তবে দুটোকে একত্র করে দুর্নিবার্য লেখায় বাক্যটি ভুল। সঠিক বাক্য হবে – অন্যায়ের প্রতিফল দুর্নিবার / অন্যায়ের প্রতিফল অনিবার্য।

৪৫. ভেরি/ভেড়ি/ ভেড়ীঃ  সবকটি বানানই ঠিক। পার্থক্য কেবল অর্থে, ভেরি অর্থ ঢাক, ভেড়ি অর্থ পানি আটকাবার জন্য উঁচু বাঁধ, ভেড়ী হচ্ছে ভেড়ার স্ত্রী বাচক রূপ।

৪৬. সর্বজনীন / সার্বজনীন:  সর্বজনীন অর্থ –সর্বসাধারণের জন্য অনুষ্ঠিত, বারোয়ারি; সকলের জন্য কল্যাণকর (সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়)। যেমন: এখন পল্লিতে সর্বজনীন পূজার প্রচলন দেখা যায়। এখানে সর্বজনীন পূজা বলতে সকলের জন্য মঙ্গলকর বোঝানো হয়েছে। আর সার্বজনীন অর্থ – সকলের মধ্যে জ্যেষ্ঠ/প্রাচীন (সকলের জন্য কল্যাণকর নয়) যেমন -ভারতের সার্বজনীন শিক্ষায় ছিল অবারিত দ্বার। নেলসন মেন্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন সার্বজনীন নেতা। প্রথমটিতে সার্বজনীন শিক্ষা বলতে প্রাচীন শিক্ষা আর দ্বিতীয়টিতে সার্বজনীন নেতা বলতে বয়ওজ্যেষ্ঠ অর্থ বোঝানো হয়েছে। অভিধানিক ভাবে দুটো বানানই শুদ্ধ কিন্তু একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার হচ্ছে অশুদ্ধ।

৪৭.  শিস/শিশ/শিষ: প্রথম শিস এর অর্থ ঠোঁটের সাহায্যে তৈরি শব্দ; দ্বিতীয় শিশ এর অর্থ কাঁচ (শিশমহল); তৃতীয় শিষ এর অর্থ  শীর্ষ বা চূড়া। তিনটি বানানই শুদ্ধ তবে তিনটি শব্দের অর্থ ভিন্ন হওয়ায় একটির জায়গায় অন্যটির ব্যবহার অশুদ্ধ।

৪৮. আগত /আসন্নঃ  আগত শুক্রবার ইমাম সাহেব তার কন্যার বিয়ের দিন ধার্য করলেন বাক্যটি ভুল। কারণ ‘আগত’ শব্দের অর্থ - এসেছে এমন আর ‘আসন্ন’ শব্দের অর্থ আসবে এমন। তাই বাক্যটির শুদ্ধ রূপ হবে – আসন্ন শুক্রবার ইমাম সাহেব তার কন্যার বিয়ের দিন ধার্য করলেন।

৪৯. এবং/ ও:  প্রিয়া এবং বুশরা শাওনের সাথে বেড়াতে বের হয়েছে। নূপুর শাওনকে ফোন করে বাসায় যেতে বলল ও প্রীতি তার মাকে সবকিছু জানালো। অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্তের কারণে বাক্যদুটি ভুল। এবং’ হচ্ছে বাক্য সংযোজক আর ‘ও’ হচ্ছে পদ সংযোজক । তাই সঠিক রূপ হবে – প্রিয়া ও বুশরা শাওনের সাথে বেড়াতে বের হয়েছে। নূপুর শাওনকে ফোন করে বাসায় যেতে বলল এবং প্রতি তার মাকে সবকিছু জানালো।

৫০. অনুভূমিক / আনুভূমিক:  প্রচলিত অনেক বইতেই ‘অনুভূমি’ শব্দের সঙ্গে ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘আনুভূমিক’ শব্দটিকে শুদ্ধ বলা হয়েছে। তবে আধুনিক বাংলা অভিধানে আনুভূমিক শব্দের কোনো অস্তিত্বই নেই। এর কারণ মূল শব্দ ‘অনুভূমি’ আর এর সাথে ‘ক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শব্দটি ‘অনুভূমিক’ হয়েছে। এখন যদি ‘ক’ প্রত্যয় যুক্ত না হয়ে ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হতো তাহলে মূল শব্দের আদিস্বর বৃদ্ধি হয়ে ‘অ’ থেকে ‘আ’ হতো এটা সত্য, কিন্তু এর সাথে সাথে ভূমি বানানের ই-কারও সন্ধির নিয়মে ই-কার এর পরিবর্তে ঈ-কার হয়ে যেতো। অর্থাৎ বানানটা হতো ‘আনুভূমীক’। ইংরেজি Horizontal - এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে আনুভূমিক  শব্দটির ব্যবহার প্রচলিত হলেও অশুদ্ধ। শুদ্ধ রূপ হবে – অনুভুমিক।

৫১. সমচিত/যথোচিত: খারাপ অর্থে সমুচিত আর ভালো অর্থে যথোচিত ব্যবহৃত হয়। যেমন: এই অন্যায়ের সমুচিত শিক্ষা তোমার প্রাপ্য। এই ভালো কাজের যথোচিত পুরস্কার তোমার প্রাপ্য। একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার হচ্ছে অশুদ্ধ। তাই ব্যবহারের সময় ভালো করে লক্ষ রাখতে হবে।

৫২. সাক্ষর/স্বাক্ষর: দুটো বানানই শুদ্ধ। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। সাক্ষর অর্থ ‘অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। যেমন: আমাদের দেশে প্রতি বছর সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়। আর স্বাক্ষর অর্থ ‘সই / দস্তখত’। যেমন: চুক্তিপত্রে দুইজনের স্বাক্ষর আছে। স্থান পরিবর্তন হলে অপপ্রয়োগ হবে।

৫৩. অধঃস্তন / অধস্তন: অনেক জায়গায়ই লক্ষ করলে দেখা যায় লেখা আছে “অধঃস্তন কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত স্থান’ – এখানে অধঃস্তন শব্দের অর্থ ‘নিম্নস্থ স্তন’ যা ভুল। শুদ্ধ বানান হবে –অধস্তন।

৫৪. আভাষ / আভাস: দুটো শব্দই বিশেষ্য, তবে অর্থের পার্থক্য আছে। আভাষ শব্দের অর্থ ভূমিকা/ মুখবন্ধ। আর আভাস অর্থ ইঙ্গিত / অস্পষ্ট প্রকাশ। শব্দদুটো ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকতে হবে। যেমন: আমি অগ্রদূত বইয়ের জন্য আভাষ (মুখবন্ধ)  লিখলাম। আজ রেডিয়োতে ঝড়ের আভাস (ইঙ্গিত) পেলাম। একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার করা হলেই তা অপপ্রয়োগ।

৫৫. সেবাপরায়ণতা/ সেবা: এটাও আগের নিয়মের মত। যেমন: আমি তার সেবা গ্রহণ করলাম; আমি তার সেবাপরায়ণতায় মুগ্ধ। একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার করা হলেই তা অপপ্রয়োগ হবে।

৫৬.  আতিথেয়তা / আতিথ্য: দুটো শব্দই বিশেষ্য, তবে অর্থের পার্থক্য আছে। আতিথেয়তা অর্থ সেবাপরায়ণতা (Hospitality) আর আতিথ্য অর্থ অতিথি সৎকার (Being a Host)। শব্দদুটো ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকতে হবে। যেমন- আমি তার আতিথ্য গ্রহণ করলাম। আমি তার আতিথেয়তায় মুগ্ধ। একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার করা হলেই তা অপপ্রয়োগ।

৫৭. না হয়/ নাহয়: না হয়’ শব্দটি হয়’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এখানে না শব্দটি কথার ধরনমাত্র। অন্যদিকে ‘নাহয় পক্ষান্তরে বা বিকল্প অর্থে বোঝায়। যেমন: সে না হয় মন্দ লোক; তুমিও তো কম না (অর্থাৎ সে মন্দ লোক, তুমিও কম না)। আবার সে নাহয় তুমি কাল একবার এসো (অর্থাৎ সে অথবা তুমি দুজনের যেকোনো একজন কালকে এসো)।

৫৮. হ+ণ / হ্ন: অপর, পূর্ব এবং পরা এই তিনটি পদের পরে বসে হু(হ+ণ)। যেমন: অপরা, পূর্বাহু এবং পরাহু। এছাড়া অন্য পদের বসে হ্ন। যেমন: মধ্যাহ্ন, সায়াহ্ন, নিশ্চিহ্ন, চিহ্ন ইত্যাদি।

৫৯. এমনই / এমনি :এমনই’ – অর্থ এতই, এই পরিমাণ বা এই রকম ইত্যাদি। যেমন: মেয়েটি এমনই বেয়াদব যে বাবা কথা পর্যন্ত শোনে না। আর এমনি’ – অর্থ অকারণে। যেমন: এমনি ফোন দিলাম।

৬০. অত্র / যত্র তত্র: অত্র অর্থ এখানে, যত্র অর্থ যেখানে, তত্র অর্থ সেখানে। বলা হয় – যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না। অর্থাৎ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না। যত্র , তত্র এর ব্যবহার ঠিক আছে কিন্তু অত্র এর ব্যবহারে প্রায়ই অপপ্রয়োগ দেখা যায়। যে অত্র বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে...... অত্র অফিসে...... যার অর্থ হয় এখানে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে...... এখানে অফিসে... , অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত। সঠিক রূপ হবে – এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে..... এই অফিসে......।

 ৬১. একত্র / একত্রে:  তারা দুইজন একত্রে গমন করলেন – প্রচলিত হলেও বাক্যটি ভুল। সঠিক বাক্য হবে – তারা দুইজন একত্র গমন করলেন।

৬২. স্বাগতম /সুস্বাগতম: আপনাদের সকলকে সুস্বাগতম – এখানে সুস্বাগতম শব্দটির অপপ্রয়োগ ঘটেছে। এটা সন্ধিঘটিত ভুল। সু+ আগত = স্বাগত। সুতরাং সঠিক শব্দ হবে স্বাগতম। এর পূর্বে ‘সু’ এর ব্যবহার অনর্থক।

৬৩. অভ্যন্তরীণ / আভ্যন্তরীণ: প্রচলিত অনেক বইতে ‘আভ্যন্তরীণ’ শব্দটিকে সঠিক বলা হলেও বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান অনুসারে শব্দটি ভুল। এর কারণ মূল শব্দ হচ্ছে ‘অভ্যন্তর’ আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘ঈন’। মনে রাখতে হবে ‘ঈন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে কখনও আদিস্বর বৃদ্ধি হয় না, আদিস্বর বৃদ্ধি হয় ‘ইক’ প্রত্যয় যুক্ত হলে। এখানে সঠিক হবে কেবল অভ্যন্তরীণ।

৬৪. স্বত্ব / সত্ত্ব: স্বত্ব অর্থ নিজস্ব মালিকানা বা নিজ অধিকার। যেমন: এই বইয়ের গ্রন্থস্বত্ব লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আর সত্ত্ব অর্থ- বিদ্যমান, অস্তিত্ব বা গুণ। যেমন: কামাল সাহেব একজন সাত্ত্বিক লোক। সুতরাং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বনীয়।

৬৫. মহা: মহা শব্দটি দিয়ে খুব বেশি’ বুঝালে পরবর্তী শব্দের সাথে আলাদা বসে। যেমন: মহা কুঁড়ে, মহা চালাক, মহা জ্ঞানী, মহা পাপী ইত্যাদি। তবে মহা শব্দটি ‘মহৎ বা মহান’ অর্থে ব্যবহৃত হলে পরবর্তী শব্দের সাথে একত্রে বসে। যেমন: মহাকবি,মহাজন, মহামানুষ ইত্যাদি।

৬৬. ব্যাপী: ব্যাপী শব্দটি বিশেষণ হলেও সাধারণত সমাসবদ্ধ পদ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। সুতরাং সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে তা পূর্ববর্তী শব্দের সাথে একত্রে বসে। যেমন: জীবনব্যাপী, দিনব্যাপী, মাসব্যাপী, বছরব্যাপী ইত্যাদি।

৬৭.  ঠিক / সঠিক: ‘সঠিক’ শব্দটির ব্যবহারে অনেকের আপত্তি দেখা যায়। তারা মনে করেন, ‘সঠিক’ শব্দটির স-বর্ণটি বাহুল্য।তাই শব্দটির প্রয়োগ সমীচীন নয়। প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে সৃষ্ট একটি অপরিপক্ক ধারণা থেকে তারা এমন মন্তব্য করে থাকেন।

বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান উভয়মতে ‘সঠিক’ শব্দটি পুরোপুরি সঠিক।

৬৮. বহুল:  বহুল শব্দটি পূর্ববর্তী শব্দের শেষে আলাদা না বসে একত্রে বসে। যেমন: ঘটনাবহুল, জনবহুল, বিলাসবহুল। কিন্তু পরবর্তী শব্দের আগে বসলে একত্রে না বসে আলাদা বসে। যেমন: বহুল পরিচিত, বহুল পরিমাণ, বহুল কথিত ইত্যাদি। শব্দটি

লেখার ক্ষেত্রে তাই ভালোভাবে লক্ষ রাখতে হবে।

৬৯. বিশেষ: বিশেষ শব্দটি দিয়ে ‘অবস্থা / ভেদ’ বুঝালে পূর্ববর্তী শব্দের সাথে একত্রে বসে। যেমন: অবস্থাবিশেষ, ইতরবিশেষ,গ্রন্থবিশেষ, দর্শনবিশেষ ইত্যাদি। তবে বিশেষ শব্দটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ’ অর্থে ব্যবহৃত হলে পরবর্তী শব্দের সাথে আলাদা বসে। | যেমন: বিশেষ অবস্থা, বিশেষ গ্রন্থ ইত্যাদি।

৭০. এক রকম / একরকম: সমান বা সমান বৈশিষ্ট্য বুঝাতে ‘এক রকম’ আর প্রায় বা যেমন তেমন বুঝাতে ‘একরকম’ ব্যবহৃত হয়।যেমন- সব সময় এক রকম কথা বলো না। একরকম চলে যাচ্ছে দিন।

৭১.  মতো:  শব্দটি দিয়ে অনুযায়ী / অনুসারে বুঝালে পূর্ববর্তী শব্দের সাথে একত্রে বসে। যেমন: ইচ্ছেমতো, কথামতো।

 তবে মতো শব্দটি ‘তুলনা/ প্রতিরূপ’ অর্থে ব্যবহৃত হলে পূর্ববর্তী মতো, পাখির মতো ইত্যাদি।

৭২. তার পর/ তারপর: কোনো ঘটনার ধারাবাহিকতা বুঝাতে ‘তার পর এবং ঘটনার পরিসমাপ্তি বুঝাতে ‘তারপর’ ব্যবহৃত হয়। যেমন- সে যে একা হাঁটলাম তার পর নিরন্তর হেঁটে চলা। তুমি এসো তারপর আমি যাব।

৭৩. লক্ষ্য / লক্ষঃ লক্ষ্য অর্থ অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য, আর লক্ষ অর্থ খেয়াল করা / দৃষ্টিপাত করা/ একশ হাজার। যেমন:

→ আমাদের লক্ষ্য মানুষের মতো মানুষ হওয়া।

→ নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি তার কোনো লক্ষ নেই।

দুটি বানানই সঠিক তবে একটির পরিবর্তে আরেকটির ব্যবহার করা হলেই তা অপপ্রয়োগ হবে।

৭৪. ভারি/ ভারী: দুটো বানানই শুদ্ধ তবে এদের ব্যবহারটা পথক। ভারি’ বসে অত্যন্ত, অত্যধিক, দারু, , যেমন: ভারি মিষ্টি চেহারা; ভারি বজ্জাত ছেলে। আর ভারী’ ব্যবহৃত হয় ওজনদার, দায়িত্বভার অর্থে। যেমন: ভারি মিষ্টি, লোহা অনেক ভারী বস্তু।

শব্দের অপপ্রয়োগের কারণ

শব্দপ্রয়োগের নিয়ম জানা থাকলে অপপ্রয়োগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। নিম্নে শব্দের অপপ্রয়োগের কিছু উদাহরণ কারণসহ তুলে ধরা হল।

  • অজ্ঞানতা- অজ্ঞতা অর্থে প্রয়োগ অশুদ্ধ। অজ্ঞানতা শব্দের প্রকৃত অর্থ জ্ঞানশূন্যতা।
  • অশ্রুজল- চোখের জল অর্থে ব্যবহার অসিদ্ধ। অশ্রু অর্থই চোখের জল।
  • আঙ্গিক- অর্থ অঙ্গ-সম্বন্ধীয়। কলাকৌশল অর্থে প্রয়োগ ভুল।
  • আয়াত্তাধীন-আয়ত্ত শব্দের অর্থই অধীন। আয়ত্তের পর অধীন ব্যবহার বাহুল্য।
  • অপোগন্ড- প্রকৃত অর্থ নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক। অপদার্থ, অকর্মণ্য অর্থে প্রয়োগ অশুদ্ধ।
  • অধীনস্ত-শুদ্ধপ্রয়োগ অধীন।
  • আকন্ঠ পর্যন্ত-আকন্ঠ শব্দই কন্ঠ পর্যন্ত বোঝায়।পর্যন্ত এখানে বাহুল্য।
  • আন্তর্জাতিক-জাতির অন্তর্গত বা জাতির আভ্যন্তরিক বিষয়-সম্পর্কিত।বিভিন্ন জাতি-সংক্রান্ত বা সার্বজাতিক অর্থে প্রয়োগ অশুদ্ধ হলেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
  • আশ্চর্য-মূল অর্থ বিস্ময়কর। বিস্মিত অথ্যে ব্যবহার প্রচলিত হলেও ভুল,শুদ্ধরূপ আশ্চর্যান্বিত।
  • ইদানীংকালে-ইদানীং অর্থ বর্তমান কাল,এর সঙ্গে কাল যোগ করা বাহুল্য।
  • কর্মব্যপদেশে-কাজের ছুতায়।কর্মসূত্রে অর্থে প্রয়োগ ভুল।
  • কর্তৃপক্ষগণ-কর্তৃপক্ষ শব্দটি বহুবচনবাচক।অর্থ পরিচালকগণ,শাসকগণ।অতএব ‘গণ’প্রয়োগ বাহুল্য ও অশুদ্ধ।
  • খাঁটি গরুর দুধ-কথাটি অর্থহীন।শুদ্ধ রূপ গরুর খাঁটি দুধ।
  • কার্যকরী-কার্যকর অর্থই উপযোগী বা উপযোগী বা ফলদায়ক। ‘ঈ’-কার বাহুল্য।
  • কৃচ্ছতা-কৃচ্ছ শব্দের অর্থ শারীরিক ক্লেশ,কষ্টসাধ্য ব্রত।– ‘তা’ প্রত্যয় যোগ অশুদ্ধ।
  • জন্মবার্ষিকী-জন্মবার্ষিক শব্দই যথেষ্ট।অকারণ স্ত্রী-প্রত্যয়-যোগ বহুল প্রচলিত হলেও অশুদ্ধ।
  • জাতীয়করণ/রাষ্ট্রীয়করণ-ইংরেজী Nationalization -এর বাংলা অনুবাদ।প্রতিশব্দ। জাতীয়করণ বা
  • রাষ্ট্রীয়করণ বলতে জাতি বা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিকরণ বোঝায়।রাষ্ট্রীয় বা সরকারী তত্ত্বাবধানে আনা বোঝায় না। কাজেই রাষ্ট্রায়ত্ত করা অথবা সরকারী করা ইত্যাদি ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।
  • তৎকালীন সময়-তৎকালীন অর্থ সেই সময়। ‘তৎকালীন সময়’ প্রয়োগ অশুদ্ধ।
  • ধুমপান নিষেধ-ইংরেজী smoking is prohibited –এর বাংলা অনুবাদ হিসেবে অশুদ্ধ। শুদ্ধ রূপ: ধুমপান করা নিষেধ অথবা ধুমপান নিষিদ্ধ।
  • পদক্ষেপ-অর্থ পদার্পণ বা পা ফেলা। ব্যবস্থা গ্রহণ অর্থে পদক্ষেপ শব্দটির প্রয়োগ প্রচলিত হলেও অশুদ্ধ।
  • পূর্বাহ্নে-পূর্বে বা আগে অর্থে ব্যবহৃত শব্দটি ভুল।পূবাহ্নে অর্থ দিনের প্রথমভাগ বা সকালবেলা।
  • প্রমাণ্য-অর্থ প্রমাণিকতা বা বিশ্বস্ততা। এই বিশেষ্য শব্দটি প্রমাণসিদ্ধ,বিশ্বাসযোগ্য,প্রমাণিত বা প্রামাণিক(বিণ)অর্থে প্রয়োগ ভুল।
  • প্রেক্ষিত-মূল অর্থ যা প্রেক্ষণ বা দর্শন করা হয়েছে।পরিপ্রেক্ষিত (পটভূমি বা পারিপার্শ্বিক)অর্থে প্রেক্ষিত শব্দটির ব্যবহার অসিদ্ধ।
  • ফরাসীয়-ফরাসী শব্দের অর্থই ফরাসীদেশীয়। সুতরাং ‘ঈয়’প্রত্যয় যোগে ফরাসীয় সাহিত্য প্রয়োগ অসিদ্ধ। অনুরূপ ভুল-রুশীয়,মার্কিনী ইত্যাদি।
  • ফলশ্রুতি-আভিধানিক অর্থ পূণ্যকর্ম করলে যে ফল হয় তার বিবরণ বা তা শোনা। ফল বা ফলাফল অর্থে প্রয়োগ অশুদ্ধ।
  • বমালসুদ্ধ-বমাল শব্দের অর্থই মালসমেত,সেক্ষেত্রে শেষের ‘সূদ্ধ’ শব্দটি বাহুল্য।
  • ব্যক্তিত্ব-ব্যক্তি শব্দটি কর্তৃবাচক ও ব্যক্তিত্ব শব্দটি কর্মবাচক পদ। উভয়ই বিশেষ্য হলেও ‘ব্যক্তি’ অর্থে ব্যক্তিত্ব (ব্যক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বা personality )শব্দটির প্রয়োগ অসিদ্ধ।
  • বৈদেহী/বিদেহী-বিদেহ শব্দের অর্থ দেহশূণ্য বা অশরীরী।বিদেহ বিশেষণ,কিন্তু ‘ঈ’-প্রত্যয় যোগে পুনরায় বিশেষণ করা হয় –‘বিদেহী’। প্রচলিত হলেও ‘বিদেহী’ শব্দটি অশুদ্ধ।এই অর্থে ‘বৈদেহী’ শব্দটির প্রয়োগও ভুল।
  • ভাষাভাষী-ভাষা ব্যবহারকারী অর্থে ভাষীই যথার্থ ও যথেষ্ট। ভাষাভাষী প্রয়োগ বাহুল্য।
  • শায়িত-শায়িত শব্দের অর্থ ‘শয়ন করানো হয়েছে এমন’। যিনি নিজে শুয়ে আছেন তাঁকে ‘শয়ান’ বলা হয়। শুয়ে আছেন অর্থে শায়িত শব্দের প্রয়োগ প্রচলিত হলেও অশুদ্ধ।
  • স্বপরিবার/সপরিবার/সপরিবারে- ‘আপনি স্বপরিবার আমন্ত্রিত’-নিমন্ত্রণ-পত্রে এই ভুল বাক্যটি প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। ‘স্বপরিবার’ অর্থ নিজ পরিবার।সপরিবার শব্দটি বিশেষণ,অর্থ-‘পরিবারসহ’। ‘আপনি সপরিবার আমন্ত্রিত’বাক্যটি তাই শুদ্ধ। সংস্কৃতে ‘সপরিবার’ ক্রিয়া-বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হয়,কিন্তু বাংলায় ক্রিয়া-বিশেষণরূপে ‘সপরিবারে’ ব্যাকরণসম্মত না হলেও প্রচলিত।যেমন- ‘আপনি সপরিবারে আসিবেন’। অনুরূপ শব্দ-সবান্ধব(বিণ)-সবান্ধবে (ক্রি-বিণ)। একটি পরিবার অর্থে পরিবারবর্গ প্রয়োগ অশুদ্ধ।
  • সমৃদ্ধশালী/সম্পদশালী- সমৃদ্ধ (বিণ)শব্দের অর্থ সম্পদশালী বা প্রাচুর্যযুক্ত। – ‘শালী’ যোগ করে বিশেষণ পদ পুনরায় বিশেষণ করা অর্থহীন ও অশুদ্ধ। সম্পদ(বি.)বা সমৃদ্ধি (বি.) –র সঙ্গে ‘শালী’ যোগ করে বিশেষণ করা যায়। সম্পদশালী-র সঙ্গে – ‘ইনি’ প্রত্যয়-যোগও (যেমন-সম্পদশালিনী) ব্যকরণসম্মত নয়। শস্যশালীনীও এ- জাতীয় ভুল (শুদ্ধরূপ- শস্যশালী)।
  • বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ
  • ব্যাকরণজ্ঞান থাকলে ভাষার অশুদ্ধ প্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ অর্থাৎ অপপ্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়।

ভাষা অপপ্রয়োগের ক্ষেত্র

বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাষার অপপ্রয়োগ হতে পারে। যেমন:

১. শব্দ রূপান্তজাত অপপ্রয়োগ : দৈন্যতা, মাধুর্যতা, সমসাময়িক, উদ্ধেলিত, চোখের দৃষ্টিশক্তি, মাতাহারা।

২. শব্দদ্বিত্ব অপপ্রয়োগ : শুধু/কেমলমাত্র, অশ্রুজল, ঘামজল, ভুলত্রুটি, ভুলভ্রান্তি।

৩. সংখ্যাজাত অপপ্রয়োগ : ১ জুলাই/১লা জুলাই।

৪. বচনজাত অপপ্রয়োগ : বড় বড় মানুষরা সব, সকল/সমস্ত /সব যুদ্ধাপরাধীদের।

৫. নির্দেশকজাত অপপ্রয়োগ : এই লোকটি।

৬. সন্ধিজাত অপপ্রয়োগ : লজ্জাস্কর, ইতিমধ্যে, উল্লেখিত, দুরাবস্থা।

৭. সমাসজাত অপপ্রয়োগ : দেশ ও বিদেশে।

৮. উপসর্গজাত অপপ্রয়োগ : সুস্বাগতম, অক্লান্তি হীনভাবে, উপ-পরিচালক।

৯. বিভক্তিজাত অপপ্রয়োগ : আমাদেরকে, তাদেরকে, নারীদেরকে, বাড়িতে।

১০. প্রত্যয়জাত অপপ্রয়োগ : দৈন্যতা, দারিদ্রতা।

১১. চিহ্নজাত অপপ্রয়োগ : সুন্দরী বালিকা, আসমা অস্থিরা, অভাগিনী, কাঙালিনী।

১২. পক্ষজাত অপপ্রয়োগ : আমি অর্থাৎ হাসান জেনে শুনে ভুল করি না।

১৩. কারকজাত অপপ্রয়োগ : ছুরিতে, আমের কাননে।

১৪. বিসর্গজাত অপপ্রয়োগ : পুন:প্রচার।

১৫. সমোচ্চারিত অপপ্রয়োগ : তাড়া আমরাতলায় বসে আমরা খাওয়ার সময় মালির তারা খেয়েছে।

১৬. বাক্যজাত অপপ্রয়োগ : আমি স্বচক্ষে/নিজের চোখে।

১৭. বাচ্যজাত অপপ্রয়োগ : সূর্য পূর্বদিকে উদয় হয়।

১৮. এককথায় প্রকাশ অপপ্রয়োগ : চারিদিকে প্রদক্ষিণ, হাতে কলমে ব্যবহারিক শিক্ষা।

১৯. প্রবাদ অপপ্রয়োগ : স্বল্প বিদ্যা ভয়ংকরী।

২০. বাগধারা অপপ্রয়োগ : পাকা ধানে আগুন দেয়া।

২১. বানান ও উচ্চারণ অপপ্রয়োগ : প্রাণীজগৎ, কীভাবে, পৃথিবীব্যাপী, স্ত্রীবাচক, শশীভূষণ, মন্ত্রীসভা, স্বামীগৃহ, গুণীজন, নদীতীর, নদীমাতৃক, বৈশাখীমেলা, আগামীকাল।

  • সমাসবদ্ধ শব্দের বানান লেখা হয় ঈ-কার দিয়ে। ব্যাকরণ নিয়ম অনুসারে ঈ-কার হয়ে যায় ই-কার। ঊ-কার হয়ে যায় উ-কার। ণ-হয়ে যায় ন। য-ফলা থাকে না। যেমন: ঘরনি, কানাই/কানু, বোশেখি, সুয্যি, সোনা, সন্ধে ইত্যাদি।
  • প্রাদেশিক ও বিদেশি শব্দ হলে /ছ/য/ণ/ষ/ঞ্জ/ঞ্চ/ ঈ-কার/উ-কার বসে না তবুও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন: লুংগি, ডেংগু, ঠান্ডা, ঝান্ডা, লন্ঠন, মিসরি, পসন্দ, নামাজ, ওজু, ইস্টার্ন, স্টোর, ইনজিন, ইনজিনিয়ার, সেনচুরি, তির (ধনুক অর্থে, পাড় অর্থে নয়), অ্যাকাডেমি/এ্যাকাডেমি/একাডেমি, রসুল, নুর ইত্যাদি।
  • সংস্কৃতশব্দে য-ফলা চল আছে কিন্তু ইংরেজি শব্দে নাই তবু লেখা হচ্ছে। যেমন: ইস্যু, টিস্যু, গ্যেটে, স্যার। ইংরেজি শব্দকে তদ্ভব করে লেখা হচ্ছে। যেমন: হসপিটাল>হাসাপাতাল, চকোলেট>চকলেট।

শব্দের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সংস্কৃত সহিত থেকে ‘সঙ্গে বা সাথে’র উৎপত্তি। নিয়ম আছে গদ্যে ‘সঙ্গে’ আর পদ্যে ‘সাথে’ ব্যবহার করতে হবে তবে এখন সর্বত্রই ‘সঙ্গে’ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে বাক্য অুশুদ্ধ হতে পারে। যেমন :

অশুদ্ধবাক্য : রহিম ছেলেদের মধ্যে কনিষ্ঠতম/তর। শুদ্ধবাক্য : রহিম ছেলেদের মধ্যে কনিষ্ঠ।

অশুদ্ধবাক্য : আপনি সদাসর্বদা জনগণের মঙ্গল চেয়েছেন। শুদ্ধবাক্য : আপনি সর্বদা/সব সময় জনগণের মঙ্গল চেয়েছেন।

অশুদ্ধবাক্য : শুনেছি আপনি স্বস্ত্রীক ঢাকায় থাকেন। শুদ্ধবাক্য : শুনেছি আপনি সস্ত্রীক/স্ত্রীসহ ঢাকায় থাকেন।

অশুদ্ধবাক্য : আপনি জনগণের হয়েও তাদের পক্ষে সাক্ষী দেননি। শুদ্ধবাক্য : আপনি জনগণের হয়েও তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেননি।

অশুদ্ধবাক্য : ঘটনাটি শুনে আপনি তো উদ্বেলিত হয়ে পড়েছিলেন। শুদ্ধবাক্য : ঘটনাটি শুনে আপনি তো উদ্বেল হয়েছিলেন।

অশুদ্ধবাক্য : বাসের ধাক্কায় তিনি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। শুদ্ধবাক্য : বাসের ধাক্কায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

অশুদ্ধবাক্য : আপনার এলাকার উন্নয়নের জন্য আপনি দিবারাত্রি পরিশ্রম করেছেন। শুদ্ধবাক্য : আপনার এলাকার উন্নয়নের জন্য আপনি দিবারাত্র/দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।

অশুদ্ধবাক্য : আমাদের প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন নর-নারীর বৈষম্যতা দূর করতে। শুদ্ধবাক্য : আমাদের প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছেন নর-নারীর বৈষম্য দূর করতে।

অশুদ্ধবাক্য : শুধু নিজের না, দেশের উৎকর্ষতা সাধন করা প্রত্যেকেরই উচিত। শুদ্ধবাক্য : শুধু নিজের না, দেশের উৎকর্ষ/উৎকৃষ্টতা সাধন করা প্রত্যেকেরই উচিত।

অশুদ্ধবাক্য : বেশি চাতুর্যতা দেখাতে গিয়ে শেষে নিজেই দল থেকে বাদ পড়লেন। শুদ্ধবাক্য : বেশি চাতুর্য/চতুরতা দেখাতে গিয়ে শেষে নিজেই দল থেকে বাদ পড়লেন।

অশুদ্ধবাক্য : তার কথার মাধুর্যতা নাই। শুদ্ধবাক্য : তার কথার মাধুর্য বা মধুরতা নাই।

অশুদ্ধবাক্য : ঢাকা দিন দিন তার ভারসাম্যতা হারিয়ে ফেলছে। শুদ্ধবাক্য : ঢাকা দিন দিন তার ভারসাম্য/ভারসমতা হারিয়ে ফেলছে।

অশুদ্ধবাক্য : অন্য কোন উপায়ন্ত না দেখে তারা গুলি ছুড়তে লাগল। শুদ্ধবাক্য : অন্য কোন উপায় না দেখে তারা গুলি ছুড়তে লাগল।

অশুদ্ধবাক্য : সে ক্যান্সারজনিত কারণে মারা গিয়েছে। শুদ্ধবাক্য : সে ক্যান্সার/ক্যান্সারজনিক রোগে মারা গিয়েছে।

অশুদ্ধবাক্য : ঢাকার সৌন্দর্যতা বৃদ্ধিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। শুদ্ধবাক্য : ঢাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

অশুদ্ধবাক্য : অনুমতি ছাড়া কারখানায় ঢুকা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

শুদ্ধবাক্য : অনুমতি ছাড়া কারখানায় ঢুকা আইনত দণ্ডনীয়/আইনত অপরাধ।

অশুদ্ধবাক্য : এত বড় মানুষ হয়েও আপনার সৌজন্যতার কমতি নাই।

শুদ্ধবাক্য : এত বড় মানুষ হয়েও আপনার সৌজন্যের/সুজনতার কমতি নাই।

অশুদ্ধবাক্য : শহীদুল্লাহ কায়সার এবং মুনীর চৌধুরী দুজনই দেশের জন্য প্রাণ দিলেন।

শুদ্ধবাক্য : শহীদুল্লাহ কায়সার ও মুনীর চৌধুরী দুজনই দেশের জন্য প্রাণ দিলেন।

অশুদ্ধবাক্য : আগুনের দ্বারা নিভে গেছে কতগুলো প্রাণ। শুদ্ধবাক্য : আগুনে নিভে গেছে কতগুলো প্রাণ।

বচনের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সচেতনভাবেই হোক আর অবচেতনভাবেই হোক অনেক লেখক/কবি/সাধারণ মানুষ একটি বাক্যে দুবার বা তিনবার বহুচিহ্ন ব্যবহার করে বাক্যের গুণ নষ্ট করে। যেমন: গ্রামগুলো সব, লক্ষ লক্ষ শিশুগুলো সব, সব রাজাকারদের, সকল যুদ্ধাপরাধীদের ইত্যাদি। ‘কিছু’ ব্যবহার হলে পরে বহুবচন হয় না। যেমন: কিছু লোকদের না হয়ে হবে কিছু লোক। বচন ঘাটতি বা বাহুল্যের কারণেও বচন ভুল হতে পারে। যেমন:

অশুদ্ধবাক্য : সকল/সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছে জনতা।

শুদ্ধবাক্য : সকল/সমস্ত যুদ্ধাপরাধীর/যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করেছে জনতা।

অশুদ্ধবাক্য : আইভী ছাড়া অন্যান্য মেয়র প্রার্থীদের অবস্থা কেমন?

শুদ্ধবাক্য : আইভী ছাড়া অন্যান্য মেয়র প্রার্থীদের/অন্য প্রার্থীদেদের অবস্থা কেমন?

অশুদ্ধবাক্য : এবারও আইডিয়াল স্কুলের সব ছাত্ররা ভালো রেজাল্ট করেছে।

শুদ্ধবাক্য : এবারও আইডিয়াল স্কুলের সব ছাত্র/ছাত্ররা ভালো রেজাল্ট করেছে।

অশুদ্ধবাক্য : লক্ষ লক্ষ জনতারা সব সভায় উপস্থিত হয়েছিল। শুদ্ধবাক্য : লক্ষ লক্ষ জনতা সভায় উপস্থিত হয়েছিল।

অশুদ্ধবাক্য : সব পাখিরা ঘর বাঁধে না। শুদ্ধবাক্য : সব পাখি ঘর বাঁধে না।

অশুদ্ধবাক্য : যেসব ছাত্রদের নিয়ে কথা তারা বখাটে। শুদ্ধবাক্য : যেসব ছাত্রকে নিয়ে কথা তারা বখাটে।

অশুদ্ধবাক্য : যেসব অর্থহীন বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দের পরে বসে শব্দ গঠন করে তাকে প্রত্যয় বলে।

শুদ্ধবাক্য : যেসব অর্থহীন বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি শব্দের পরে বসে শব্দ গঠন করে তাদের প্রত্যয় বলে।

অশুদ্ধবাক্য : আমরা এমন কিছু মানুষদের চিনি, যারা এখনও দেশের জন্য প্রাণ দেবে।

শুদ্ধবাক্য : আমরা এমন কিছু মানুষকে চিনি যারা এখনও দেশের জন্য প্রাণ দেবে।

অশুদ্ধবাক্য : ক্লাসে যে ১০ জন ছাত্র আছে তার মধ্যে ৮ জনই ভালো ছাত্র।

শুদ্ধবাক্য : ক্লাসে যে ১০ জন ছাত্র আছে তাদের মধ্যে ৮ জনই ভালো ছাত্র।

অশুদ্ধবাক্য : কিছু কিছু মানুষ আছে যে অন্যের ভালো দেখতে পারে না।

শুদ্ধবাক্য : কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না।

অশুদ্ধবাক্য : সুজন, অন্যান্য মেয়র প্রার্থীদের খবর কী? শুদ্ধবাক্য : সুজন, অন্যান্য মেয়র প্রার্থীর খবর কী?

অশুদ্ধবাক্য : এমন কিছু লোকদের কথা বললেন, যারা রাজাকার। শুদ্ধবাক্য : এমন কিছু লোকের কথা বললেন, যারা রাজাকার।

অশুদ্ধবাক্য : প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রীবর্গ উপস্থিত ছিলেন। শুদ্ধবাক্য : প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।

অশুদ্ধবাক্য : এটি সার্বজনীন ব্যাপার। শুদ্ধবাক্য : এটি সর্বজনীন ব্যাপার।

অশুদ্ধবাক্য : রহিমসহ অরো অনেকেই আছেন এই নাটকে।

শুদ্ধবাক্য : রহিমসহ অনেকেই আছেন এই নাটকে।

নির্দেশকের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

‘টা/টি/খানা/খানি’ ব্যবহার করে শব্দকে নির্দিষ্ট করলে তার আগে ‘এই’ বা ‘ঐ’ ব্যবহার করা যাবে না। আবার গুলো বা গুলি বা গুলিন থেকে শুধু গুলো ব্যবহার করা যায়। আল্লাদিপনা বাদ দিয়ে টি’র ব্যবহার বেশি করা যেতে পারে।

অশুদ্ধবাক্য : ঐ লোকটি খুব সৎ। শুদ্ধবাক্য : লোকটি খুব সৎ।

অশুদ্ধবাক্য : আমি এই মানুষটিকে চিনি। শুদ্ধবাক্য : আমি এই মানুষকে চিনি। /আমি মানুষটিকে চিনি।

সন্ধির মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সন্ধি শব্দ গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম তবে সংস্কৃত ও সংস্কৃত শব্দে সন্ধি করতে হয়। সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের সন্ধি হয় না। বাংলা ও বাংলা শব্দে সন্ধি না করে আলাদা লেখাই ভালো। উচ্চারণে সুবিধা করতে গিয়ে শব্দকে অশুদ্ধ করা ঠিক নয়। লেখা যায়: মিশি কালো>মিশকালো, নাতি বউ>নাতবউ, নাত জামাই> নাজ্জামাই, ঘোড়া দৌড়>ঘোড়দৌড়, পিছে মোড়া>পিছমোড়া ইত্যাদি লেখি। কিন্তু লেখা যাবে না: বচ্ছর, কুচ্ছিত, উচ্ছব, ঘোড়গাড়ি ইত্যাদি।

অশুদ্ধবাক্য : ব্যাপারটি ছিল আপনার জন্য লজ্জাস্কর। শুদ্ধবাক্য : ব্যাপারটি ছিল আপনার জন্য লজ্জা কর বা লজ্জাজনক।

অশুদ্ধবাক্য : এবারের ইলেকশান করে আপনে নাকি খুব দুরাবস্থায় আছেন।

শুদ্ধবাক্য : এবারের ইলেকশান করে আপনে নাকি খুব দুরবস্থায় আছেন।

অশুদ্ধবাক্য : ইত্যাবসারে বৃদ্ধ লোকটির দিন কাটে। শুদ্ধবাক্য : ইত্যবসারে বৃদ্ধ লোকটির দিন কাটে।

অশুদ্ধবাক্য : উল্লেখিত বিষয় হলো তিনি এখন সমাজসেবী। শুদ্ধবাক্য : উল্লিখিত বিষয় হলো তিনি এখন সমাজসেবী।

অশুদ্ধবাক্য : ইতিমধ্যে আপনি বলেছেন, আপনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। শুদ্ধবাক্য : ইতোমধ্যে আপনি বলেছেন, আপনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

অশুদ্ধবাক্য : পয়লা বৈশাখ বাঙালির আসল উৎসবের দিন। (ভুলটাই শুদ্ধ) শুদ্ধবাক্য : পয়লা বৈশাখ বাঙালির আসল উচ্ছবের দিন।

অশুদ্ধবাক্য : শরৎ চন্দ্র বাংলার বিখ্যাত কথাকার। শুদ্ধবাক্য : শরৎচন্দ্র বাংলার বিখ্যাত কথাকার/শরচ্চন্দ্র নামে একজন প্রবন্ধকার আছে।

সমাসের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সমাসবদ্ধ শব্দ হলে একশব্দে লিখতে হবে। অথবা মাঝে হাইফেন দিতে হবে। ও দিয়ে দুটি শব্দ যুক্ত হলে শব্দ দুটি এ-বিভক্তিযুক্ত হতে হবে। সহ অর্থ বুঝালে ‘স্ব’ না বসে ‘স’ বসে। সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের সমাস হয়। সমাসজাত শব্দ ও ব্যাসবাক্য একই সঙ্গে বসে না। সমাসবদ্ধ শব্দের বানানে শুধু মাঝের ঈ-কার ই-কার হয়। যেমন :

অশুদ্ধবাক্য : ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধ ও ভাতে’, এই কথা কবি বলেছেন। শুদ্ধবাক্য : আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ও ভাতে, এই কথা কবি বলেছেন। /আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে, এই কথা কবি বলেছেন।

অশুদ্ধবাক্য : শহর ও গ্রামে এখন ইলেকশনের আমেজ। শুদ্ধবাক্য : শহরে ও গ্রামে এখন ইলেকশনের আমেজ।

অশুদ্ধবাক্য : তিনি স্বসম্মানে হল ত্যাগ করলন। শুদ্ধবাক্য : তিনি সসম্মানে হল ত্যাগ করলন।

অশুদ্ধবাক্য : কুআকারের মানুষগুলো ভালো স্বভাবেরও হয়। শুদ্ধবাক্য : কদাকার মানুষগুলো ভালো স্বভাবেরও হয়।

অশুদ্ধবাক্য : মাল বহনকারী গাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে তারা পালালো। শুদ্ধবাক্য : মালগাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে তারা পালালো।

অশুদ্ধবাক্য : ঘি মাখা ভাত ডিম দিয়ে খেতে খুব মজা। শুদ্ধবাক্য : ঘিভাত ডিম দিয়ে খেতে খুব মজা।

অশুদ্ধবাক্য : দুধ মাখা ভাত কাকে খায়। শুদ্ধবাক্য : দুধভাত কাকে খায়।

অশুদ্ধবাক্য : আগে সিংহচিহ্নিত আসনে বসে রাজা দেশ চালাতেন। শুদ্ধবাক্য : আগে সিংহাসনে বসেরাজা দেশ চালাতেন।

অশুদ্ধবাক্য : লোকটি মিশির মতো কালো হয়েও সাদা মনের মানুষ। শুদ্ধবাক্য : লোকটি মিশকালো হয়েও সাদা মনের মানুষ।

অশুদ্ধবাক্য : তালে কানা লোককে দিয়ে কিছুই হবে না। শুদ্ধবাক্য : তালকানা লোককে দিয়ে কিছুই হবে না।

অশুদ্ধবাক্য : ছয়টি ঋতুর সমাহারের দেশ বাংলাদেশ। শুদ্ধবাক্য : ছয়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ।

অশুদ্ধবাক্য : রীতিকে অতিক্রম না করেও যথারীতি সে বড়লোক। শুদ্ধবাক্য : রীতিকে অতিক্রম না করেও সে বড়লোক।

অশুদ্ধবাক্য : ক্ষণে ক্ষণে প্রতিক্ষণে মাকে পরে মনে। শুদ্ধবাক্য : ক্ষণে ক্ষণে মাকে পরে মনে। /প্রতিক্ষণে মাকে পরে মনে।

বিভক্তির মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

দুটি বিভক্তি না বসিয়েও কিন্তু বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকে না। ‘কে’ একাধিক কারকে ব্যবহৃত হয় বলে একে তির্যক বিভক্তি বলে। তবে যে কারকেই ব্যবহৃত হোক; এটি একবচনের বিভক্তি। বহুবচনজাতীয় শব্দে (দের) ‘কে’ বসে না। যেমন: তাদেরকে (তাদের) দিয়ে একাজ করিও না। এক শব্দে দুটি বিভক্তি বসলে শব্দের গুণ হারায়। যেমন: তোমার কথায় বুকেতে (বুকে) আঘাত পাই। বস্তুবাচক একবচন পদে কোন বিভক্তি (কে, রে) বসে না। যেমন: ঘড়িকে (ঘরি/ঘরিটি) হাতে দাও।

অশুদ্ধবাক্য : ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষা দাও। শুদ্ধবাক্য : ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও। (একবচন) /ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দাও। (বহুবচন)

অশুদ্ধবাক্য : বইকে পুড়িয়ে ফেলো/বইগুলোকে পুড়িয়ে ফেলো। শুদ্ধবাক্য : বই/বইটি পুড়িয়ে ফেলো (একবচন)/বইগুলো পুড়িয়ে ফেলো (বহুবচন)

অশুদ্ধবাক্য : আপনি রবীন্দ্রনাথকে পড়ে কী পেলেন? শুদ্ধবাক্য : আপনি রবীন্দ্রনাথ পড়ে কী পেলেন?

অশুদ্ধবাক্য : এ কলমকে দিয়ে কাজ হবে না। শুদ্ধবাক্য : এ কলমে কাজ হবে না। /এ কলম দিয়ে কাজ হবে না।

অশুদ্ধবাক্য : এই কলমটিকে দিয়ে ভালো লেখা হয়। শুদ্ধবাক্য : কলমটি দিয়ে ভালো লেখা হয়।

অশুদ্ধবাক্য : গরুকে দিয়ে শুধু লাঙল না গাড়িও টানা হয়। শুদ্ধবাক্য : গরু দিয়ে শুধু লাঙল না গাড়িও টানা হয়।

অশুদ্ধবাক্য : সাতভাই যুক্তি করে ইউসুফ ফেলিল কুয়ায়। শুদ্ধবাক্য : সাতভাই যুক্তি করে ইউসুফকে ফেলিল কুয়ায়।

অশুদ্ধবাক্য : তাদেরকে দিয়ে একাজ করিও না। শুদ্ধবাক্য : তাদের দিয়ে একাজ করিও না।

অশুদ্ধবাক্য : তোমার কথায় বুকেতে আঘাত পাই। শুদ্ধবাক্য : তোমার কথায় বুকে আঘাত পাই।

অশুদ্ধবাক্য: গেলাসে করে দুধ দাও। শুদ্ধবাক্য: গেলাসে দুধ দাও।

অশুদ্ধবাক্য : ঘড়িকে হাতে দাও। শুদ্ধবাক্য : ঘড়ি হাতে দাও /ঘড়িটি হাতে দাও।

অশুদ্ধবাক্য : ক্রিয়ার সঙ্গে যেসব বিভক্তি যুক্ত হয় তাকে ক্রিয়াবিভক্তি বলে। /ক্রিয়ার সঙ্গে যেসব বিভক্তি যুক্ত হয় তাদেরকে ক্রিয়াবিভক্তি বলে।
শুদ্ধবাক্য : ক্রিয়ার সঙ্গে যেসব বিভক্তি যুক্ত হয় তাদের ক্রিয়াবিভক্তি বলে।

প্রত্যয়ের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

কোন শব্দের সঙ্গে কোন প্রত্যয় যুক্ত হয় তা খেয়াল রেখেই শব্দ তৈরি করতে হয়। ভুল প্রত্যয়ের ব্যবহারের কারণে বানান ভুল হয়ে যায়। আর বানান ভুল হলে বাক্যের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। একই শব্দের সঙ্গে দুটি প্রত্যয়চিহ্ন বসে না। যেমন: এতটুকু মেয়ে কলেজ পড়ে, তোমার কথায় বুকেতে আঘাত পাই। তার সঙ্গে আমার সখ্যতা (সখ+য-ফলা+ তা) আছে। এটি তার দৈন্যতা।

অশুদ্ধবাক্য : এতটুকু মেয়ে কলেজ পড়ে শুদ্ধবাক্য : এতটুকু মেয়ে কলেজে পড়ে।

অশুদ্ধবাক্য : তবলাওয়ালা ভালোই তবলা বাজায়। শুদ্ধবাক্য : তবলচি /তবলাবাদক ভালোই তবলা বাজায়।

অশুদ্ধবাক্য : দারিদ্র কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহান করেছে শুদ্ধবাক্য : দারিদ্র্য কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহান করেছে।

অশুদ্ধবাক্য : বিকার লোক যে কোন সময় ক্ষতি করতে পারে। শুদ্ধবাক্য : বিকৃত লোক যে কোন সময় ক্ষতি করতে পারে।

অশুদ্ধবাক্য : এটি দল কোন্দল। শুদ্ধবাক্য : এটি দলীয় কোন্দল।

উপসর্গের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

উপসর্গে হাইফেন বসে না। যেমন: উপ-সচিব। ‘অ’ যদি নাবোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাহলে সেই শব্দের শেষে হীন যুক্ত হয় না। যেমন: অসচেতনহীনভাবে, অক্লান্তিহীনভাবে।

অশুদ্ধবাক্য : ফুল দিয়ে তাঁকে সুস্বাগতম জানানো সবার কর্তব্য। শুদ্ধবাক্য : ফুল দিয়ে তাঁকে স্বাগতম জানানো সবার কর্তব্য।

অশুদ্ধবাক্য : শিক্ষা উপ-পরিচাল ও সহ-উপ পরিচালক আজ এই স্কুলে আসবেন। শুদ্ধবাক্য : শিক্ষা উপপরিচালক ও সহউপপরিচালক আজ এই স্কুলে আসবেন।

অশুদ্ধবাক্য : অক্লান্তি হীনভাবে প্রজন্ম চত্বরে সমায়েত হচ্ছে। শুদ্ধবাক্য : ক্লান্তি হীনভাবে প্রজন্ম চত্বরে সমায়েত হচ্ছে।

অশুদ্ধবাক্য : তিনি নামকরা একটি দৈনিক পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। শুদ্ধবাক্য : তিনি নামকরা একটি দৈনিক পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

চিহ্নের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

১. সংস্কৃতিতে বিশেষণ ও বিশেষ্য দুটিকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: নর—সুন্দর বালক আর নারী—সুন্দরী বালিকা কিন্তু বাংলাতে বিশেষণকে ঠিক রেখে শুধু বিশেষ্যকে নর বা নারী প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ বাংলায় বিশেষণকে নারী বাচক করার দরকার হয় না। যেমন: সুন্দর বালক ও সুন্দর বালিকা।

২. সংস্কৃতিতে দুটি বিশেষ্যকেই চিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: মেয়েটি পাগলি, আসমা অস্থিরা কিন্তু বাংলাতে দুটি বিশেষ্যের একটিকে নারিচিহ্নের আওতায় আনা হয়। যেমন: মেয়েটি পাগল, আসমা অস্থিরা ইত্যাদি।

৩. সংস্কৃতিতে ঈ বা ইনি বা নী প্রত্যয়ই একসঙ্গে বসে কিন্তু বাংলায় বসে না। যেমন: অভাগা—অভাগী—অভাগিনী, ননদ—ননদী—ননদিনী, কাঙাল—কাঙালী—কাঙালিনী, গোয়াল—গোয়ালী—গোয়ালিনী কিন্তু বাংলায় অভাগী, ননদী, মায়াবী, কাঙালী, গোয়ালী, বাঘিনী। তবে ক্লীববাচক শব্দে নী প্রত্যয় যুক্ত করে নারী বাচক শব্দ তৈরি করতে হয়। যেমন: মেধাবিনী, দুখিনী, যোগিনী, মায়াবিনী ইত্যাদি।

৪. সংস্কৃতিতে ক্ষুদ্রার্থবাচক কিছু ক্লীববাচক শব্দকে নর বা নারী বাচক করা যায় যা বাংলাতে সঠিক নয়। যেমন: নাটক—নাটিকা, উপন্যাস—উপন্যাসিকা, পুস্তক—পুস্তিকা, গীতি—গীতিকা ইত্যাদি।

৫. সংস্কৃতিতে নরবাচক শব্দ—বৃক্ষ, নারী বাচক শব্দ—লতার ক্লীববাচক শব্দ—জল আবার হিন্দিতে নরবাচক শব্দ—রুটি আর নারী বাচক শব্দ—দই। এবার ভাবুন কত কঠিন।

৬. বাক্য দেখে নির্ণয় করতে হয় কোনটি নর আর কোনটি নারী বাচক শব্দ। যেমন: গরু গাড়ি টানে। গরু দুধ দেয়। সে/তিনি গর্ভবতী, সে কৃষিকাজ করে।

অশুদ্ধবাক্য : রহিমা খুব সুন্দরী। শুদ্ধবাক্য : রহিমা খুব সুন্দর।

অশুদ্ধবাক্য : তার মা খুব মহান নেতা ছিলেন। শুদ্ধবাক্য : তার মা খুব মহিয়সী নেতা ছিলেন।

অশুদ্ধবাক্য : সেলিনা হোসেন একজন বিদ্বান লেখিকা।

শুদ্ধবাক্য : সেলিনা হোসেন একজন বিদ্বান লেখক। /সেলিনা হোসেন একজন বিদুষী লেখিকা।

পক্ষের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

প্রথমপক্ষ যদি অন্যপক্ষের সঙ্গে একই বাক্যে ব্যবহৃত হয় তাহলে ক্রিয়া প্রথমপক্ষ অনুসারে হয়। একশেষ হলে নিয়ম অনুসারে প্রথমে সে, তুমি ও আমি বসে আর ক্রিয়া প্রথমপক্ষ অনুসারে হয়। আগে কবিতার বাক্যের ক্ষেত্রে কবিগণ পক্ষ অনুসারে ক্রিয়ার ব্যবহার ঠিকরাখেন নাই। যেমন: হাসঁগুলো যায় ভাসি। বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই। কারণ সংস্কৃত ‘ভাসিয়া’ থেকে ‘ভাসি’ চলিত হয়েছে।

অশুদ্ধবাক্য : আমি অর্থাৎ হাসান জেনে শুনে ভুল করি না। শুদ্ধবাক্য : আমি অর্থাৎ হাসান জেনে শুনে ভুল করে না।

অশুদ্ধবাক্য : এ ব্যাপারে আমার অর্থাৎ হাসানের ভুল হবে না। শুদ্ধবাক্য : এ ব্যাপারে আমার অর্থাৎ হাসানের ভুল হয় না।

অশুদ্ধবাক্য : আপনি বা হুজুর যদি বলেন, তাহলে (আমি) যাই। শুদ্ধবাক্য : আপনি বা হুজুর যদি বলেন, তাহলে (আমি) যাব।

অশুদ্ধবাক্য : আমি, সে আর তুমি কাজটি করব। শুদ্ধবাক্য : সে, তুমি আর আমি কাজটি করব।

কারকের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বস্তুর প্রাণিবাচক শব্দে ‘কে’ বসে না। ব্যক্তির নামের সঙ্গেও ‘কে’ বসে না।

অশুদ্ধবাক্য : সাপুড়ে সাপকে খেলায়। শুদ্ধবাক্য : সাপুড়ে সাপ খেলায়।

অশুদ্ধবাক্য : পাহাড়কে নাড়ায় সাধ্য কার। শুদ্ধবাক্য : পাহাড় নাড়ায় সাধ্য কার।

অশুদ্ধবাক্য : আপনি তো ছুরিতে মানুষ মারেন। শুদ্ধবাক্য : আপনি তো ছুরি দিয়ে মানুষ মারেন।

অশুদ্ধবাক্য : ধর্মের কল বাতাসেতে নড়ে। শুদ্ধবাক্য : ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।

অশুদ্ধবাক্য : আপনি তো গরিবদেরকে সাহায্য করেন না। শুদ্ধবাক্য : আপনি তো গরিবদের সাহায্য করেন না। /আপনি তো গরিবকে সাহায্য করেন না। অশুদ্ধবাক্য : একসময় আমের কাননে মিটিং বসেছিল। শুদ্ধবাক্য : একসময় আম্রকাননে মিটিং বসেছিল। /একসময় আমের বাগানে মিটিং বসেছিল।

বিপরীত শব্দের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

সরাসরি ‘না’ শব্দটি ব্যবহার না করে বিপরীত শব্দ ব্যবহার করে বাক্যের সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। যেমন : দুদিন ধরে ছেলেটির কোন খোঁজ নাই। আর দুদিন ধরে ছেলেটি নিখোঁজ। সব শব্দের পূর্বে উপসর্গ যোগে বিপরীত শব্দ গঠন করা যায় না। অনেকেই ‘অ’ যোগে বিপরীত শব্দ তৈরি করে থাকেন। যেমন: সফলতা—অসফলতা, মূর্খ—অমূর্খ, ভালো—অভালো।

অশুদ্ধবাক্য : লোকটি কায়দায় নাই। শুদ্ধবাক্য : লোকটি বেকায়দায় আছে।

অশুদ্ধবাক্য : লোকজন তার প্রতিকূলে নাই। শুদ্ধবাক্য : লোকজন তার অনুকূলে নাই।

সমোচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

উচ্চারণের দিক থেকে এক হলেও অর্থের দিক থেকে ভিন্ন। বাক্যের অর্থ ঠিক রাখতে সমার্থক শব্দের সঠিক ব্যবহার জরুরি।

অশুদ্ধবাক্য : তাড়া আমরাতলায় বসে আমরা খাওয়ার সময় মালির তারা খেয়েছে। শুদ্ধবাক্য : তারা আমড়াতলায় বসে আমড়া খাওয়ার সময় মালির তাড়া খেয়েছে।

অশুদ্ধবাক্য : সে ভুড়ি ভুড়ি খেয়ে ভুরিটি বাড়িয়েছে। শুদ্ধবাক্য : সে ভুরি ভুরি খেয়ে ভুঁড়িটি বাড়িয়েছে।

শব্দদ্বিত্বের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বিভিন্ন প্রকার শব্দ বা পদ দুবার ব্যবহার করে শব্দ বানাতে পারি। কিন্তু অর্থের দিকে খেয়াল করতে হয়। যেমন: ফলাফল শব্দটি ঠিক ব্যবহার কিন্তু এর প্রতিশব্দ হিসেবে লেখা হয় ফলশ্রুতিতে’ তাহলে শব্দটি হবে ভুল। কারণ ‘ফলশ্রুতি’ অর্থ ‘শ্রবণ’ কোন বিষয়ের ফল নয়। ‘ভাষাভাষী’ অর্থ কোন একটি ভাষা ব্যবহারকারী। তাই ভাষাভাষীর পূর্বে কোন ভাষার নাম উল্লেখ করে লিখলে তা হবে ভুল। যেমন: বাংলা ভাষাভাষী। এমন কিছু দ্বিত্বশব্দ তৈরি করা হয় যা ভুল। যেমন: ভেদাভেদ, গুণাগুণ ইত্যাদি। এদের মধ্যে ভালোমন্দ দুটিই থাকে। যেমন: ভেদ+অভেদ বা গুণ+অগুণ। এদের অপপ্রয়োগ আজ প্রবলভাবে দেখা দিচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘ভেদাভেদ ভুলে গেছে’ যা ভুল। আবার বলা হচ্ছে ‘আমাদের পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে আমরা সচেতন’।

অশুদ্ধবাক্য : ঘামজলে তার শার্ট ভিজে গেছে। শুদ্ধবাক্য : ঘামে তার শার্ট ভিজে গেছে।

অশুদ্ধবাক্য : অশ্রুজলে তার কপল ভিজে গেছে। শুদ্ধবাক্য : অশ্রুতে তার কপল ভিজে গেছে।

অশুদ্ধবাক্য : ঘরটি ছিমছিমে অন্ধকার। শুদ্ধবাক্য : ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার।

বাক্যের মাধ্যমে ভাষার অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ

বিভিন্ন নিয়ম অর্থাৎ সন্ধি, সমাস, উপসর্গ, প্রত্যয় ইত্যাদি দিয়ে শব্দ বানানো যায়। কিন্তু এই বানানো শব্দ পাশাপাশি বসালেই বাক্য হয় না। কিছু গঠন অনুসরণ করেই একটি সার্থক বাক্য তৈরি করা যায়। সার্থক বাক্যে গুণরক্ষা করে বাক্য বানাতে হয়। বাক্যের অর্থ ঠিক না থাকলে বাক্য গুণহীন হয়ে যায়। আবার যতির ভুল ব্যবহারের কারণেও বাক্যের অর্থের হেরফের হয়ে যায়।

অশুদ্ধবাক্য : পরবর্তীতে আপনি আসবেন। শুদ্ধবাক্য : পরবর্তিকালে /পরবর্তী সময়ে আপনি আসবেন।

অশুদ্ধবাক্য : সকল দৈন্যতা দূর হয়ে যাক। শুদ্ধবাক্য : সকল দৈন্য দূর হয়ে যাক। সকল দীনতা দূর হয়ে যাক।

অশুদ্ধবাক্য : সেখানে গেলে তুমি অপমান হবে। শুদ্ধবাক্য : সেখানে গেলে তুমি অপমানিত হবে।

অশুদ্ধবাক্য : আমি অপমান হয়েছি। শুদ্ধবাক্য : আমি অপমানিত হয়েছি।

অশুদ্ধবাক্য : সূর্য উদয় হয়নি। শুদ্ধবাক্য : সূর্য উদিত হয়নি।

অশুদ্ধবাক্য : সত্য প্রমাণ হোক। শুদ্ধবাক্য : সত্য প্রমাণিত হোক।

অশুদ্ধবাক্য : তার কথার মাধুর্যতা নাই। শুদ্ধবাক্য : তার কথার মাধুর্য/মধুরতা নাই।

অশুদ্ধবাক্য : রাধা দেখতে খুব সুন্দরী ছিল। শুদ্ধবাক্য : রাধা দেখতে খুব সুন্দর ছিল।

অশুদ্ধবাক্য : এটি অপক্ক হাতের কাজ। শুদ্ধবাক্য : এটি অপটু হাতের কাজ।

অশুদ্ধবাক্য : স্বল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। শুদ্ধবাক্য : অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী।

অশুদ্ধবাক্য : অভাবে চরিত্র নষ্ট। শুদ্ধবাক্য : অভাবে স্বভাব নষ্ট।

অশুদ্ধবাক্য : বিদ্বান মূর্খ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। শুদ্ধবাক্য : বিদ্বান মূর্খ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

অশুদ্ধবাক্য : অল্পদিনের মধ্যে তিনি আরোগ্য হলেন। শুদ্ধবাক্য : অল্পদিনের মধ্যে তিনি আরোগ্য লাভ করলেন।

অশুদ্ধবাক্য : সৎ চরিত্রবান লোক সবার কাছে প্রিয়। শুদ্ধবাক্য : চরিত্রবান লোক সবার কাছে প্রিয়।

অশুদ্ধবাক্য : মাতাহীন শিশুর অনেক দুঃখ। শুদ্ধবাক্য : মাতৃহীন শিশুর অনেক দুঃখ।

অশুদ্ধবাক্য : সে ভাগ্যবতী মহিলা। শুদ্ধবাক্য : সে ভাগ্যবতী।

অশুদ্ধবাক্য : মিলাদে গোলাপজলের পানি ছিটাও। শুদ্ধবাক্য : মিলাদে গোলাপজল ছিটাও।

অশুদ্ধবাক্য : বইটি তার জরুরি প্রয়োজন। শুদ্ধবাক্য : বইটি তার (খুব) প্রয়োজন।

অশুদ্ধবাক্য : সবাই বাবা-মার সুস্বাস্থ্য কামনা করে। শুদ্ধবাক্য : সবাই বাবা-মার সুস্থতা কামনা করে।

অশুদ্ধবাক্য : ছেলেটি শুধুমাত্র /কেবলমাত্র ১০টি টাকার জন্য মারামারি করল।

শুদ্ধবাক্য : ছেলেটি শুধু /মাত্র /কেবল ১০টি টাকার জন্য মারামারি করল।

অশুদ্ধবাক্য : ৫ বছর সময়কাল ধরে তারা জনগনকে সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শুদ্ধবাক্য : ৫ বছর ধরে তারা জনগনকে সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অশুদ্ধবাক্য : ভারত ব্রিটিশদের অধীনস্থ ছিল বলেই তারা যুদ্ধ করেছিল। শুদ্ধবাক্য : ভারত ব্রিটিশদের অধীনে ছিল বলেই তারা যুদ্ধ করেছিল।

অশুদ্ধবাক্য : আপনারাই প্রথম তাদেরকে সুস্বাগতম জানালেন। শুদ্ধবাক্য : আপনারাই প্রথম তাদের স্বাগত জানালেন।

শব্দের অপপ্রয়োগজনিত ভুলঃ

  • অশ্রুজল - "চোখের জল" অর্থে ব্যবহার অশুদ্ধ, কারণ অশ্রু মানেই চোখের জল;
  • অজ্ঞানতা - "অজ্ঞতা" অর্থে এর প্রয়োগ ভুল, কারণ অজ্ঞানতা শব্দের প্রকৃত অর্থ জ্ঞানশূন্যতা;
  • আয়ত্তাধীন - "আয়ত্ত" শব্দের অর্থই অধীন, আয়ত্তের পর অধীন ব্যবহার বাহুল্য;
  • আকণ্ঠ পর্যন্ত - "আকণ্ঠ" মানেই কণ্ঠ পর্যন্ত, এখানে পর্যন্ত ব্যবহার বাহুল্য;
  • আশ্চর্য - মূল অর্থ বিস্ময়কর। "বিস্মিত" অর্থে ব্যবহার তাই অশুদ্ধ। "বিস্মিত" অর্থে আশ্চর্যান্বিত ব্যবহার করতে হবে;
  • ইদানীংকালে - "ইদানীং" অর্থই বর্তমান কাল, এর সাথে "কাল" যোগ করা অপপ্রয়োগ;
  • খাঁটি গরুর দুধ - কথাটি অর্থহীন, শুদ্ধরূপ হবে গরুর খাঁটি দুধ;
  • জন্মবার্ষিকী - জন্মবার্ষিক শব্দই যথেষ্ট, এক্ষেত্রে স্ত্রী প্রত্যয় যোগ করা বহুল প্রচলিত হলেও অশুদ্ধ;
  • প্রেক্ষিত - মূল অর্থ প্রেক্ষণ বা দর্শন করা হয়েছে। প্রেক্ষিত হচ্ছে প্রেক্ষণ শব্দের বিশেষণ। পরিপ্রেক্ষিত (পটভূমি বা পারিপার্শ্বিক) অর্থে প্রেক্ষিত শব্দের ব্যবহার অশুদ্ধ;
  • জন্মজয়ন্তী - জয়ন্তী শব্দের মাঝেই আছে জন্ম-প্রসঙ্গ। কাজেই জয়ন্তীর পূর্বে "জন্ম" শব্দের ব্যবহার অশুদ্ধ;
  • অত্র-তত্র-যত্র - অত্র মানে "এখানে", তত্র মানে "সেখানে" আর যত্র মানে "যেখানে"। তাই "অত্র" মানে "এই" বুঝার কারণ নেই। যেমন "এই অফিস" বুঝাতে "অত্র অফিস" লিখলে অশুদ্ধ হবে;
  • অন্তরীণ - "অন্তরিন" শব্দের অর্থ কারাগারের বাইরে কাউকে আবদ্ধ করে রাখা। অনেকে "অন্তরিন" শব্দটিকে "অন্তরীণ" লিখে থাকেন যা প্রমিত বানানরীতি অনুযায়ী অশুদ্ধ;
  • বৈদেহী/বিদেহী - শুদ্ধরূপ "বিদেহ" যার অর্থ দেহশূন্য বা অশরীরী। বিদেহ শব্দটি বিশেষণ, কিন্তু ঈ-প্রত্যয় যোগে পুনরায় বিশেষণ করা হয় বিদেহী/বৈদেহী। এই উভয় শব্দের প্রয়োগই ভুল;
  • ভাষাভাষী - ভাষা ব্যবহারকারী অর্থে "ভাষী"ই যথেষ্ট ও যথার্থ। ভাষাভাষী প্রয়োগ অশুদ্ধ;
  • শায়িত - "শায়িত" অর্থ "শয়ন করা হয়েছে এমন"। যিনি নিজে শুয়ে আছেন তাঁকে "শয়ান" বলা হয়। শুয়ে আছেন অর্থে "শায়িত" শব্দের প্রয়োগ অশুদ্ধ;
  • সমৃদ্ধশালী/সম্পদশালী - সমৃদ্ধ (বিশেষণ) শব্দের অর্থ সম্পদশালী বা প্রাচুর্যপূর্ণ। "শালী" শব্দ যোগ করে বিশেষণ পদ পুনরায় বিশেষণ করা অর্থহীন ও অশুদ্ধ;
  • ফলশ্রুতি - শব্দটির আভিধানিক অর্থ "পুণ্যকর্ম করলে যে ফল হয় তার বিবরণ বা তা শোনা"। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে যে অর্থে ফলশ্রুতি লেখা হচ্ছে তা ভুল। তার বদলে "ফলাফল, ফল, পরিণতি" ব্যবহার শুদ্ধ

১. বহুবচনের দ্বিত্বজনিত ভুল : অনেক সময়েই দেখা যায়, ভাষা ব্যবহারকারী অশুদ্ধভাবে বহুবচনের দ্বিত্ব ব্যবহার করে থাকেন। এ প্রবণতা এত ব্যাপক যে, কোন লেখক এ ত্রুটি থেকে মুক্ত তা খুঁজে বের করাও প্রায় দুরূহ হয়ে ওঠে। 'সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশগুলো', 'সব প্রকাশ মাধ্যমগুলো', 'নিম্নলিখিত সব শিক্ষার্থীগণ', 'সব উপদেষ্টামণ্ডলী', 'কতিপয় সিদ্ধান্তবলি', 'দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলাসমূহে'- এমন ধরনের বহুবচনের দ্বিত্বজনিত অপপ্রয়োগ অহরহ চোখে পড়ে। সামান্য সতর্কতাই এ ত্রুটি থেকে লেখককে মুক্তি দিতে পারে। উপরের দৃষ্টান্তগুলোর শুদ্ধ প্রয়োগ হবে- 'সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশ', অথবা 'সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলো', 'প্রকাশ মাধ্যমগুলো' অথবা 'সব প্রকাশ মাধ্যম', 'নিম্নলিখিত সব শিক্ষার্থী' অথবা 'নিম্নলিখিত শিক্ষার্থীগণ', 'সব উপদেষ্টা' অথবা 'উপদেষ্টামণ্ডলী', 'কতিপয় সিদ্ধান্ত', 'দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলায়' অথবা 'দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহে' ইত্যাদি। এমন একটি অপপ্রয়োগের উদাহরণ 'কর্তৃপক্ষগণ'। কেননা, কর্তৃপক্ষ শব্দটি বহুবচন বাচক। 'কর্তৃপক্ষ' শব্দের অর্থ শাসকগণ, পরিচালকগণ, নিয়ন্ত্রকগণ ইত্যাদি। অতএব, কর্তৃপক্ষ শব্দের শেষে 'গণ' প্রয়োগ বাহুল্য ও অশুদ্ধ।

২. ইং, তাং, নং, চৌং ইত্যাদি : অধিকাংশ বাঙালি তারিখের পর 'ইং' বলে একটা 'চিহ্ন' লিখে থাকে। তারিখ, নম্বর, চৌধুরী_ এসব শব্দকেও লেখা হয় তাং, নং, চৌং রূপে। এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। কবে এ প্রবণতার সূত্রপাত তা আমাদের জানা নেই। তবে এসব চলছে দীর্ঘদিন ধরে- শিক্ষিত, শিক্ষার আলোকবঞ্চিত নির্বিশেষে। কিন্তু কেন এমন হলো? তারিখ, নম্বর, চৌধুরীর পরিবর্তে যদি সংক্ষিপ্তরূপে লেখা হতো তা. ন. চৌ. তাহলেও মানা যেত। কিন্তু সংক্ষেপে চিহ্নের পরিবর্তে কেন অনুস্বর (ং) বর্ণ? মনে রাখতে হবে সংক্ষেপে চিহ্ন (.) একটা বিরাম চিহ্ন, পক্ষান্তরে অনুস্বর (ং) হচ্ছে একটা বর্ণ। একটা বর্ণ দিয়ে একটা বিরাম চিহ্নের কাজ চালাতে গিয়েই ঘটেছে দৃষ্টিকটু অপপ্রয়োগ। তারিখ লেখার পর 'ইং' লেখা অনেকটা জাতীয় মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। 'ইং' কি ইংরেজির সংক্ষিপ্ত রূপ? এক্ষেত্রে এক ধরনের অপপ্রয়োগ ঘটল- সংক্ষিপ্ত চিহ্নের (.) স্থলে বসানো হলো একটি বর্ণ (ং)। অন্যটি কী? পৃথিবীতে ইংরেজি সাল বলে তো কোনো সাল নেই। তাই 'ইং'-এর প্রশ্নই আসে না। খ্রিস্টীয় সালকে কে ইংরেজি সাল বলে চালিয়ে দিল? প্রথমে যে-ই চালু করুক না কেন, এ ক্ষেত্রে তার 'সাফল্য' বিস্ময়কর। একটা অপপ্রয়োগের ব্যাধিতে গোটা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীই আক্রান্ত। এমনকি পহেলা জানুয়ারিতে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ঘোষক-ঘোষিকা, সংবাদ-পাঠকের মুখে শোনা যায় 'ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা' জানানোর কথা, পর্দায়ও ভেসে ওঠে অভিন্ন শুভেচ্ছা, জাতীয় দৈনিকের পাতায়ও জানানো হয় একই রকম অপপ্রয়োগজাত শুভেচ্ছা।

৩. প্রেক্ষিত : পরিপ্রেক্ষিত অর্থে বাংলা ভাষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় 'প্রেক্ষিত' শব্দটি। লেখাই বাহুল্য যে, এটা ভুল প্রয়োগ। 'প্রেক্ষিত' শব্দ এসেছে 'প্রেক্ষণ' থেকে। 'প্রেক্ষণ' বিশেষ্য পদ, যার অর্থ দৃষ্টি। এ থেকে তৈরি হয়েছে বিশেষণ পদ 'প্রেক্ষিত' (উচ্চারণ 'প্রেকখিতো') যার অর্থ দর্শিত বা যা দেখা হয়েছে। অর্থাৎ 'প্রেক্ষিত' শব্দের সঙ্গে দৃষ্টি/দেখা/দর্শিত এসব অর্থ জড়িত আছে। কিন্তু এই অর্থকে পাল্টে দিয়ে অধিকাংশ লেখক 'প্রেক্ষিত' শব্দ ব্যবহার করেন পটভূমি/পরিপ্রেক্ষিত/ Perspective/background অর্থে। এই ব্যবহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচ. ডি পর্যায়ের অভিসন্দর্ভের শিরোনামাতেও কখনো কখনো লক্ষ করা যায়। এ বিষয়ে সকলের সতর্কতা জরুরি।

৪. জন্মজয়ন্তী : 'জন্মজয়ন্তী' শব্দের ব্যবহারও এত বেশি যে একটি অপপ্রয়োগই শুদ্ধ প্রয়োগ বলে মনে হতে পারে। 'জয়ন্তী' শব্দের মাঝেই আছে জন্ম-প্রসঙ্গ; কাজেই জয়ন্তীর পূর্বে 'জন্ম' শব্দের প্রয়োজন পড়ে না। 'জয়ন্তী' শব্দের অর্থ জন্মোৎসব, কোনো ব্যক্তির জন্মতিথি উপলক্ষে উৎসব। গ্রাম থেকে শহরে আসা শিক্ষার আলোকবঞ্চিত কোনো কৃষক যদি হাসপাতালে তার আত্দীয়কে দেখে এসে বলেন, 'হাসপাতালে গিয়েছিলাম, আসার সময় রোগীকে ফলফ্রুট দিয়ে এলাম'- এক্ষেত্রে 'ফলফ্রুটে'র ক্ষেত্রে যেমন অপপ্রয়োগ ঘটে, তেমনি অপপ্রয়োগ হয় 'জন্মজয়ন্তী'র ক্ষেত্রেও। অতএব, রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মজয়ন্তী না বলে বলা উচিত 'রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জয়ন্তী'।


এই পোস্ট সহায়ক ছিল?

1 out of 1 Marked as Helpfull !